গত ৩ মে দেশ জুড়ে পরীক্ষা হল, তার ন’দিনের মাথায় সে পরীক্ষা বাতিলও হল। তারও তিন দিন পরে আবার ঘোষণা হল নতুন পরীক্ষার তারিখ, ২১ জুন। এ বছর ‘নিট’-এ বসেছিলেন প্রায় ২৩ লক্ষ ছাত্রছাত্রী, ডাক্তারি স্নাতক স্তরের এই সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা এমনিতেই খুব কঠিন, তার প্রস্তুতি সুদীর্ঘ, পরিশ্রম ও ধকলও বিরাট— পরিবারের স্বপ্ন, প্রত্যাশার চাপ ইত্যাদি ছেড়েই দেওয়া যাক। সেই পরীক্ষা যখন প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে খোদ পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাই বাতিল করে, উপরন্তু পুলিশ ও সিবিআই-তদন্তে উঠে আসে এক বিপুল আর্থিক কেলেঙ্কারির চক্র— তাকে কি কেন্দ্রীয় সরকারের চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু বলা চলে? রাজ্যে রাজ্যে নিট-পরীক্ষার্থীরা যে প্রতিবাদে পথে নেমেছেন, পরীক্ষা বাতিলের জেরে উত্তরপ্রদেশে এক পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার মর্মান্তিক ঘটনাও সামনে এসেছে— এর দায় কার? পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)-র প্রধান কিংবা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর তরফে ভুল স্বীকার, দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমাপ্রার্থনা দূরস্থান, উদ্বিগ্ন বিভ্রান্ত লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর উদ্দেশে আশ্বাসবাক্যও শোনা যায়নি। এইটুকুও কি এই ছেলেমেয়েদের প্রাপ্য ছিল না?
‘নিট’ নিমিত্তমাত্র, কিংবা বলা যেতে পারে— হিমশৈলের চূড়াটুকু। কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের শাসনে গত দশ বছরে কম করে ৮৯টি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, ৪৮ বার কোনও না কোনও পরীক্ষা পুনরায় নিতে হয়েছে, বিরোধীদের এই ‘অভিযোগ’কে স্রেফ অবান্তর বিরোধিতা বলে উড়িয়ে দেওয়া চলে না কোনও মতেই, কারণ এই ঘটনা ঘটে চলেছে বারংবার, দেশবাসী ও ছাত্রছাত্রীদের চোখের সামনে। ২০২৪-এর নিট পরীক্ষার পরেও ঘটনাক্রম ছিল এ বারের মতোই: প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ, এনটিএ-প্রধানের পদচ্যুতি, সিবিআইয়ের তদন্ত। কেন্দ্রীয় সরকারের নিযুক্ত রাধাকৃষ্ণন কমিশন সে বার ভবিষ্যতে পরীক্ষা নিশ্ছিদ্র করতে জেইই-মেন’এর মতো ‘কম্পিউটার-বেসড টেস্ট’ করতে বলেছিল, অদ্যাবধি তা মানা হয়নি। প্রশ্নপত্র পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনোর জন্য জিপিএস-যুক্ত গাড়ি, পরীক্ষাকেন্দ্রে উচ্চমার্গের সিসিটিভি-ক্যামেরা— এনটিএ-র এই বজ্র আঁটুনি যে হাস্যকর ফস্কা গেরো বই কিছু নয়, প্রমাণ করে দিয়েছে সদ্য তদন্তে উঠে আসা তথ্য: ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দশ-বারো-পনেরো লক্ষ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে রাজস্থান থেকে হরিয়ানা কিংবা কেরল, দেশ জুড়ে।
বছরের পর বছর, একের পর এক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় এই একই জিনিস ঘটে চলেছে, এবং কেন্দ্রের অধীনে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থার ভিতরের গুরুতর দুর্বলতাগুলোও হাট হয়ে পড়ছে। অথচ পুরনো ব্যবস্থায় রাজ্যভিত্তিক যে প্রবেশিকা পরীক্ষা হত তা নির্বিঘ্নেই হয়ে এসেছে, দরকারে সেই ব্যবস্থাতেই ফিরে যাওয়া হোক— কিংবা যদি তা কেন্দ্রের হাতেই থাকে সে ক্ষেত্রে পরিকাঠামো ও প্রযুক্তি নিশ্ছিদ্র করতে বড় বড় বুলি না আওড়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রক ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি কাজের কাজ করে দেখাক, বিরোধীদের এই অতি সঙ্গত দাবি অবিলম্বে কেন্দ্রীয় সরকারের বিবেচনা করা দরকার। কেন্দ্র পুরো ব্যবস্থাটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে আর সামলাতে পারছে না, বারংবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ ও অবসাদ জন্ম নিচ্ছে, তৈরি হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার এক গভীর সঙ্কট। ভারতের মতো দেশে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানেরও প্রধান সোপান, সেখানে সামান্য অন্যায়ের ধারণাও জনবিশ্বাসকে টলিয়ে দিতে পারে। পরীক্ষাব্যবস্থায় নিঃশর্ত নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা গেলে এমন এক প্রজন্ম তৈরি হবে, যারা শুধু পরীক্ষাব্যবস্থাকেই নয়, ন্যায়বিচার ও মেধার ধারণাকেও সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করবে। শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে তখন দেখা হবে শুধুমাত্র অর্থের সামর্থ্যের বিচারে— এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কী?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)