E-Paper

কবিতার ভিতর এত অন্ধকার

সন্ধেবেলায় শহরের প্রতিটি সভাঘরের বাতি জ্বলজ্বলে। ব‌ই উদ্বোধন, সম্মাননা জ্ঞাপন, গান, কবিতায় মুখরিত চত্বর, বইপাড়া— যত্রতত্র। পোস্টারে ব্যানারে সুসজ্জিত বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিখা থেকে দুর্গ।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৭:৩৫

তার পর ব্যাঙ্গমি উড়তে উড়তে ভিক্টোরিয়ার পরির মাথায় গিয়ে বসে। যে ঘর তাকে বাহির করেছিল, সেই বাহির তাকে ঘরের পথ নির্দেশ করছে। সূর্য নিবু-নিবু তিলোত্তমার আকাশে। অ-বাবু এক কন্যাকে নিয়ে চলেছেন আনন্দমুখরিত ছন্দে। আজ তাঁদের গন্তব্য কবিতা পড়ার আসর, এক সভাঘরে। চায়ের দোকানে দাঁড়াতে এক জন এসে ভিড়ল: আজকাল অনুষ্ঠানের বড্ড বাড়বাড়ন্ত, না? সম্মতি জানিয়ে বাবুটি বলেন, ‘সে আর বলতে! তবে আমার এই কন্যাকে চিনে রাখুন, খুব ভাল লিখছে।’ কন্যাও ডগমগ। মনে মনে ভাবে, ভালই জুটেছে তার পাতানো বাবাটি। যা দৃশ্যগোচর তা-ই কি ঠিক? অন্তরালের রসায়ন ব্যাঙ্গমি জানে, একটু আগে যে বসে ছিল আকাদেমির বাঁধানো চেয়ারে।

সন্ধেবেলায় শহরের প্রতিটি সভাঘরের বাতি জ্বলজ্বলে। ব‌ই উদ্বোধন, সম্মাননা জ্ঞাপন, গান, কবিতায় মুখরিত চত্বর, বইপাড়া— যত্রতত্র। পোস্টারে ব্যানারে সুসজ্জিত বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিখা থেকে দুর্গ। মেয়েটি ভাবে, আজ আর কবিতা পড়তে যাবে না। ভাল লাগছে না হে মহাকাল। সমাজমাধ্যমের দৌলতে সকলেই এখন স্বঘোষিত মহাকবি। হোক, তাতে কার কী ক্ষতি? কবিতাতুতো হাফ-চেনা কেউ হামলে পড়ে এসে, বসে কাছে। একটু একা থাকার উপায় নেই, ‘দেখতে-শুনতে ভাল তায় কবি’ হলে তো নৈব নৈব চ: আপনি কি বিবাহিত? সঙ্গীর সঙ্গে দূরত্ব? আপনি মায়ের সঙ্গে থাকেন? আপনি কি দমদম যাবেন? তা হলে আমার গাড়িতে যেতে পারেন। মেট্রো বন্ধ বলে এক কবির গাড়িতে উঠতে বাধ্য হওয়া— গাড়ি দশ মিনিট রাস্তায় না দৌড়তেই কেন ব্যাঙ্গমির ঊরুতে হাত ষাটোর্ধ্ব কবির? আরও অনেক কবিতাপ্রেমী, কবিতাচারীর মেসেজ ঢোকে মেসেঞ্জারে: আমরা কি এক দিন কফি খেতে যেতে পারি? আপনি আজ অমুক সভায় যে কবিতাটি পড়লেন, কী যে সুন্দর হয়েছে! আহা আহা। তবে ছন্দটা ঠিক হচ্ছে না। এক দিন এসো আমার বাড়িতে, ছন্দটা নিয়ে বসি। মেসেঞ্জারে শরীরী ছবি পাঠিয়ে হাতছানি। মধ্যরাতে ভিডিয়ো কল। শুধু কি ফুটপাত, বাংলা ভাষার কবিকুলপতিদের স্ব-ভাবও বদল হয় মধ্যরাতে।

প্রশংসা শুনে কখনও প্রকৃতিরাও আনন্দে ঝকমক। ব্যানারে নিজের ছবি সাঁটিয়ে, আরও একটি নতুন সংস্থার জন্ম দিয়ে আর পার্লার থেকে সেজেগুজে উপস্থিত হঠাৎ-কবি। নিজের অনুষ্ঠানে অগ্রজ কবিদের টপাটপ সম্মাননা জ্ঞাপন করে, এমনকি নিজ খরচায় শান্তিনিকেতন বা ঘাটশিলায় অনুষ্ঠান আয়োজন করে, ‘থাকা-খাওয়া ফ্রি’ করে করায়ত্ত করতে চাইছেন যশ।

আসলে কবিতা লেখা বড্ড সোজা! হঠাৎ করেই অনেকেই ভাবছেন, কবিতা লিখে বিখ্যাত হয়ে যাবেন। যশাকাঙ্ক্ষী কবি দিদি-বোনদের কেউ ফোনের ও-পারে জিজ্ঞেসও করে বসে, ‘আমাকে একটু বলবি, পুরস্কার কী ভাবে পেতে পারি?’ নতুন লিখতে আসা ষাটোর্ধ্বাও পুরস্কারের কথা ভাবছেন। কবিতা যে নিজেই শ্রেষ্ঠ পুরস্কার! এরা চাহিতে জানে না, দয়াময়।

শুনুন, আপনাকে পুরস্কার দেব বলে নির্বাচন করেছি। চমকিত হয়ে সে বলে, ‘সে কী, আমি কি করেছি!’ না না, অনেক ভাল কাজ করেছেন আপনি। পাখিটিরও কি লোভ ছিল মনে মনে! অসম্মতি-সূচক হ্যাঁ-বিনিময় হল। অনুষ্ঠানের আগের দিন রাতে সংস্থার মেসেজ, ‘দেড় হাজার টাকা অনলাইন করবেন।’ কবিতা ঘিরেও নিদারুণ ‘দেওয়া-থোয়া’র ব্যবস্থা দেখেশুনে মনে হয়— আপনার জীবন বিষাদময়? আজই কবিতা লিখতে শুরু করুন। তার পর টাকা ছড়িয়ে রাতারাতি তিন-চারটে কবিতার বই এবং পুরস্কার। আর রইল বাকি রূপ, বিভাজিকা, বিভঙ্গ— তার প্রদর্শনে হতেই পারেন সুপারস্টার কবিতারমণী। আর তালভঙ্গ, ছন্দপতন হলে তো ফেসবুক আছেই: জঘন্য বচসা, পাঁক ছোড়াছুড়ি। এ-সবের মধ্যে হায় কোথায় কবিতা!

ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। তাঁরাই ভরসার স্থল। তাঁরা এই স্রোতের বিপরীতে মূল্যবোধ আঁকড়ে কবিতার পুজো করে চলেছেন নিরন্তর। আগেও যে নারীরা কবিতা লিখেছেন, উনিশ শতকের স্বর্ণকুমারী দেবী, কামিনী রায়— তাঁদের নাম লেখা রয়ে গেছে কালের খাতায়। রাধারাণী দেবী, কবিতা সিংহ, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, নবনীতা দেব সেন, দেবারতি মিত্র নির্মাণ করেছেন নিজস্ব অক্ষরবলয়। চাকচিক্যময় বাহিরের উদ্‌যাপন থেকে শত হাত দূরেই ছিল তাঁদের কবিতাযাপন।

কবিতা সাধনার বিষয়। এক জীবন অক্ষরসাধনার জন্য যথেষ্ট নয়। সময় অপ্রতুল। বাইরের চাকচিক্য থেকে কবিতায় নিমগ্ন হতে হবে। কবিতা লিখতে এসে কত ভাল মানুষের সঙ্গেও পরিচয় হয়, সভা-সমিতি-অনুষ্ঠান শেষে যাঁরা বাড়ি ফেরার খোঁজ নেন পরম অভিভাবক, বন্ধুর মতো। কবিতা ছাপিয়ে এ এক বৃহত্তর জীবন-পরিবার।

মেয়ে-কবিদের এই শিক্ষাটি হয়ে যায়, কবিতার ‘ক’ যদি হয় কলকাতা, ‘বি’ তবে কি? বিভেদ, বিভাজন? বিরোধিতা? বিদ্বেষ? ‘তা’ মানে কি তাগিদ, তাড়না— এত কিছুর পরেও কবিতা লেখার, পড়ার? কবিতায় জীবন ‘ধারণ’ করতে হলে পুড়ে ছাইও হতে হবে, আবার জন্মাতেও হবে ফিনিক্সের মতো, সেই ছাই থেকেই। মেয়েদের তো আরও বেশি করে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Poetry Art Poet

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy