সাগর মণ্ডলের মা-বাবা পরিযায়ী শ্রমিক, গুজরাতে সাফাইকর্মীর কাজ করেন। সাগরও হয়তো সেই জীবনই বেছে নিত। সেই পথেই এগিয়েছিল সে। পরীক্ষার পর গুজরাতে চলে যাওয়া, হোটেলে বাসন ধোয়ার চাকরি, মাসান্তে পনেরো হাজার টাকা— অভাবের সংসারে নিতান্ত কম নয়। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকে অসামান্য কৃতিত্ব সাগরের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। মেধাতালিকায় সে নবম স্থান দখল করেছে। দারিদ্রের কারণে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সুযোগ হয়নি। কলা বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে ৯৭.৬ শতাংশ নম্বর পেয়েছে সে। দারিদ্র, পারিবারিক সুরক্ষার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপের অভাব— কিছুই তার সাফল্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আপাতত, ভিন রাজ্যে শ্রমিকের অনিশ্চিত জীবন নয়; প্রতি পদে অসম্মানিত হওয়াও নয়, তার স্বপ্ন স্নাতক স্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া এবং নিজ উপার্জনের টাকায় ইউপিএসসি-র প্রশিক্ষণ নেওয়া।
প্রতি বছর মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের পর মেধাতালিকায় থাকা অনেকের ক্ষেত্রেই নানাবিধ প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনি উঠে আসে। দরিদ্র পরিবারে গৃহশিক্ষক রাখার সামর্থ্য তাদের থাকে না। অনেকেই প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া হওয়ায় লেখাপড়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সাহায্যটুকুও মেলে না। তাদের ভরসা বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন পঠনপাঠন এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাহায্য। তাতেই তাদের সাফল্য উদাহরণ হয়ে থেকে যায়। বিদ্যালয় শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই। এই শিক্ষা আর্থ-সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে সমস্ত শিক্ষার্থীর কাছে সমান ভাবে পৌঁছনোর কথা। সর্বোপরি, তার পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান পদ্ধতিটিও এমন হওয়ার কথা, যাতে সেটিই শিক্ষার্থীদের ভিত্তি মজবুত করে তোলে, বাইরের অতিরিক্ত সাহায্য না নিতে হয়। কিন্তু বাস্তব তেমনটি বলে না। বরং পশ্চিমবঙ্গে এক গৃহশিক্ষকতা-নির্ভর শিক্ষার প্রাধান্য দেখা যায়, যেখানে বিদ্যালয়ের ভূমিকাটি গৌণ।
এই রাজ্যে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলির দ্রুত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি যদি একটি দিক হয়, তবে অন্য দিকটি অবশ্যই শিক্ষার্থীদের এক বৃহৎ অংশের এখনও সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলির প্রতি আস্থা রাখা। তাদের এক বড় অংশই দরিদ্র, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী। সেই কারণেই তাদের উপযুক্ত শিক্ষাদানে রাজ্য সরকারের বিশেষ যত্নবান হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে কাজ হয়নি। বরং ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতে অসাম্য, শিক্ষকদের নিয়মিত শিক্ষাদানে অনীহা, বিভিন্ন সরকারি কাজে তাঁদের নিযুক্তি, যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব, এবং অবশ্যই শিক্ষান্তে কর্মসংস্থানের অভাব— এই সবই প্রমাণ করে, রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাটি মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীরা হয় গৃহশিক্ষকের উপর অতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, নয়তো মাঝপথেই লেখাপড়ায় ইতি টানতে বাধ্য হয়েছে। মধ্যবর্তী একটি অংশ অবশ্য এখনও জেদ ও আত্মবিশ্বাসে ভর করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজ্য সরকার তো বটেই, সমাজকেও তাদের পাশে অবিলম্বে দাঁড়াতে হবে। নিছক প্রশংসাবাক্য নয়, এককালীন সাহায্যদানও নয়, সাগরের মতো মেধাবীরা যাতে শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়, তার সদর্থক ব্যবস্থাটিও করতে হবে। আইএএস হয়ে অভাবীদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায় সাগর। এই ইচ্ছাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখাতেও কিন্তু দেশ ও দশের মঙ্গল লুকিয়ে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)