E-Paper

বিশ্বশক্তি যখন দুর্বল

ট্রাম্পের চিন সফর আদতে হওয়ার কথা ছিল ৩১ মার্চ-২ এপ্রিল। কিন্তু ওই সময়ে ইরান যুদ্ধ তাঁর সমস্ত মনোযোগ দাবি করেছে। ইজ়রায়েলের কথায় বিশ্বাস করে তিনি ভেবেছিলেন যে তেহরানকে সহজেই পর্যুদস্ত করা যাবে, বাস্তবে তা হয়নি।

প্রণয় শর্মা

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ০৭:০০

সারা বিশ্বের নজর এখন একটি বৈঠকের দিকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মুখোমুখি বসবেন ১৪-১৫ মে। তেলের দাম যখন পূর্বের সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে, নানা অত্যাবশ্যক পণ্য জোগান-শৃঙ্খলায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, বিশ্ববাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে ট্রাম্প-আরোপিত শুল্কের জন্য, সেই সময়ে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির শীর্ষ নেতারা বসছেন বৈঠকে। গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানেও তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল, কিন্তু তখন পরিস্থিতি ছিল আলাদা— আমেরিকার বর্ধিত শুল্কের কাছে প্রায় সব দেশ নতিস্বীকার করার জন্য ট্রাম্পের মনোবল ছিল তুঙ্গে। বেজিং-বৈঠকে বসতে চলেছেন যে ট্রাম্প, তাঁর অবস্থান কিন্তু অনেকটাই দুর্বল। ইরানের অর্থহীন যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনও সময়সীমা দেখা যাচ্ছে না, ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান টাল খেয়েছে, সামরিক ব্যয় হিসেব ছাড়িয়ে গিয়েছে। এ সবই বৈঠকের সুরটি নির্ধারণ করবে।

ট্রাম্পের চিন সফর আদতে হওয়ার কথা ছিল ৩১ মার্চ-২ এপ্রিল। কিন্তু ওই সময়ে ইরান যুদ্ধ তাঁর সমস্ত মনোযোগ দাবি করেছে। ইজ়রায়েলের কথায় বিশ্বাস করে তিনি ভেবেছিলেন যে তেহরানকে সহজেই পর্যুদস্ত করা যাবে, বাস্তবে তা হয়নি। যুদ্ধে একটা ফয়সালা করে বিজয়গর্বে প্রবেশ করবেন চিনে, খানিকটা এই আশাতেই তিনি চিন সফর পিছিয়েছিলেন। কিন্তু এন্তার বোমাবর্ষণ করে, ইরানকে পৃথিবী থেকে মুছে দেওয়ার হুমকি দিয়েও লাভ হয়নি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এখন বিব্রত, আশাহত— সামরিক কিংবা কূটনৈতিক, কোনও দিক থেকেই তিনি ইরানকে বাগে আনতে পারেননি। বরং হরমুজ় প্রণালীতে জাহাজের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে ইরান আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের মিলিত ক্ষমতা রুখে দিয়েছে, দুই দেশেরই নেতৃত্বকে কূটনীতি এবং কৌশলগত দিক থেকে ফ্যাসাদে ফেলেছে। হরমুজ় প্রণালী খুলে দেওয়া হোক, ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের উত্তরে ইরান তার অবস্থানে অটল— ইরানের উপর আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, ভবিষ্যতে আক্রমণ না-করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। রয়েছে আরও কিছু শর্তও, যা আগে মানতে হবে আমেরিকাকে।

ইরান-যুদ্ধ চিনকেও গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। পশ্চিম এশিয়া থেকে চিনে তেলের আমদানি কমে গিয়েছে ২০ শতাংশ। পশ্চিম এশিয়াতে চিনের বাণিজ্যও গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিনও চায় যে হরমুজ় প্রণালীতে অবরোধ উঠুক, কিন্তু আমেরিকার উপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক নানা প্রশ্নে তার সুযোগও নিতে চায় চিন। আরও বড় কথা, চিন আদপেই চায় না যে তেহরানে আমেরিকার প্রতি বন্ধুত্ব-ভাবাপন্ন কোনও সরকার আসুক। তাতে আমেরিকার সামরিক শক্তি পশ্চিম এশিয়া থেকে নজর সরিয়ে ফের ভারত মহাসাগর-প্রশান্ত মহাসাগরকে লক্ষ্য করবে। আমেরিকা যত দিন পশ্চিম এশিয়াতে ব্যস্ত থাকে, ততই চিন সময় পাবে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করতে, আর্থিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে। যে পরিস্থিতি হয়েছে, তাতে ট্রাম্পই বাধ্য হচ্ছেন বেজিং-এর শীর্ষ বৈঠকে এসে হরমুজ় প্রণালী খোলার বিষয়ে চিনের সহযোগিতা চাইতে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, কোনও নেতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে সব অতি-গুরুত্বপূর্ণ দরদস্তুর করেন, তার উপর ছায়া ফেলে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান। দেশের ভিতরে এক নেতার দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাঁর অবস্থানকে নড়বড়ে করে দেয়, বিশেষ করে শি জিনপিং-এর মতো নেতার সঙ্গে দরদস্তুরের সময়ে। ইরানের যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। সংঘাত কবে শেষ হবে, তার কোনও ইঙ্গিত মিলছে না। তার উপর সম্প্রতি আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি অসাংবিধানিক। অপর একটি আদালত ট্রাম্প-আরোপিত স্বল্পমেয়াদি ১০ শতাংশ শুল্ককে খারিজ করে দিয়েছে। ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান দলের সদস্যরা নভেম্বরের মিড-টার্ম নির্বাচনকে নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থনে জনমতের হার (অ্যাপ্রুভাল রেটিং) ১০ শতাংশেরও বেশি পড়ে গিয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে, যা এখনও অবধি নিম্নতম। অর্থনীতি, অভিবাসন নীতি, বিদেশ নীতি, সবই সমালোচনার মুখে পড়েছে। বেজিং বৈঠককে ‘সাফল্য’ বলে দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে ট্রাম্প এখন উদ্‌গ্রীব। সেই অর্থে শি-এর যত না আমেরিকাকে প্রয়োজন, তার থেকে ট্রাম্পেরঅনেক বেশি প্রয়োজন চিনকে। অনেক বিশেষজ্ঞই এ বিষয়ে একমত— তাঁরা মনে করাচ্ছেন যে চিন এই বৈঠকের প্রস্তাব দেয়নি। আমেরিকাই আসছে চিনের কাছে। তাই চিন মনে করতেই পারে যে তারা একটু এগিয়ে রয়েছে।

আমেরিকার প্রথম যে প্রেসিডেন্ট চিনে গিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, তিনি রিচার্ড নিক্সন। ১৯৭২ সালের ২১-২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি চিন সফরে যান। কূটনৈতিক বিচক্ষণতার সঙ্গে নিক্সন সোভিয়েট ইউনিয়ন আর চিনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে বেজিং গিয়েছিলেন। রাশিয়ার সঙ্গে দরদস্তুরে কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়া ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এই সফরের পরে আমেরিকার নীতিতে বড়সড় পরিবর্তন আসে— কমিউনিস্ট চিনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয় আমেরিকা। এই সফরের ফলে কমিউনিস্ট চিন এবং কমিউনিজ়ম-বিরোধী আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক সহজ করার পথ তৈরি হয়।শেষ অবধি প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ১৯৭৯ সালে আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক সরিয়ে আনেন তাইওয়ান থেকে বেজিং-এ। তাইওয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল হয়। বেজিং-এর ‘এক চিন’ নীতি মেনে নেয় আমেরিকা, যা বেজিং-কেই চিনের ক্ষমতার কেন্দ্র বলে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭২ সালে নিক্সন-এর সফরকে বলা হয়, ‘যে সপ্তাহ বদলে দিয়েছিল বিশ্বকে’। এমন কোনও প্রত্যাশা গড়ে ওঠেনি ট্রাম্পের সফরকে নিয়ে।

আমেরিকার তুলনায় চিন কিছুটা সুবিধাজনক জায়গায় থাকলেও, চিনেরও রয়েছে তার নিজস্ব নানা সমস্যা। সেখানে আবাসন ক্ষেত্র সঙ্কটে, উচ্চপ্রযুক্তি-দ্বারা চালিত আর্থিক বৃদ্ধির পাশাপাশি কাজের আকাল বেসামাল করছে সমাজকে। বেকারত্ব ছাড়িয়ে গিয়েছে ২১ শতাংশ, জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নব্বইয়ের দশকের পর থেকে নিম্নতম। দেশের অভ্যন্তরে ভোগব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতির উন্নতি করা এক বড়সড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু আশার কথাও রয়েছে— আমেরিকার থেকে সরে এসে বাণিজ্যকে আরও বহুমুখী করে তোলায় চিনের বাণিজ্য ছাড়িয়ে গিয়েছে ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এ-যাবৎ বৃহত্তম। আমেরিকার বর্ধিত শুল্কের আরোপ চিনের উৎপাদন ক্ষমতাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। বরং চিনের রফতানি বেড়ে গিয়েছে ১৪ শতাংশ।

ট্রাম্প সম্ভবত হরমুজ় প্রণালী খোলার জন্য, এবং ইরানে যুদ্ধের অবসানের জন্য চিনের সহায়তা চাইবেন। কিন্তু ইরানের উপর আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তোলা, ভবিষ্যতে ইরানের উপর আক্রমণ না-করার প্রতিশ্রুতি আমেরিকা না-দিলে চিনও পরিবর্তন আনতে পারবে বলে মনে হয় না।

তবে চিন ও আমেরিকা, দু’দেশই কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আশা করতে পারে, যেমন বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার অবসান, দু’দেশের মধ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো, বোয়িং বিমান ক্রয়, আমেরিকা থেকে গোমাংস এবং সয়াবিন আমদানি, শুল্ক হ্রাস, সেমিকন্ডাক্টর-এর মতো যন্ত্রাংশের রফতানিতে বাধা শিথিল, এবং তাইওয়ানে বিরল খনিজের বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতি, প্রভৃতি। চিন চাইছে তাইওয়ানকে পুনরায় বেজিং-চালিত গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে। আমেরিকা তাতে কোনও বাধা তৈরি করুক, চিন তা চায় না। খুব বড় কোনও পরিবর্তন আশা না-করলেও চিন চায় আমেরিকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক, যাতে সরকার নিজের দেশের অভ্যন্তরে আর্থিক সঙ্কটগুলির মোকাবিলা করতে পারে। ট্রাম্প যদি দেশে ফিরে ‘সফল সফর’-এর প্রচার করতে চান, চিনের তাতে আপত্তি থাকার কথা নয়, যদিও ট্রাম্পের সঙ্কটের বাস্তবটা তাতে ঢাকা পড়বে না।

এ বছর ট্রাম্প এবং শি-এর চার বার সাক্ষাৎ হওয়ার কথা। যত ক্ষণ তাঁরা আলোচনার মধ্যে সমাধান খুঁজবেন, তত ক্ষণ বিশ্বে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা এড়ানোর একটা সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্রে অবশ্য পরিবর্তন আসবে না, অন্তত আরও বেশ কয়েকটি বছর।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US-China relation US-China USA China

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy