সিনেমার জয়-বিরু জুটির মতোই, বছরের পর বছর রাজ্যের স্বাস্থ্যের অলিন্দে ‘দাপিয়ে’ বেড়িয়েছে অভীক-বিরূপাক্ষ জুটি। আর জি কর আন্দোলনের চাপে দু’জনকেই নিলম্বিত করেছিল স্বাস্থ্য দফতর। কিন্তু তার পরেও গোপনে ‘দাদাগিরি’ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেই অভিযোগ। শনিবার স্বাস্থ্য দফতর অবশ্য নির্দেশিকা জারি করে আবার অভীক দে-র বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। সেই সূত্রেই চিকিৎসক মহলের প্রশ্ন, তা হলে অভীকের জুটি বিরূপাক্ষ বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও তদন্ত হবে কি?
রাজ্যে নতুন সরকার আসার পরেই আর জি করের ঘটনার তদন্ত পুনরায় শুরুর পদক্ষেপ হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত সকলকেই সেই তদন্তের আওতায় আনার দাবি রয়েছে চিকিৎসকদের। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মুখ বন্ধ খামে যে সন্দেহভাজনদের নামের তালিকা নির্যাতিতার মা তথা পানিহাটির বিধায়ক জমা দিয়েছিলেন, তাতে প্রথমের দিকে অভীকের মতোই বিরূপাক্ষের নাম আছে বলে খবর। নির্যাতিতার মা বলেন, ‘‘এক-এক করে সব ক’টি কানকে টেনে আনলেই ঘটনার নেপথ্যের আসল মাথা সামনে আসবে। সেটাই মুখ্যমন্ত্রী করছেন। বিরূপাক্ষও তাতে বাদ যাবে না।’’ ২০২৪-এর ৯ অগস্ট সকালে আর জি করের সেমিনার রুমে বিরূপাক্ষের উপস্থিতি নিয়েও তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। শেষে ‘গুরু-শিষ্য’, অর্থাৎ অভীক ও বিরূপাক্ষকে একসঙ্গে সেই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর নিলম্বিত করে স্বাস্থ্য দফতর।
সেই সময়ে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র রেসিডেন্ট ছিলেন বিরূপাক্ষ। আন্দোলনের আবহে প্রশ্ন ওঠে, দীর্ঘ দিন তিনি কী ভাবে একই হাসপাতালে রয়েছেন? তখন তাঁকে কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালে অবিলম্বে কাজে যোগ দেওয়ার রিলিজ় অর্ডার জারি হয়েছিল। অবশ্য ওই নির্দেশিকার পরেই আবার নিলম্বিতের নির্দেশ জারি হয়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, কামারহাটির সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সময় থেকেই বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সেই সময়ে গ্রেফতারও হয়েছিলেন তিনি। এর পরেই প্রবীণ চিকিৎসক-নেতাদের মাধ্যমে অভীকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় বিরূপাক্ষের।
অভিযোগ, প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজ এবং জেলা স্তরের হাসপাতালে উত্তরবঙ্গ লবির বিরুদ্ধে থাকা লোকজনকে শায়েস্তা করার মূল দায়িত্ব ছিল বিরূপাক্ষের উপরে। কোথায় এবং কী ভাবে সেই কাজ হবে, তা কলকাতায় বসে ফোনে নিয়ন্ত্রণ করতেন বিরূপাক্ষ। অভীকের নির্দেশ মতো প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে হুমকি প্রথা চালানো, সিনিয়রদের ফোন করে কটূক্তির পাশাপাশি জুনিয়রদের ফেল করানো বা মারধরের ভয় এবং পাশ করানোর প্রলোভন দেখিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে এই বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধে। আবার আর জি কর আন্দোলনের সময়ে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে ফোন করে প্রতিবাদ না করার জন্য হুমকি দেওয়ারও অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
‘ন্যাশনাল মেডিকোজ় অর্গানাইজ়েশন’-এর দক্ষিণবঙ্গ শাখার সম্পাদক অর্নপ পালের দাবি, ‘‘অভীকের পরে এ বার বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধেও নিশ্চয় তদন্ত হওয়া উচিত। হুমকি প্রথায় ওঁদের সমস্ত সহযোগীদের বিরুদ্ধে তদন্ত হলেই অনেক সত্য সামনে আসবে।’’
নিলম্বিত হওয়ার পরে অভীকের মতোই ওই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধেও তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সেই রিপোর্ট স্বাস্থ্য দফতরে জমা পড়লেও কিছুই হয়নি। উল্টে নিলম্বিত থাকা অবস্থাতেই গত জানুয়ারিতে শিক্ষক-চিকিৎসক নিয়োগের প্যানেলেবিরূপাক্ষের নাম ছিল! বিতর্ক বাধতেই হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের ওই প্যানেলের উপরে স্থগিতাদেশ জারি করে স্বাস্থ্য দফতর।
এত অভিযোগ থাকার পরেও বিরূপাক্ষের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ হয়, তারই অপেক্ষায় চিকিৎসকদের বড় অংশ। তবে সূত্রের খবর, ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধেও তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু করবে সরকার। এ বিষয়ে বিরূপাক্ষকে ফোন ও মেসেজ করা হলেও উত্তর মেলেনি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)