অনেকের মতে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন আর ১৯৭৭ সালের জাতীয় নির্বাচনের অনেক মিল আছে। অনেকগুলো কারণ বলা হচ্ছে: প্রথমত, ২০২৬ সালের আগে পনেরো বছর পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতৃত্বে যে শাসন চলেছিল, সেটা শেষ পাঁচ বছরে অপশাসনে পরিণত হয়েছিল। এটা ঠিক যে, ২০১১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত যে শাসন পশ্চিমবঙ্গে চলেছিল, সেই প্রশাসন অনেকের কাছে প্রশংসা পেয়েছিল। কিন্তু ২০২১ থেকে ২০২৬ যে শাসন পশ্চিমবঙ্গ দেখল, সেই শাসনের চরিত্র একেবারেই আলাদা।
বাস্তবিক, ইন্দিরা গান্ধীর যে অপশাসন আমরা ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত দেখেছিলাম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের শেষ দফা তারই একটা অন্য রূপ বললে অত্যুক্তি হয় না। ২০২৬-এর বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল থেকে বলাই যায়, এই নির্বাচন মূলত তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতৃত্বের অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের মতামত। যে ভাবে গত পাঁচ বছরে শাসনের নামে অপশাসন চলেছে, তার বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হয়েছিল, যার ফলাফল আমরা ২০২৬-এর নির্বাচনে দেখলাম।
বিজেপির সমর্থকরা তবুও বলতে চেষ্টা করবেন যে, এই ভোট বিজেপির পক্ষেই মতদান। কিন্তু ভোট যাঁরা বিশ্লেষণ করেন, তাঁদের পক্ষে এখনই এ কথা মানা মুশকিল হতে পারে। তার কারণ, ভোটারদের মতামত কতটা বিজেপির পক্ষে, আর কতটা তৃণমূলের অপশাসনের বিপক্ষে, তার চুলচেরা হিসাব অসম্ভব। তবে, ইংরেজি ভাষায় যাকে বলা হয় ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি ভোট’— অর্থাৎ যে সরকার এত দিন প্রশাসন চালিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মানুষ যে মত প্রকাশ করেছেন, তা নানা সমীক্ষাতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এও ঠিক যে পশ্চিমবঙ্গ কখনওই বিজেপি শাসন করেনি, সুতরাং এ বার বিজেপি-ই এ রাজ্যে একমাত্র দল ছিল, রাজ্যশাসনের দিক দিয়ে যার কোনও ইতিহাস নেই, তাই কলঙ্কও নেই— যে কলঙ্ক পশ্চিমবঙ্গবাসী তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে তো বটেই, বাম ফ্রন্টের চৌত্রিশ বছরের শাসনেও দেখতে পেয়েছে। ফলে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা সহজবোধ্য।
এই প্রসঙ্গে, একটা ব্যাপার নিয়ে আরও আলোচনা হওয়া উচিত। ভোটার তালিকা সংশোধন। যে ভাবে এই বারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন হয়েছে, তা নিয়ে একটা তীব্র বিরোধিতা পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই বিরোধিতাকে কোনও ভাবে অসঙ্গত বলা যাবে না— কেননা কোনও গণতন্ত্রে এত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ২৭ লক্ষ ভোটার ভোট দেওয়ার সুযোগই পেলেন না, এমন ঘটনা স্বাভাবিক নয়। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কতখানি গাফিলতি আছে, সেটা এখনও বিচার্য। এই মুহূর্তেও বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচার চলছে। এ কথাও খুব সঙ্গত যে, এই বিচার প্রক্রিয়া ভোটের আগে হলে এই ধরনের সমালোচনার অবকাশ থাকত না।
তবে ভোটের প্রক্রিয়া আর ভোটের ফলাফল আলাদা বিষয়। তাই প্রশ্ন হল, ২৭ লক্ষ ভোটার ভোট দিতে না-পারার কোনও প্রভাব ২০২৬ সালে ভোটের ফলাফলে কি পরিলক্ষিত হল? এখনও তা স্পষ্ট নয়। তবে এটা ঠিক যে, গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে এই প্রথম এত ভোটার ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন, তার ঠিক কী ফল হল তা আদৌ কখনও জানা যাবে কি না জানা নেই। কেন এটা হল, তার ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশনকেই দিতে হবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়া স্বাভাবিক, এবং ব্যাখ্যা দেওয়ার কাজটিও জরুরি।
তবে একটা বিষয়ে সংশয় নেই। বিজেপি এ বারে ভোটের শতাংশ হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে অনেক বেশি সংখ্যক ভোটারদের সমর্থন পেয়েছে। মোটামুটি ভাবে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গের ৪৫ শতাংশ ভোটার বিজেপি দলকে সমর্থন করেছে; সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসকে ৪১ শতাংশ ভোটার তাঁদের সমর্থন দিয়েছেন। অর্থাৎ চার শতাংশের বিভেদে বিজেপি ২০০-র বেশি আসন জিততে পেরেছে। এর মধ্যে একটা বিস্ময়ের দিক আছে, তবে সেটা সম্ভব হয়েছে কেননা, ভারতবর্ষে ভোটের জন্য যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, তাতে অনেক ক্ষেত্রেই যাঁরা কম ভোট পান তাঁরাও জিতে যান। এত দিনে সবাই জানেন যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই পদ্ধতিকে বলে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেম অব ভোটিং’। অর্থাৎ যে দল সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে, সে-ই জয়ী। অথচ সব আসনে জনসংখ্যা সমান হয় না। তাই এই পদ্ধতিতে কোনও দল ভোটে জিতে যেতে পারে— আনুপাতিক হিসেবে কম ভোট পেয়েও। মুশকিল হল, এই পদ্ধতি যত দিন থাকবে তত দিন এই ধরনের ব্যবস্থাকেও আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এও ঠিক যে এই ধরনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভাবে গণতান্ত্রিক নয় বলেই জার্মানিতে ইতিমধ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ভোট দান পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে।
এই নির্বাচন কেন বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, সে সম্বন্ধে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। তবে এটা ঠিক, যাঁরা অত্যাচারিত হয়েছেন, যাঁরা অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের দিকে যদি নতুন সরকার নজর না দেয়, তা হলে কিন্তু এই ভোটারদের প্রতি আবারও অবিচার হবে। পাঁচ বছর পর এই সরকারকেও মানুষ উৎখাত করতে দ্বিধাবোধ করবে না। ভারতের গণতন্ত্র বার বার প্রমাণ করেছে যে, যখন প্রশাসক অত্যাচারী হয়ে ওঠে, তখন জনরোষ অবশ্যম্ভাবী। আমরা ফরাসি বিপ্লবে তা দেখেছি। এমনকি ঘরের কাছে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার সময়ও দেখেছি। পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন বিপ্লবের পর্যালোচনা করলেই আমরা দেখতে পাই এই সত্য, সুতরাং মেনে নেওয়া যেতে পারে মানুষ শেষ অবধি অন্যায়ের শাস্তি দেন। তাই এই নির্বাচনে যাঁরা জিতলেন, তাঁরাও মনে রাখবেন যে, কতখানি দায়িত্ব তাঁদের উপর এসে পড়েছে। সেই দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করার জন্য তাঁরা প্রস্তুত কি না, সেটাই এ বার দেখার।
এটাও রাজ্যবাসী আশা করেন যে, এই সরকার যেমন সকল অত্যাচারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দিকে নজর দেবে, তেমনই কোনও নিরীহ মানুষকে ধর্ম ও জাতপাতের ভিত্তিতে কোনও ভাবে অত্যাচারিত হতে দেবে না। এই পশ্চিমবঙ্গে বরাবরই বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস ছিল, আছে এবং থাকবে। এই রাজ্যের ইতিহাস বলে, ধর্ম-বিভাজনের ঊর্ধ্বে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সে জানে। এমনকি ১৯৪৭ সালে যেখানে পশ্চিম পঞ্জাবে একের পর এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু এর তেমন কোনও প্রভাব পড়েনি। পরবর্তী কালেও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পরিমাণ ও তীব্রতা এই রাজ্যে উল্লেখযোগ্য রকমের কম। এই ধারা যাতে অব্যাহত থাকে, তা দেখা নতুন সরকারের কাজ। নতুন আদর্শ প্রতিষ্ঠার দায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)