সম্প্রতি এক বছর পূর্ণ হল ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর। গত বছর এপ্রিলে পহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রত্যুত্তরে ভারতের তরফে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানটিকে নিয়ে আজও দেশ জুড়ে এক শক্তিশালী আবেগ বজায় রয়েছে। লক্ষণীয়, ৮৮ ঘণ্টা ধরে চলে অভিযানটি। ওই সময়ের মধ্যে ভারত পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে ন’টি তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে হামলা চালায়, পাকিস্তানের বেশ কিছু বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে এবং পাকিস্তানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলি নিষ্ক্রিয় করে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে, এক পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সুনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখানো সহজ ছিল না। তবুও দিল্লি তাদের সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বাকি বিশ্বকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে এ-হেন আগ্রাসন প্রথম তাদের তরফে করা হয়নি, বরং এই উত্তেজনা বৃদ্ধির নেপথ্যে ইসলামাবাদের হাত ছিল।
এক বছর পর, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাগুলি নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি। লক্ষণীয়, কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদকে এখন আর শুধু নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে অনুপ্রবেশের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাবে না, যে-হেতু পহেলগাম হামলাটি ছিল স্থানীয় উগ্রবাদ, ডিজিটাল প্রচার, স্লিপার সেল এবং আন্তঃসীমান্ত রসদ সরবরাহের এক বিপজ্জনক সংমিশ্রণ। এর মোকাবিলা করতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তথ্য-সহ অন্যান্য সমন্বয়ের পাশাপাশি ভারতের একটি ব্যাপক উগ্রবাদ বিরোধী পরিকাঠামোর প্রয়োজন। পাশাপাশি ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির পরে কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি আরও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা দাবি করে। পর্যাপ্ত গণতান্ত্রিক সহযোগিতা ছাড়া অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। এমতাবস্থায় চরমপন্থী উপাদানগুলিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি স্বচ্ছ প্রশাসনের উপস্থিতি এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। সেই সঙ্গে পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জোরদার করতে হবে যে-হেতু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে অনুপ্রবেশের ধরনও। অন্য দিকে, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোনের ব্যবহার, নির্ভুল গোলাবর্ষণ এবং বিমান প্রতিরক্ষা সমন্বিত যৌথ অভিযানগুলিকে কালক্রমিক না হয়ে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করা প্রয়োজন। ‘অপারেশন সিঁদুর’ দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদন, নজরদারি সক্ষমতা এবং সমন্বিত যুদ্ধ ব্যবস্থার উপর গুরুত্বকে ত্বরান্বিত করেছে। সেই গতি অব্যাহত রাখতে হবে।
সুতরাং, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর বার্ষিকী কেবল সামরিক উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক আত্মসমীক্ষার একটি মুহূর্ত হয়ে ওঠা উচিত। পহেলগামের পর ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে দৃঢ় সঙ্কল্প দেখিয়েছে। তবে, শুধু সঙ্কল্প নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধে গোয়েন্দা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সাইবার সক্ষমতা, কূটনীতি এবং গণতান্ত্রিক শাসনে আরও গভীরতর সংস্কার প্রয়োজন। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত ওই ৮৮ ঘণ্টায় ধ্বংস হওয়া লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা দিয়ে মাপলে চলবে না। এর মাপকাঠি হোক দেশের এমন এক শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামোর গঠন, যা নিশ্চিত করবে পহেলগামের মতো ঘটনা আর কখনও যেন না ঘটে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)