রাজ্যে নির্বাচনপর্ব পরিচালনার দায়িত্ব ছিল যাঁর হাতে, সেই মনোজ আগরওয়াল নিযুক্ত হলেন রাজ্যের মুখ্য সচিব পদে; নির্বাচনের প্রধান পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত হলেন মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান পরামর্শদাতা। ভারতীয় রাজনীতিতে এই সংবাদ আর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে না, বঙ্গীয় রাজনীতিতেও নয়। অবসর গ্রহণ করামাত্র কোনও আমলা নিযুক্ত হচ্ছেন সরকারপোষিত উচ্চ পদে, কোনও পুলিশকর্তা রাজ্যসভায় যাচ্ছেন, এমন ঘটনা দেখে দেখে রাজ্যবাসীর চোখ সয়ে গিয়েছে। দেশবাসীরও। দেশের প্রধান বিচারপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যেই রাজ্যসভায় মনোনীত হয়েছিলেন রঞ্জন গগৈ। আর এক বিচারপতি আবদুল নাজ়ির সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় ২০২৩ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজ্যপাল হয়েছিলেন। প্রশ্ন তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে নয়— গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ থেকে অবসরের সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক নিয়োগের মধ্যে থাকার ইঙ্গিত নিয়ে। সাম্প্রতিক কালেও, কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় পদত্যাগ করেই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হন। ঘটনা হল, ২০১২ সালে, কেন্দ্রে যখন ইউপিএ সরকার ক্ষমতাসীন, তখন তৎকালীন বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি বলেছিলেন, অবসরের পরেই যদি এমন নিয়োগের সম্ভাবনা থাকে, তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। ইউপিএ আমলে যদি সে কথা সত্য হয়, বিজেপির আমলেও তা সত্য না-হওয়ার কারণ নেই। এবং, কথাটি শুধু বিচারকদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা যে কোনও ব্যক্তি বিষয়েই সত্য।
পশ্চিমবঙ্গে দুই সাম্প্রতিক নিয়োগকে কি অন্য কোনও ভাবে দেখার উপায় আছে? এ ক্ষেত্রেও প্রশ্ন সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে নয়। তাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবন প্রশাসনিক কাজে তাঁদের দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু, যাঁদের হাতে রাজ্যের নির্বাচন নিরপেক্ষ ভাবে পরিচালনার দায়িত্ব ছিল, তাঁরা যদি নির্বাচনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন সরকার দ্বারা উচ্চ পদে নিযুক্ত হন, তবে মানুষের মনে সংশয় তৈরি হতে পারে যে, এটা কি পুরস্কার? এই সংশয় গণতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক। বস্তুত, নতুন সরকার যে বিপুল জনমত পেয়েছে, এই সংশয় তার প্রতিও অপমানজনক। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব যাঁদের উপরে ন্যস্ত, তাঁদের নিরপেক্ষ থাকাই যথেষ্ট নয়— জনমানসে তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে যাতে কোনও প্রশ্ন না উঠতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক শীর্ষ পদে নিরপেক্ষ এবং দক্ষ আমলা প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই— কিন্তু, গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এমন ব্যক্তি আর দ্বিতীয় কেউ নেই, তা কি হতে পারে? এই নিয়োগের বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়া কর্তব্য ছিল। কেউ বলতেই পারেন যে, পূর্ববর্তী জমানায় এমন ঘটনা আখছার ঘটেছে। সে কথা নিয়ে তর্ক নেই— কিন্তু, আগের জমানার ভুলগুলি যদি এখনও অপরিবর্তিত থাকে, তবে শাসক দলের রং ছাড়া বঙ্গ রাজনীতিতে আর কিছুই পাল্টায় কি?
সত্যই যদি পরিবর্তন কাম্য হয়, তবে নিরপেক্ষতার প্রশ্নে কোনও আপস চলে না। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করা বিধেয়। আদালতের বিচারপতির মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হলে, সেই মেয়াদ ফুরোনোর পর জনজীবন থেকে সরে যেতে হবে। ব্যক্তি হিসাবে তিনি নিজস্ব জীবনযাপন করবেন, কিন্তু কোনও রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণ করবেন না। অন্য দিকে, যাঁদের উপরে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার মতো দায়িত্ব থাকবে, তাঁদেরও পরবর্তী কালে কোনও পদে নিয়োগ করার আগে অন্তত দু’বছর অপেক্ষা করতে হবে। সাংবিধানিক নিরপেক্ষতাকে রাজনৈতিক আনুগত্যে পরিণত করা সম্ভব, এই কথাটি মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য করে তুলতে হবে। গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাস ফেরানোর আর দ্বিতীয় পথ নেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)