E-Paper

যোগ-বিয়োগ

যোগব্যায়াম যতই চমৎকার হোক, নাগরিকের ঘাড় ধরে তাকে সেই যজ্ঞে যোগ দেওয়ানোর মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা উল্লঙ্ঘনের প্রবণতাটি স্পষ্ট। তার মধ্যে স্কুলপড়ুয়ারাও আছে।

শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৭:৫৭

যোগব্যায়াম সু-অভ্যাস, সে কথা সংশয়াতীত। বিশেষত কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও একই জায়গায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করার বাধ্যবাধকতায় দেশের বহু মানুষেরই শারীরিক সক্ষমতা এমন তলানিতে পৌঁছেছে যে, দৈনিক যোগাভ্যাস করলে তাদের উপকারই হবে। যোগের উপকারিতা শুধু ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। বস্তুত, বৈশ্বিক স্তরে ভারতের অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক রফতানি ছিল যোগব্যায়াম, বিদেশের মাটিতে যা ‘যোগা’ নামে খ্যাতি অর্জন করেছে, বাণিজ্যিক ভাবেও বিস্তর সাফল্য লাভ করেছে। অতএব, দেশের পরিচালকরা যদি যোগ সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করতে, মানুষকে নিয়মিত যোগাভ্যাসে উদ্বুদ্ধ করতে উদ্যোগী হন, তাতে আপত্তি করার কোনও কারণ নেই। ২০১৫ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্যোগে প্রতি বছর ২১ জুন যোগ দিবস পালিত হচ্ছে, দেশের বহু মানুষ তাতে সাগ্রহ যোগ দিচ্ছেন। পরিসংখ্যান পাওয়া মুশকিল, তবে কেউ যদি দাবি করেন যে, এই উদ্যোগের ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ যোগে আগ্রহী হয়েছেন এবং তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, সেই দাবিও সম্ভবত উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। এত দিন পশ্চিমবঙ্গ বহুলাংশে এই কর্মযজ্ঞের বাইরে ছিল— কারণ, আর পাঁচটি জিনিসের মতো এই ক্ষেত্রেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় উদ্যোগ বলে বিষয়টিকে সরকারি স্তরে গুরুত্ব দিতে চাননি। এ বছর নতুন সরকার বিপুল সমারোহে যোগ দিবস পালনের আয়োজন করেছে। রাজ্যের নেতারা সম্ভবত এক যুগের ঘাটতি এক বছরে পুষিয়ে নিতে চান।

সংশয় সেখানেই। যোগব্যায়াম যতই চমৎকার হোক, নাগরিকের ঘাড় ধরে তাকে সেই যজ্ঞে যোগ দেওয়ানোর মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা উল্লঙ্ঘনের প্রবণতাটি স্পষ্ট। তার মধ্যে স্কুলপড়ুয়ারাও আছে। ভোর পাঁচটায় রেড রোডে পৌঁছতে হলে তাদের অনেককেই মাঝরাতে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। সরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রেও সমস্যা একই। আত্মোন্নতির এই আয়োজনে যোগ দেওয়ার বিষয়টি যদি বাধ্যতামূলক না হয়ে ঐচ্ছিক হত, তবে যাঁদের অন্য কোনও সমস্যা নেই, তাঁরাই স্বেচ্ছায় আসতেন। সরকার কি এমন কথা ভাবছে যে, যাঁরা স্থায়ী বা এমনকি অস্থায়ী সরকারি চাকরি করেন, অথবা যারা সরকার-পোষিত বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে, কর্মক্ষেত্র বা বিদ্যালয়ের বাইরের পরিসরেও তাঁদের ব্যক্তি-অধিকারকে গুরুত্ব না দিলেও চলে? তার বাইরেও, রাজ্যের কার্যত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হচ্ছে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে। সরকারের কি এমন আশঙ্কার কোনও কারণ ছিল যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী-সহ সব বিশিষ্ট নেতার আন্তরিক আহ্বানও মানুষকে এই আয়োজনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে না? তাই এমন ঘাড় ধরে উপকারের চেষ্টা?

যোগ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী আসবেন, তার মঞ্চ তৈরির জন্য সাত দিন ধরে রেড রোড বন্ধ রাখছে প্রশাসন। সামাজিক, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক, সব গোত্রের কারণেই রাস্তা বন্ধ থাকার, এবং তজ্জনিত অসুবিধা ভোগ করার বিস্তর অভিজ্ঞতা কলকাতাবাসীর আছে। কিন্তু, মাত্র এক মাস আগে নাগরিক অসুবিধার কথা বলে এই রেড রোডেই দীর্ঘ দিনের প্রথা ভেঙে ইদের নমাজ পড়তে দেওয়া হয়নি। তার জন্য রাস্তা বন্ধ রাখা হত বড় জোর দু’দিন। কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন যে, তা হলে কি ইদের নমাজের ক্ষেত্রে নাগরিক অসুবিধার কথাটি নেহাত অজুহাত ছিল— প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের ধর্মানুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটানো? সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বক্তব্য শুনলে সে বিষয়ে কার্যত নিঃসংশয় হওয়া যায়। কিন্তু, তার পরও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যে রাজনীতিই তাঁরা করে থাকুন, এই মুহূর্তে তাঁরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা পশ্চিমবঙ্গের অভিভাবক। ভাবনায় যা-ই থাকুক, অন্তত আচরণে এই বৈষম্যকে এমন প্রকট না-করে তোলাই বিধেয়। তাতে সংবিধানের আব্রুটুকু রক্ষা হয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

International Yoga Day Narendra Modi Yoga West Bengal government Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy