এ বার তৃতীয় দফা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর পরবর্তী দফা এ বার শুরু হচ্ছে ষোলোটি রাজ্যে, এবং তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। বাকি রইল হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, এবং লাদাখ। প্রথম ও দ্বিতীয় দফাতে এসআইআর তেরোটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হয়েছে। একই পদ্ধতি চালু থাকবে এ বারেও, এমনই শোনা গেল। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশে এ কাজ করা সহজ নয়। অবশ্য সহজ নয় বলেই কাজটি ভাল ভাবে করা গেল না— মানতেই হবে। এও মনে রাখতে হবে যে, ইতিমধ্যে জাতীয় নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ইম্পিচমেন্ট প্রস্তাব আনা হয়েছে সংসদে বিপুল সংখ্যক বিরোধী নেতার স্বাক্ষর-সহ।
এসআইআর মহাযজ্ঞ নিয়ে প্রশ্ন, আপত্তি, অভিযোগ সবই অনেক। নির্বাচন কমিশন তৃতীয় দফা শুরু করার আগে সেগুলি বিস্তারিত পুনরুল্লেখ দরকার না হলেও দু’-একটি কথা বলা আবশ্যিক। প্রথমত, যে কোনও কাজে আগের দফা সন্তোষজনক ভাবে শেষ হলেই সাধারণত পরের দফা শুরু করা হয়। এসআইআর-এর ক্ষেত্রে কি তা বলা সম্ভব? এক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেই সাতাশ লক্ষাধিক মানুষের ক্ষেত্রে বিবেচনা এখনও অমীমাংসিত, সে কাজ ওখানেই রেখে পরবর্তী দফার কাজ শুরু করা হচ্ছে। এখন পশ্চিমবঙ্গের ‘বিবেচনাধীন’ নামগুলির বিবেচনা-পর্ব বিচারবিভাগের হাতে, তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি সমাধা করার দিকে এগোনো কি কমিশনেরই দায় নয়? পশ্চিমবঙ্গের সাতাশ লক্ষ বাতিল মানুষ বিষয়ে উদ্বেগ আরওই গভীর এই জন্য যে, ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে ট্রাইবুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি তাঁর দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি চেয়েছেন। যে কারণেই এই নিষ্কৃতি-অনুরোধ হোক না কেন, বুঝতে অসুবিধা নেই, এতগুলি মানুষের জন্য সতর্ক বিবেচনার কাজ কতখানি কঠিন। এত মানুষকে পথে বসিয়ে রেখে কমিশন তৃতীয় দফার কাজ শুরু করছে— কিছু নৈতিক প্রশ্ন ওঠেই। দ্বিতীয়ত, একই পদ্ধতি বজায় রাখার ভাবনা থেকে সংশয় হয়, কমিশন এসআইআর পদ্ধতি বিষয়ে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, তা নিয়ে আদৌ ভাবিত কি না। পশ্চিমবঙ্গের ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-ছাঁকনিতে সাধারণ মানুষের গভীর সমস্যা তৈরি হয়েছে, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলিই দলিত হয়েছে। এসআইআর পদ্ধতি পাল্টানোর প্রয়োজন নিয়ে ইতিমধ্যেই বহু বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেছেন।
প্রসঙ্গত, তৃতীয় দফার কাজ শুরুর সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটির পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুরোধ। যে ভাবেই হোক, এতগুলি বিবেচনাধীন ভোটার নামের নিষ্পত্তি করা হোক। এঁদের মধ্যে অনেকেই অন্যায় ভাবে বাদ পড়েছেন, একই পরিবারের বাবা-মা ভোটার হলেও ছেলেমেয়ে বাদ গিয়েছেন, কিংবা স্বামীর নাম থাকলেও স্ত্রীর নাম নেই, এগুলির দ্রুত মীমাংসা হোক। এতসংখ্যক মানুষ ভোট দিতে পারেননি, তবুও এ রাজ্যে ভোট সারা হয়ে গিয়েছে তাঁদের বাইরে রেখেই, অগণতান্ত্রিক ভাবে। এখন নতুন সরকার আসার পর তাঁদের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, সরকারের সুযোগসুবিধা, নাগরিক অধিকার কী কতখানি তাঁরা পাবেন, সবই তাঁদের কাছে অনিশ্চিত ঠেকছে। রাষ্ট্রের দিক থেকে নাগরিকের প্রতি এ এক গোড়ার কর্তব্য— নাগরিকের অবস্থান, অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্ট ভাবে জানানো। সে কাজে ইতিমধ্যেই অমার্জনীয় স্খলন ঘটে গিয়েছে। এ বার কাজটি ‘সম্পন্ন’ করার দিকে এগোনো দরকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)