E-Paper

কাজের মূল্য

নীতি আয়োগের মতে, বেতনহীন গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য জিডিপি-র ১৫ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ। যা জিডিপি-তে কৃষির অবদানের কাছাকাছি।

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৭:৩৮

পরিবারে মেয়েদের গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য মাসে অন্তত ত্রিশ হাজার টাকা, ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি মামলার রায়ে বলল শীর্ষ আদালত। বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি কোটিশ্বর সিংহের এই রায় বেতনহীন গৃহশ্রম সম্পর্কে সরকার ও সমাজের মনোভাব বদলাতে সাহায্য করবে। দুই বিচারপতি মনে করিয়েছেন, মেয়েরা জাতির নির্মাতা, সংসারের জন্য তাঁদের কায়িক, মানসিক ও আবেগিক শ্রম বস্তুত অমূল্য। যদিও রোজগেরে সদস্যদের উপর ‘নির্ভরশীল’ (ডিপেনডেন্ট) বলে দেখা হয় মেয়েদের, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোজগেরে সদস্যরাই মেয়েদের বেতনহীন গৃহশ্রমের উপরে নির্ভরশীল। সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হবেন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরাও। বাস্তবে ভারতের মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপি-র অঙ্ক নির্ধারণ করার সময়ে মেয়েদের বেতনহীন শ্রমকে ধরা হয় না। তবুও তার মূল্য কত হতে পারে, সে বিষয়ে একটা আন্দাজ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বার বার মেয়েদের গার্হস্থ শ্রমের গুরুত্বকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। নীতি আয়োগের মতে, বেতনহীন গৃহশ্রমের আর্থিক মূল্য জিডিপি-র ১৫ শতাংশ থেকে ১৭ শতাংশ। যা জিডিপি-তে কৃষির অবদানের কাছাকাছি। ব্যক্তিগত স্তরে অবশ্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময়ে গৃহকাজের মূল্য মাসে তিন হাজার টাকার মধ্যেই সীমিত রাখত বিভিন্ন ট্রাইবুনাল এবং আদালত। গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত এক গৃহবধূর পরিবার ক্ষতিপূরণের মামলা করলে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট মাসে তিন হাজার টাকার ভিত্তিতে প্রাপ্যের অঙ্ক ধার্য করে। সুপ্রিম কোর্ট গৃহশ্রমের মূল্যকে দশগুণ বাড়িয়েছে, এবং অতঃপর ক্ষতিপূরণের মামলায় মাসে ৩০ হাজার টাকাকেই গৃহকাজের মূল্য বলে ধরার নির্দেশ দিয়েছে।

এই রায় ভারতের অগণিত মেয়ের মনে আশা এবং আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার করবে। সারা দিন সংসারের কাজ করে মেয়েরা, তবু তাদের ‘কর্মহীন’ বলে দেখা হয়। এই কু-অভ্যাস পরিবারের সদস্য থেকে রাষ্ট্রের সমীক্ষা, সর্বত্র রয়ে গিয়েছে। প্রশ্ন হল, সরকারের কাছে এর তাৎপর্য কী? গৃহশ্রমে নিরত কোনও মহিলা দুর্ঘটনার জন্য কাজে অক্ষম হলে, অথবা নিহত হলে, তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মধ্যেই কি রাষ্ট্রের দায় সীমাবদ্ধ থাকবে? না কি এই রায় মেয়েদের প্রতি রাষ্ট্রের বৃহত্তর দায়বদ্ধতাকে মনে করাচ্ছে, এবং দায় পালনের আহ্বান করছে? সামাজিক ন্যায়ের নিরিখে দেখলে, দ্বিতীয়টিই সত্য। দেশের নির্মাণে গৃহশ্রমের ভূমিকা যতই গুরুতর হোক না কেন, গৃহকাজকে অযথা গৌরবান্বিত করা অনর্থক। ভারতে একটি মেয়ে যে গড়ে পাঁচ ঘণ্টা বেতনহীন গৃহশ্রমে নিযুক্ত থাকে, তা সচেতন নির্বাচনের জন্য নয়। সমাজ-সংসার তার উপর পরিচর্যার সমস্ত কাজ চাপায়। রাষ্ট্র গৃহশ্রম লাঘবের উপযুক্ত প্রযুক্তি বা পরিষেবা সর্বস্তরে পৌঁছে দেয় না। তাই মেয়েরা বেতনহীন গৃহশ্রমে বাধ্য হয়। তাতে তাদের উচ্চশিক্ষা, কর্মনিযুক্তি, নিজস্ব রোজগার ও সামাজিক পরিচিতি লাভের সুযোগ ব্যাহত হয়। দেশের আর্থিক উন্নয়নেও যথেষ্ট গতি আসে না— আরও বেশি মেয়ে সবেতন শ্রমে যোগ দিলে দেশের জিডিপি-র আরও দ্রুত বৃদ্ধি হবে, তা দাবি করে নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা তার জন্য প্রয়োজনীয় নানা ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে।

অতএব গৃহকর্মরত মেয়েদের প্রতি সরকার ও সমাজের দায় কী, তা বোঝা চাই দু’দিক থেকে। এক, গৃহকাজ এবং পরিচর্যার দায়ভার লাঘবের জন্য সহায়ক পরিষেবার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন, ক্রেশ, হস্টেল, ডে কেয়ার সেন্টার, সুলভে রান্না-করা খাবারের ব্যবস্থা, প্রভৃতি। এতে কর্মরত গৃহিণীদের শ্রম লাঘব হবে। দুই, গৃহই যে মেয়েদের কর্মস্থল, তা স্বীকার করে প্রতিটি গৃহের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। পাকা আবাস, পানীয় জল ও বিদ্যুতের সংযোগ, স্বাস্থ্যসম্মত জ্বালানি, পয়ঃপ্রণালী, অগ্নিনিরাপত্তা— ঘরে ঘরে এগুলির ব্যবস্থা করতে হবে। শীর্ষ আদালতের রায়কে জনজীবনে মূর্ত করে তোলার এই হল যথার্থ পথ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Salary

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy