E-Paper

প্রতিকারের পথ

তবে সব কিছুর আগেই আসে অবৈধ নির্মাণের প্রশ্ন। কলকাতা শহর ও শহরতলিতে, এবং রাজ্যের অন্য শহরাঞ্চলেও— অবৈধ নির্মাণ একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা।

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৭:৫২

দুই রকম অর্থ হতে পারে ‘ক্ষমতা’ শব্দটির। ক্ষমতা মানে প্রতাপ, দাপট। ক্ষমতা মানে দায় ও দায়িত্ব। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেইপ্রশাসনকে অনেকগুলি দায়িত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করতে দেখা গেল— তার প্রায় সব ক’টিই রাজ্যের জন্য বিশেষ সুখবর। তবে তার সঙ্গে ক্ষমতার প্রতাপও দেখা গেল, যাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। খাস কলকাতার রাস্তায় বুলডোজ়ার নামল, প্রশাসনিক নির্দেশে তিলজলার বেআইনি বাড়ি রাতারাতি ভেঙে ফেলার চেষ্টা হল। পরে যদিও সে কাজ স্থগিত হল আদালতের নির্দেশে, কিন্তু সমগ্র ঘটনার পিছনে প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়টি অবশ্যই প্রশ্নযোগ্য। প্রশ্নটি আরও গুরুতর এই জন্য যে, ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যে বুলডোজ়ার-রাজ নিয়ে ইতিমধ্যেই অনেক আলোচনা ও নিন্দা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও নির্বাচনের আগে এক ধরনের দমনের বার্তা দিতেই বর্তমান শাসক বুলডোজ়ার-সহকারে প্রচার করেছে। এই প্রেক্ষিতই বলে দেয়, কেন বিষয়টি এত বেশি বিভেদমূলক ও আপত্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

তবে সব কিছুর আগেই আসে অবৈধ নির্মাণের প্রশ্ন। কলকাতা শহর ও শহরতলিতে, এবং রাজ্যের অন্য শহরাঞ্চলেও— অবৈধ নির্মাণ একটি দীর্ঘকালীন সমস্যা। এর মধ্যে আছে জলাজমি ও পুকুর বুজিয়ে নির্মাণ, অনুমতির অতিরিক্ত নির্মাণ, অবৈধ ভাবে দাহ্যপদার্থ জমিয়ে রাখা, অগ্নিনিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কতাবিধি লঙ্ঘন ইত্যাদি। কলকাতায় এক দিকে তিলজলা-তপসিয়া-মোমিনপুর-একবালপুর, অন্য দিকে বড়বাজার, কিংবা ই এম বাইপাসের দু’দিকে বেড়ে ওঠা বসতি, দমদম থেকে বারুইপুর, সর্বত্র এর ভূরি ভূরি উদাহরণ। এই অরাজকতার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুনাফা করেছে পূর্বতন রাজনীতি ও প্রশাসনের একটা অংশ, এবং অবশ্যই দুর্নীতি-নিমজ্জিত প্রোমোটার গোষ্ঠী। প্রশাসনিক ব্যবস্থা এই দুর্নীতিকে ‘বৈধ’ করে তুলেছিল। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে বারংবার এ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার একটি সচেতন ও সুপরিকল্পিত সমাধান চাই। এ বিষয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা খুবই প্রয়োজনীয়— তবে কিনা সেই প্রক্রিয়াকে আইন মোতাবেক হতে হবে। যে কোনও নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোরতা চাই, বাণিজ্যিক নির্মাণের অনিয়মের ক্ষেত্রেও একটা পদ্ধতি মানা চাই। পুরনো আবাসের বিষয়টি অনেক বেশি সংবেদনশীলতা প্রত্যাশা করে— সেখানে বাসিন্দারা অনেক সময়েই নিজেরা অপরাধী নন, অপরাধের ভার তাঁরা বহন করছেন মাত্র। তাঁদের অনুমতি সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখানোর সময় দেওয়া দরকার, সংশোধনের সুযোগ দরকার, প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ-সহ আবাস ছেড়ে অন্যত্র যেতে বলা দরকার। শেষ ধাপ হল সেই অবৈধ নির্মাণ বলপূর্বক ভেঙে ফেলা। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসামাত্র সরকারের নির্দেশ, এবং নির্দেশদানের এক বেলার মধ্যে প্রতিকারের প্রথম ধাপ হিসেবে বুলডোজ়ার পাঠিয়ে দেওয়া— অত্যন্ত অমানবিক। সঙ্গত প্রশ্নই উঠেছে, কলকাতায় বহু স্থানে এই সমস্যা থাকলেও কেন সংখ্যালঘু-বসতিতেই অকস্মাৎ বুলডোজ়ার চালানো হল। দেশের অন্যত্র বুলডোজ়ার দিয়ে যে বিদ্বেষমূলক কার্যক্রম চলেছে, এ রাজ্যে তেমন ঘটলে তা বিরাট উদ্বেগের কারণ।

প্রশ্নটি উঠবেই, কেননা নির্বাচনের আগে ও পরে শাসক দলের বিভিন্ন মুখপাত্রের মুখে যে বুলডোজ়ার উল্লেখ ধ্বনিত হয়েছে, তার কতটা নাগরিক জীবনের নির্মাণনৈতিকতা সংক্রান্ত, আর কতটা সংখ্যালঘুবিদ্বেষী কার্যক্রম হিসাবে পরিকল্পিত, বিজেপি নেতারাই তা বলতে পারবেন। প্রশাসনিক সংস্কার আর দমনপীড়নের মধ্যে অনেক দূরত্ব। দমননীতির উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রয়োগ এবং মানুষের ক্লেশ উৎপাদনের মাধ্যমে সংস্কারকর্ম যেন অনৈতিকতার স্বাভাবিকীকরণে পরিণত না হয়। আদালতের মতানুযায়ী সংস্কারপন্থায় এগোনো বাঞ্ছনীয়। বুলডোজ়ার যেন পশ্চিমবঙ্গীয় সমাজের কাছে দানবিক দমনের রূপক না হয়ে দাঁড়ায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bulldozer

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy