E-Paper

সংবাদের পুনরুদ্ধার

শেখ হাসিনার শাসনকালে অন্তত সাড়ে চারশো সাংবাদিকের নামে ‘ডিজিটাল সিকিয়োরিটি অ্যাক্ট’-এ মামলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় নাম ছিল আড়াইশোরও বেশি সাংবাদিকের।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০২৬ ০৮:২৫

এ বছর বাংলাদেশে হাম ভয়াবহ আকার নিয়েছে। চারশোরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, অসুস্থের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে। কাগজের প্রথম পাতায় কেবলই সন্তানহারাদের হাহাকারের ছবি। কী করে এমন হল? সাংবাদিক শেখ তানভির মাহমুদ এক কথায় উত্তর দিলেন— মিডিয়ার স্বাধীনতার অভাব। বাংলাদেশ প্রধানত ইউনিসেফ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থার দান-করা টিকা ব্যবহার করত। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, খোলা দরপত্র ডেকে ৫০ শতাংশ টিকা কেনা হবে। তার জটিলতায় সময়মতো টিকা মেলেনি বহু শিশুর। কাগজ-চ্যানেল তখন হইচই জোড়েনি, সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেয়েছে। নীরবতার সুযোগে বিপদ বেড়েছে, বললেন তদন্তমূলক সাংবাদিকতার একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের (জিআইজেএন) সদস্য তানভির।

ভয়ের কারণ যথেষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনকালে অন্তত সাড়ে চারশো সাংবাদিকের নামে ‘ডিজিটাল সিকিয়োরিটি অ্যাক্ট’-এ মামলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় নাম ছিল আড়াইশোরও বেশি সাংবাদিকের। একটি অসরকারি রিপোর্ট বলছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ অগস্ট, ২০২৪ ছ’জন সাংবাদিক প্রতিবাদের খবর করতে গিয়ে প্রাণ হারান। অন্তর্বর্তী সরকার এসে একশোরও বেশি সাংবাদিকের নামে খুনের মামলা করেছিল, চার-পাঁচ জন এখনও জেলবন্দি। জামিনে-মুক্তদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অচল, পাসপোর্ট নিষ্ক্রিয়। ইউনূসের শাসনকালেও সাংবাদিকের উপর আক্রমণ ছিল অব্যাহত— ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ বাংলাদেশের দু’টি প্রধান দৈনিকের দফতরে আগুন দিয়েছিল উন্মত্ত জনতা। প্রথম আলো ভবনে এখনও তিনতলা-সমান কালো দাগ। সদ্য-নির্বাচিত বিএনপি সরকার কি এই ছবি বদলাবে? “মিথ্যা মামলায় যাতে সাংবাদিকরা হয়রান না হন, সেই নির্দেশ পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর,” বললেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। খুনের অভিযোগ খারিজ হোক, বিচার হোক পেশাদারিতে বিচ্যুতির জন্য, চাইছেন প্রবীণ সাংবাদিকরা।

দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ‘স্বাধীনতা’ আর ‘সাংবাদিকতা’ ক্রমশ বিপরীতার্থক শব্দ হয়ে উঠেছে। অথচ, সংবাদের স্বাধীনতা না-থাকার কী মূল্য চোকাতে হয় দেশকে, তা তো স্পষ্ট। হামে শিশুমৃত্যু যেন দাগ বোলালো অমর্ত্য সেনের কথায়— মন্বন্তরের বাংলায়, দুর্ভিক্ষের চিনে খাদ্যসঙ্কটের কথা খবরে উঠে আসতে দেওয়া হয়নি বলেই এতগুলো মানুষ মরেছিল। কথাটা ভারতে প্রমাণিত হয়েছে বেশ শক্তপোক্ত ভাবে। ১৯৫৮-৯২, এই দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দুই গবেষক (টিমোথি বিসলে ও রবিন বার্জেস, ২০০২) দেখিয়েছেন, স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রচার যে এলাকায় যত বেশি, সেখানে বন্যাত্রাণ, খরাত্রাণ পৌঁছয় তত বেশি। মানুষকে তথ্য না জোগালে সরকারের উপর চাপ তৈরি হয় না। সংবাদে ঘাটতি মানেই নাগরিকের প্রাপ্যে ঘাটতি। সংবাদের স্বাধীনতা কিছু উচ্চশিক্ষিতের শৌখিনতা নয়, তা হল গরিবের ডালভাত, শিক্ষা-চিকিৎসার গ্যারান্টি। “তদন্তমূলক সাংবাদিকতাতেই দেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে,” বললেন ডেলি স্টার সম্পাদক মহফুজ় আনম।

সে কথায় মন ভিজল না দিন-আনি-দিন-খাই সাংবাদিকদের। তাঁরা সহকর্মীদের খুন হতে, আত্মহত্যা করতে, চাকরি হারাতে দেখেছেন। ঢাকায় ‘বাংলাদেশ জার্নালিজ়ম কনফারেন্স’-এ (৮-৯ মে) নানা জেলা থেকে আসা সাংবাদিকরা খোলা সভায় সম্পাদক, মালিকদের প্রশ্ন করছিলেন— যখন অধিকাংশ কাগজ-চ্যানেল মালিক সরকার-ঘনিষ্ঠ, লাভপিপাসু ব্যবসায়ী; যখন প্রভাবশালীদের কুকীর্তির খবর লেখা হতে না-হতেই ফোন আসে নানা সরকারি ‘এজেন্সি’ থেকে; যখন বেতনের টাকায় সংসার চলে না জেলার রিপোর্টারদের, তখন স্বাধীন, দায়বদ্ধ সাংবাদিকতা কি আদৌ সম্ভব? পাকিস্তানের দৈনিক ডন-এর সম্পাদক জ়াফর আব্বাস বললেন, পাকিস্তানে গোটা পঁয়তাল্লিশ বড় সংবাদমাধ্যম রয়েছে, পাঁচ-ছ’টা বাদে সব ক’টা ‘ব্যাঙের ছাতা’ ধরনের। জমি-বাড়ির প্রোমোটার, কাপড় কলের মালিকরা সেগুলো চালাচ্ছেন, নেতাদের কাছে ঘেঁষে কিছু চটজলদি লাভের আশায়।

বাংলাদেশেও তৈরি-কাপড় (গারমেন্টস) শিল্পপতিরা বেশ কিছু মিডিয়া চালান। তাঁদের এক জনকে মঞ্চে পেয়ে সভা থেকে প্রস্তাব গেল, আপনি কি কাপড় ব্যবসা ছেড়ে দিতে পারেন না? এ কে আজ়াদ (প্রকাশক, সমকাল) সাফ উত্তর দিলেন, বরং মিডিয়া ছেড়ে দেবেন। হাসির হুল্লোড় উঠল। আজ়াদ, যিনি তথ্যমন্ত্রীর আহ্বান-করা নৈশভোজে বসেছিলেন মন্ত্রীর ঠিক পাশের আসনে, হল-ভর্তি সাংবাদিকদের বললেন, “আজ কোনও প্রকাশক বলতে পারবেন না, ‘আমি স্বাধীন’। সকলেই খবরে লাগাম টানছেন, বেশি আর কম।”

সরকারের চাপ পাল্টা ফিরিয়ে দিতে পারে সাংবাদিক ঐক্য। সিএনএন-এর সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টা কিছু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর হোয়াইট হাউসে প্রবেশের কার্ড বাতিল করেন (২০১৮)। হোয়াইট হাউসে কর্মরত সব সাংবাদিক প্রতিবাদ করেন, এমনকি সরকার-অনুকূল ফক্স নিউজ়-ও। পেন্টাগন তার অভ্যন্তরে প্রতিরক্ষা সাংবাদিকদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সব সাংবাদিক এক সঙ্গে পেন্টাগন ত্যাগ করেন (২০২৫)। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে এ ছবি বিরল। বরং ক্ষমতা-ঘনিষ্ঠ, প্রসাদ-লোলুপ সাংবাদিকরা স্বাধীন সাংবাদিকতার মস্ত বাধা। সরকারকে কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করলে এই দল-ঘনিষ্ঠরাই আগে রুখে ওঠেন। তথ্য মন্ত্রক, প্রেস ক্লাব, সম্পাদকদের সংগঠন, সব প্রতিষ্ঠানে জুড়ে বসে তাঁরা নিরন্তর প্রশ্ন-উদ্যত সাংবাদিকদের হেনস্থা করেন, কোণঠাসা করেন। করাচি, কলকাতা, ঢাকা, সর্বত্র এই চিত্র এক। তিক্ত সত্য এই যে, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার যখন হাসিনা-ঘনিষ্ঠ ‘দোসর’ সাংবাদিকদের যথেচ্ছ গ্রেফতার করছে, সে সময়ে তাঁদের মুক্তির আবেদনে স্বাক্ষরের আহ্বান এড়িয়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক। আন্তর্জাতিক নানা সংগঠনকে তাঁরা বলেছেন, অভিযুক্তদের অনেকেই সাংবাদিক-সুলভ কাজ করেননি। হাসিনা সরকারের হিংস্রতা সমর্থন করেছেন, এমনকি মদত দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রাপ্য সুরক্ষার যোগ্য এঁরা নন।

সাংবাদিকের এই বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে রাজনীতিকে ‘জ়িরো সাম গেম’ করে তোলার চেষ্টা— সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বিরোধীশূন্য করার রাজনীতি। বিচারবিভাগ এবং মিডিয়া, শাসকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে গণতন্ত্রের যে দু’টি স্তম্ভ, তার সম্পূর্ণ দখল চায় সব দল। ৫ অগস্ট-এর গণউত্থানের পর বাংলাদেশে বহু মিডিয়ার মালিকানা, সম্পাদক বদলে গিয়েছে। বদলে গিয়েছেন প্রেস ক্লাব, সম্পাদক সংগঠনের কর্তারা। ভারতে সংবাদের স্বাধীনতা বহু দিন একটা দৃষ্টান্ত ছিল পড়শিদের কাছে। এখন ভারত সে স্থান হারিয়েছে— সংবাদের স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশ ১৫২, পাকিস্তান ১৫৩, ভারত ১৫৭। ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ পাথরের মতো চেপে বসেছে নিউজ়রুমে, কাশ্মীর থেকে কেরল।

এর পরিণাম কী হতে পারে, দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের পথ না পেয়ে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটাল। প্রশাসনের ব্যর্থতা গোপন করায় রোগ এল মহামারি হয়ে। সাংবাদিক কি বাঁচল? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশযাত্রা, দামি উপঢৌকন, সরকারি ঠিকা, সব হারিয়ে ‘দোসর’ সাংবাদিকরা দেশছাড়া, কারারুদ্ধ, কর্মহীন। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকবে রাষ্ট্র, মিডিয়া, এই আশাতে বাংলাদেশের ‘মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’- প্রায় ৬০০ সাংবাদিককে নিয়ে সম্মেলন করলেন। প্রাণবন্ত, বিতর্ক-আন্দোলিত নানা অধিবেশনের পরেও ‘ইতিহাসের শিক্ষা’ নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেল। অনেকে একান্তে বললেন, শাসক-অনুগত সাংবাদিকরা পছন্দের নেতার ফিরে আসার অপেক্ষা করবে, তবু স্বাধীন সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকবে না। শাসক কী না দিতে পারে! অন্য দিকে, স্বাধীন সাংবাদিকতা কী বা দিতে পারে জনস্বার্থ সুরক্ষার তৃপ্তিটুকু ছাড়া?

আচ্ছা, বড় নেতাদের কি কখনও দরকার হয় না স্বাধীন সংবাদের? হয় বইকি। জ়াফর আব্বাস গল্প করছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ইমরান খান ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ডন কাগজের উপর। ক্যাবিনেট বৈঠকে কাগজের নাম নেওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। পালাবদলের পরে জেলবন্দি ইমরানকে বলা হয়, তিনি একটিই সংবাদপত্র নিতে পারেন। যে কাগজটি ইমরান বেছে নেন, তা হল ডন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

dhaka UNICEF Measles Muhammad Yunus Sheikh Hasina

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy