E-Paper

উন্নয়ন ও কল্যাণ

কল্যাণ প্রকল্পের এই ধারাবাহিকতা থেকে বাদ পড়বেন অন্তত ২৭ লক্ষ মানুষ— যাঁদের নাম এখনও সংশোধিত ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ ০৮:৪৪
শুভেন্দু অধিকারী।

শুভেন্দু অধিকারী। ফাইল চিত্র।

নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল, রাজ্যে চালু থাকা কোনও সমাজকল্যাণ প্রকল্প বন্ধ হবে না। প্রকল্পগুলির নাম বিলক্ষণ পাল্টাবে, এবং তাতে আপত্তি করার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। লক্ষ্মী অথবা অন্নপূর্ণা, ভান্ডারটি যার নামেই হোক না কেন, মহিলাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যদি সময়মতো টাকা ঢোকে, তা হলেই উন্নয়ন গতিশীল থাকবে। ‘মা ক্যান্টিন’-এর নামটি কাগজ দিয়ে ঢেকে রেখেও যদি পাঁচ টাকায় পেট ভরার মতো খাবারের ব্যবস্থা করে সরকার, তা হলে সম্ভবত এক জনও বলবেন না যে, নাম পাল্টানোয় আর খিদে মিটছে না। স্বাস্থ্যসাথী বন্ধ হলেও আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প সঙ্গে সঙ্গেই চালু হবে বলে সরকার আশ্বাস দিয়েছে। মানুষের চিকিৎসা পাওয়া বন্ধ না হলেই যথেষ্ট। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এক দল ক্ষমতাচ্যুত হয়ে অন্য দলের সরকার তৈরি হবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, শাসকের রাজনৈতিক রঙের উপরে নাগরিকের উন্নয়ন-সম্ভাবনা নির্ভরশীল হতে পারে না। তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই হবে। কেউ রাজনৈতিক ভাবে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সম্পূর্ণ বিরোধী হতে পারেন, তাদের উন্নয়ন নীতির মধ্যে ঢুকে থাকা বিবিধ দুর্নীতির প্রবল সমালোচক হতে পারেন— কিন্তু, তাতে প্রত্যক্ষ নগদ বা সুবিধা হস্তান্তর নীতির গুরুত্ব হ্রাস পায় না। তার প্রধানতম কারণ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নীতির উদ্ভাবক ছিলেন না; নীতিটি আন্তর্জাতিক স্তরের উন্নয়ন গবেষণার কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই গোত্রের নীতি অনুসরণ করে বিস্তর সুফল পাওয়া গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও গত দেড় দশকে তার প্রমাণ মিলেছে। কাজেই, সরকার পরিবর্তিত হলেও উন্নয়ন নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানানো বিধেয়। জনহিতই সরকারের চূড়ান্ত কর্তব্য।

কিন্তু, কল্যাণ প্রকল্পের এই ধারাবাহিকতা থেকে বাদ পড়বেন অন্তত ২৭ লক্ষ মানুষ— যাঁদের নাম এখনও সংশোধিত ভোটার তালিকার অন্তর্ভুক্ত হয়নি। গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াতেই বারে বারে দেখা গিয়েছিল যে, নামের বানানের হেরফের অথবা এমন কোনও কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বহু মানুষ, যাঁদের কাছে নাগরিকত্বের যাবতীয় বৈধ নথি রয়েছে। এই নির্বাচনে তাঁরা নিজেদের সংবিধানসিদ্ধ ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ বার তাঁদের কল্যাণ প্রকল্প থেকে ছেঁটে ফেলার এই উদ্যোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মনে রাখা জরুরি যে, এই মানুষদের সিংহভাগই এখনও ভোটার তালিকা থেকে পাকাপাকি ভাবে বাদ পড়েননি— তাঁদের সম্বন্ধে এখনও ফয়সালা হয়নি, এইমাত্র। কাজেই, যত দিন না সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, তত দিন অবধি রাষ্ট্রের কল্যাণ প্রকল্প থেকে তাঁদের বঞ্চনা করা চলে না।

আরও একটি জরুরি প্রশ্ন। শেষ বিচারে যদি তাঁরা ভোটার তালিকা থেকে বাদও পড়েন, সংবিধানের কোন ধারা অনুসারে তাঁদের নাগরিকত্ব নাকচ হতে পারে, সে প্রশ্নের উত্তর কিন্তু অস্পষ্ট। এসআইআর প্রক্রিয়ার গোড়া থেকেই বিরোধীরা বারে বারে অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার ঘুরপথে পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তৈরির কাজ করছে। সংশোধিত তালিকায় নাম না-থাকলে কল্যাণ প্রকল্প থেকে ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্তটির মাধ্যমে নতুন বিজেপি সরকার কি বিরোধীদের সেই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করছে? কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে বিলক্ষণ সারা দেশে, যার অর্থ, এ রাজ্যেও, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তৈরির কাজ করতে পারে। সাংবিধানিক বা আইনি বাধা না-থাকলে সংশোধিত ভোটার তালিকাকে সেই পঞ্জির ভিত্তি হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।কিন্তু, সে কাজ ঘুরপথে করা চলে না। এবং, ভোটার তালিকাকে নাগরিক পঞ্জির ভিত্তি হিসাবে গণ্য করতে হলে সেই তালিকায় সংশোধনের কাজটি প্রশ্নাতীত হতে হবে। যত দিন তা না হয়, তত দিন অবধি রাজ্যের সব নাগরিককেই কল্যাণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা বিধেয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy