E-Paper

সংযমের শিক্ষাটা জরুরি

এ রাজ্যে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এই দল যা যা দাবি করে এসেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা হয় তা দেখার জন্য খানিকটা সময় অবশ্যই দরকার।

সোমা মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ০৮:৩১
সূচনা: নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হচ্ছে, ১১ মে।

সূচনা: নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হচ্ছে, ১১ মে। দীপঙ্কর মজুমদার

দেখো রে নয়ন মেলে! কী দেখব? দুর্নীতির একটা পাহাড়ের চূড়ায় বসে রয়েছে এ রাজ্য। সমস্ত স্তরে অনিয়ম। চাকরি পেতে মোটা টাকা ঘুষ। আবাস যোজনার টাকা দিতে স্থানীয় পঞ্চায়েত থেকে বখরা দাবি। লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে প্রতি মাসে চাঁদা পাড়ার নেতার পকেটে। নিজের টাকায় নিজের জমিতে নির্মাণ? এলাকার নেতা নিজের সিন্ডিকেট নিয়ে চলে আসে জোর খাটাতে। নেতা নিজেই প্রোমোটার হয়ে দাপিয়ে বেড়ায় পাড়ায় পাড়ায়। সরকারি হাসপাতালে ওষুধ-স্যালাইন-চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতে দেদার কাটমানি। এমনই তার বহর যে, কী কেনা হল তার মানটুকু পর্যন্ত যাচাই হয় না। মানুষ ভুগছে। মানুষ মরছে। এমন তো হয়েই থাকে! দলের সঙ্গে ন্যূনতম যোগাযোগটুকু থাকলেই যে কোনও অপরাধের ছাড়পত্র! পুলিশে অভিযোগ জানিয়ে ফল হয় না। এমনকি নেতার হাত মাথায় থাকলে থানায় দাঁড়িয়ে পুলিশকে শাসিয়ে টেবিলের নীচে পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। রাজ্যে চাকরি নেই। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিকেয়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনও উচ্চ পদেই নেতাতন্ত্র।

এই রকম পরিস্থিতি থেকে যখন ক্ষমতায় বদল আসে, তখন মনে হয়, সেটা যত না একটা অন্য দলের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা থেকে, তার চেয়ে অনেক বেশি যা চলছে তার থেকে মুক্তির আশায়। তার পর ধীরে ধীরে সেই দলকে নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে জায়গা পোক্ত করতে হয়। সেও অগ্নিপরীক্ষা। বিজেপি সেই পরীক্ষায় কতটা উত্তীর্ণ হতে পারবে, এই মুহূর্তে সেটাই বড় প্রশ্ন।

এ রাজ্যে দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এই দল যা যা দাবি করে এসেছে, তার বাস্তব প্রতিফলন কতটা হয় তা দেখার জন্য খানিকটা সময় অবশ্যই দরকার। প্রশাসনিক রদবদল, দুর্নীতির মামলায় পদক্ষেপ, নয়া শিল্পনীতি কিংবা কর্মসংস্থানের রূপরেখা— সব কিছুর উপরেই এখন নজর থাকবে। প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপের উপর বেশ কিছুটা নির্ভর করছে এই সরকারের উপর মানুষের প্রাথমিক ভরসা তৈরির বিষয়টি। যদিও ভুললে চলবে না, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারও প্রথম কয়েক মাসে অনেক আশা জাগানো পদক্ষেপ করেছিল। সেটা বদলে যেতে সময় লাগেনি।

এ রাজ্যে মানুষ এখন হন্যে হয়ে কাজের আশা করছেন। এখান থেকে ভিনরাজ্যে যাওয়া শ্রমিকেরা বহু ক্ষেত্রেই নিদারুণ বঞ্চনা আর অত্যাচারের শিকার। তবু তাঁদের না গিয়ে উপায় নেই, কারণ এ রাজ্যে কাজ নেই। বছরের পর বছর রাজ্যের বহু ছেলেমেয়ে স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পরেই ভিনরাজ্যে চলে যায় পরবর্তী স্তরের লেখাপড়ার জন্য। এখানে যথাযথ শিক্ষার ব্যবস্থা নেই, শিক্ষা শেষ হলে চাকরি নেই। বাবা-মায়েরা জানেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা আর যা-ই করুক এ রাজ্যে থাকবে না। কারণ এখানে তাদের জীবিকার যথাযথ ব্যবস্থা হওয়ার ন্যূনতম আশাটুকুও নেই। ব্যবসায়ী এবং মধ্যবিত্তদের একাংশ আশা করছেন, বিজেপি সরকার কেন্দ্রীয় সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে রাজ্যে নতুন শিল্প আনবে। কিন্তু ঠিক কী ধরনের কাজ তৈরি হতে চলেছে সেটাই মূল প্রশ্ন। এ বারের নির্বাচনের আগে শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বড় বিনিয়োগ আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বড় শিল্প তো জরুরি বটেই, পাশাপাশি ছোট ব্যবসায়ী ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকেও আর্থিক সহায়তা দিতে পারলে তার প্রভাব গ্রামীণ অর্থনীতিতে পড়বে। দরকার সঠিক ভাবনা ও তার বাস্তবায়নের চেষ্টা।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নিজেদের ইগো-র কারণে বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প অস্বীকার করেছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা তারা মাথাতেই আনেনি। এখন বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় আসায় কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় বাড়বে বলেই আশা করা যায়। ফলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা বণ্টন, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসতে পারে বলে আশা করছেন সাধারণ মানুষ।

সমস্ত স্তরে অনাচারের পর্ব পেরিয়ে এসেছে এই রাজ্য। নতুন দল ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের বড় অংশ আশা করছেন, প্রশাসনিক স্তরে জবাবদিহি বাড়বে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ করা হবে। নয়া সরকার ইতিমধ্যেই দুর্নীতির তদন্তে দ্রুততার আশ্বাস দিয়েছে।

কিন্তু শুধুই কি পুরনো দুর্নীতির তদন্ত? নিজেদের প্রশাসনকেও একই ভাবে জবাবদিহির আওতায় রাখা হবে কি? গ্রামীণ এলাকায় আবাস যোজনা, ১০০ দিনের কাজ কিংবা পঞ্চায়েত স্তরের প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ছোট ছোট স্তরে সর্বত্র, হ্যাঁ সর্বত্রই ‘টাকা খাওয়া’-র যে সংস্কৃতি তৃণমূল তৈরি করেছিল, যে দুর্নীতি কার্যত সরকারি সিলমোহর পেয়েছিল তৃণমূল জমানার প্রথম দফা থেকেই, সেটাকে সমূলে আঘাত করে স্বচ্ছ প্রশাসন তৈরি হোক সেটাই চান সাধারণ মানুষ। সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে নতুন সরকারের তরফে স্বচ্ছতার বার্তা, ‘ব্যক্তি অনুপ্রেরণা’ থেকে মুক্ত হওয়ার নির্দেশ, কাটমানি-সিন্ডিকেট-অবৈধ খাদান-পাচার বন্ধে কড়া পদক্ষেপের বার্তায় এ রাজ্যের ঘরপোড়া মানুষ এখনও বিশ্বাস করেননি। সেই বিশ্বাস তৈরি করা আসলে একটা নিরন্তর প্রক্রিয়া, শুধু কিছু সরকারি প্রকল্প চালু রাখা, কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়ানো ইত্যাদি দিয়ে বেশি দিন মানুষের ভরসা অটুট রাখা যাবে না।

আসল ও প্রধান কথা হল কাজ। কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি দূর করার প্রশ্নে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, “না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা।” অনেকেই ভরসা করেছিলেন সেই কথায়। গত বারো বছরে দেশের রাজনীতি বলছে, সেই ভরসা বহু স্তরেই ধাক্কা খেয়েছে নির্মম ভাবে।

আমরা দেখে এসেছি, নির্বাচনের সময় থেকেই রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং হিংসার অভিযোগ বার বার সামনে এসেছে। তাই নতুন সরকারের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ রাজ্যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ মানুষ আশা করেন, বিরোধী মত দমন নয়, বরং নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সেই নিরপেক্ষতার পরিচয় বিজেপি গোড়াতেই দিতে পেরেছে এমন কথা হয়তো বিজেপি দলীয় নেতৃত্বও দাবি করবেন না। ক্ষমতায় আসার পর ঘটে গিয়েছে অনেক অশান্তি, বিরোধীদের উপর অনেক অত্যাচার। তাই নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা এখন তাঁদের সবচেয়ে বড় কাজ।

তাঁদের দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে হবে। আর সেই নিয়ন্ত্রণ যেন শুধু মিডিয়ার সামনে কথার কথা না হয়ে ওঠে। মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারকে খর্ব করলে মানুষ বেশি দিন সেটা মেনে নেন না, এই শিক্ষা মাথায় রাখাটাও জরুরি। বিরুদ্ধ মত এলেই তাকে জেলে পুরতে হবে, এমন মরিয়া দশা কেন? এমন নজির দেখলে তো পুরনো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মনে পড়ে।

আর শিক্ষা? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ঘরে ঢুকে তাঁকে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা, কলেজে ঢুকে স্লোগান, নিজেদের ইচ্ছেমতো মনীষীদের ছবি সরানো, আর সে সব সামনে এলে ‘এর সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই’ বলে নিষ্পাপ সাজার চেষ্টা? ন্যূনতম আশাও কি জাগে তাই দেখে? নেতৃত্ব কি বুঝছেন সে কথা?

ভোটের ফল বেরোনোর পর বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। জানতে চেয়েছি, কাজ চাইছেন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন চাইছেন, এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি করে কী চাইছেন নতুন সরকারের কাছে? তাঁদের একটা বড় অংশ বলেছেন, ধর্মের নাম করে পাশের মানুষের হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা যেন বন্ধ হয়। বিভাজনের রাজনীতি করতে চেয়ে ইতিমধ্যেই অনেকটা সফল হয়েছে বিজেপি। আর নয়। পাশাপাশি মিলেমিশে থাকার রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। সেটা পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আগে থামতে শিখুন নেতারা। নির্যাতন নয়, তোষণও নয়, পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখে যেন বাঁচি আমরা। ‘ওই বাংলাদেশিটা’, ‘ওই রোহিঙ্গাটা’ বলে হুঙ্কার ছাড়ার সময়ে আমরা যেন মনে রাখি আমরা কোনও এক জন মানুষের সম্পর্কে কথা বলছি।

অপরকে সম্মান করার সেই সংস্কৃতি যেন এই রাজ্য থেকে চিরতরে হারিয়ে না যায়। রাজ্য যেন ভুলে না যায়, “মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তই তার অধীন।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Suvendu Adhikari TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy