এক দিন প্রশাসনে শিক্ষানবীশ থাকাকালীন এক প্রান্তিক শ্রমজীবীর কাছে নাগরিকের প্রত্যাশার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর পাঠটি পেয়েছিলাম। মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে, গামছা নেড়ে হাওয়া খেতে খেতে তিনি বলেছিলেন— সরকারের কাছে তাঁর চাওয়ামাত্র চারটি: কেউ অন্যায় করলে যেন বিচার মেলে; সন্তানেরা স্কুলে গেলে শিক্ষক যেন যত্ন নিয়ে পড়ান; অসুস্থ হলে ডাক্তার যেন ঠিকমতো দেখেন; আর কাজ না থাকলে যেন কিছু কাজের ব্যবস্থা হয়। সদ্য কলেজ-পাশ করা আমার তখন মনে হয়েছিল— এ আর এমন কী! আজ, অর্ধশতাব্দী পরে বুঝি, এই আপাতসরল দাবিগুলি পূরণ করা রাষ্ট্রের জন্য কতটা কঠিন। তাই রাজ্যের নতুন শাসকদের কাছে আমার আবেদন— এই অসম্পূর্ণ, অথচ মৌলিক প্রত্যাশাগুলোকেই যেন অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রথম প্রত্যাশা— ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে ২০০৫ সালের বিহারের কথা। তখনকার প্রশাসনিক সঙ্কট ছিল গভীর: আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ভেঙে পড়া পরিকাঠামো, আর সর্বোপরি জনবিশ্বাসের সঙ্কট। সেই বছর দু’দফায় বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল; নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসাবে গিয়ে মনে হয়েছিল, এ রাজ্যের ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর পরে, সেই বিহারের প্রশাসনিক রূপান্তর নিয়ে বিশ্ব জুড়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক সুসংগঠিত শাসন-দৃষ্টিভঙ্গি। বিহারের অভিজ্ঞতা আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রথমত, দক্ষ ও সৎ আধিকারিকদের চিহ্নিত করে তাঁদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, একটি সুসংহত নীতির কাঠামোর মধ্যে থেকে তাঁদের ক্ষেত্রভিত্তিক সংস্কারের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয়ত, ফলাফলের ভিত্তিতে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছিল।
সংস্কারের সূচনা হয় আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা দিয়ে। দ্রুত বিচার, আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধে লক্ষ্যভিত্তিক মামলা, এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ— এই সবই করা হয়েছিল, কিন্তু বিচার-বহির্ভূত পন্থায় নয়। আর্মস অ্যাক্ট-এর কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছিল।
আরও একটি কৌশল ছিল উল্লেখযোগ্য— পুরো আমলাতন্ত্রকে একযোগে বদলানোর বদলে ‘উৎকর্ষের দ্বীপ’ তৈরি করা। কয়েক জন দক্ষ আধিকারিকের নেতৃত্বে ছোট ছোট সাফল্যের কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, যেখান থেকে ধীরে ধীরে সংস্কারের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কাঠামো তৈরি হয়; পরিকাঠামো, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যোগ্য নেতৃত্ব স্থাপন করা হয়। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল আমরা চোখের সামনে দেখেছিলাম— ২০০৫ থেকে ২০১০-এর মধ্যে বিহারে প্রথমে আইনশৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তার পর ধাপে ধাপে উন্নয়ন, পরিকাঠামো, সামাজিক খাতে অগ্রগতি।
আমার প্রথম প্রত্যাশা তাই স্পষ্ট: এখানেও যেন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পুলিশ ব্যবস্থার উপর জনআস্থা ফিরে আসুক; প্রশাসন দলীয় প্রভাবমুক্ত হোক; নিয়মিত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। গণতান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতির পদটি বিরোধী দলের হাতে দেওয়া হোক। রাজ্যের পাবলিক সার্ভিস কমিশন আবার সেই মর্যাদায় ফিরে যাক, যেখানে তা সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকে।
দ্বিতীয় প্রত্যাশা শিক্ষা নিয়ে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা একাধিক শ্রেণিকে এক শিক্ষকের উপর নির্ভরশীল করে রাখার প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে— কারণ এ ভাবে শিক্ষার ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষা নিয়ে সঙ্কল্পপত্রে যে প্রতিশ্রুতিগুলি দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে আমি বিশেষ ভাবে যোগ করতে চাই উচ্চমানের প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার প্রশ্নটি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যান বহু গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা দারিদ্র দূরীকরণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলির একটি। অথচ আমাদের বহু অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এখনও খিচুড়ি বিতরণে সীমাবদ্ধ। এগুলির শেখা-খেলার প্রাণবন্ত প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর সময়ের দাবি। বেসরকারি প্লে-স্কুলের দ্রুত বিস্তার প্রমাণ করে, শিক্ষার চাহিদা কতটা তীব্র। সেই চাহিদা পূরণের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারেরই— কারণ শিক্ষার এই প্রথম ধাপেই ভবিষ্যতের সমতা ও সক্ষমতার বীজ বপন হয়।
তৃতীয় প্রত্যাশা স্বাস্থ্যপরিষেবা নিয়ে। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রভৃতি বিমা-ভিত্তিক চিকিৎসা সহায়তার প্রকল্পগুলি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু আসল কাজ হল হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজনই কমিয়ে আনা। আর তার জন্য অপরিহার্য একটি শক্তিশালী, কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে পরিকাঠামো বা দক্ষ মানবসম্পদের তেমন অভাব নেই; সমস্যা বরং তার সঠিক ব্যবহার ও বিন্যাসে। বিদ্যমান সম্পদগুলিকেই যদি যুক্তিসম্মত ভাবে সংগঠিত ও সমন্বিত করা যায়, তা হলে স্বাস্থ্য পরিষেবার মান ও নাগাল— দুই-ই অনেক দূর পর্যন্ত উন্নত করা সম্ভব।
চতুর্থ প্রত্যাশাটি জীবিকাকেন্দ্রিক— এবং সম্ভবত সবচেয়ে জটিল। নতুন জ্ঞানভিত্তিক শিল্প ও অন্যান্য উৎপাদন খাতকে আকর্ষণ করতে একটি আধুনিক শিল্পনীতির প্রয়োজন। বাস্তব ছবিটি কঠিন: রাজ্যের মাথাপিছু আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম, উচ্চ বেতনের শিল্পকর্মসংস্থানের অভাবে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ একটি ‘শ্রম-রফতানিকারী’ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আলু উৎপাদনকারী জেলাগুলিতে চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অনিয়মিত আবহাওয়া ও হিমঘরের অভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই প্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা যে ‘ভূমি রাজনীতি’র বদলে ‘ভূমির উৎপাদনশীলতা’ এবং ক্লাস্টার-ভিত্তিক শিল্পায়নের উপর জোর দিচ্ছেন, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আমার মনে হয়, এই প্রয়াসে স্থানীয় সরকারগুলিকে আরও গভীর ভাবে যুক্ত করা জরুরি। চিন-সহ বহু দেশে স্থানীয় প্রশাসনই জীবিকা সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। আমাদের এখানে গতি বিপরীত দিকে— পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে গিয়েছে। সংবিধানের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের চেতনা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এক সময় গ্রামীণ বিকেন্দ্রীকরণে পথিকৃৎ পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতগুলি আজ কোথায় দাঁড়িয়ে— তা জানার উপায়ও ক্রমশ সীমিত হয়ে এসেছে; সর্বভারতীয় পঞ্চায়েত উন্নয়ন সূচকেও তাদের অনুপস্থিতি তা-ই ইঙ্গিত করে। অথচ অভিজ্ঞতা বলছে, যথাযথ স্বাধীনতা ও তত্ত্বাবধান পেলে পঞ্চায়েতগুলি আজও জীবিকা সৃষ্টির কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
আমার শেষ— এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— প্রত্যাশা তথ্যকে ঘিরে। সরকার তার প্রতিটি কাজের জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করে, কিন্তু ইদানীং সেই তথ্য নাগরিকের নাগালের বাইরে সরে যাচ্ছে। এক সময় রাজ্যের অধিকাংশ দফতরই নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করত, যা বিধানসভায় পেশ হত, আবার ওয়েবসাইটেও রাখা হত। স্বাস্থ্য দফতরের ‘হেলথ অন দ্য মার্চ’-এর মতো প্রকাশনায় রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থার বিশদ ছবি দেখতে পাওয়া যেত। এই ধারাটি প্রায় লুপ্ত। অথচ গণতন্ত্রে তথ্যই নাগরিকের সবচেয়ে বড় শক্তি— এটি ছাড়া জবাবদিহি, অংশগ্রহণ বা নীতির উপর আস্থা, কোনওটাই টিকে থাকে না। তাই প্রত্যাশা, সরকারের কাছে যে তথ্য আছে, তা আবার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হোক। সরকার কী করতে পেরেছে, আর কী করতে পারেনি— এই পুরো চিত্রটি যেন যে কোনও সচেতন নাগরিক নিজের ইচ্ছামতো জানতে পারেন।
অর্থাৎ, কেবল নতুন নতুন পরিকাঠামো প্রকল্পের বিবিধ প্রতিশ্রুতি নয়; বরং রাষ্ট্রের নীরব, দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশা পূরণ করা আইআইটি, আইআইএম গড়ে তোলার চেয়ে অনেক কঠিন— এখানে সাফল্য মাপা হয় মানুষের জীবনের সূক্ষ্ম পরিবর্তনে, আস্থার পুনর্গঠনে। রাতারাতি সমাধান হবে, এমন প্রত্যাশা তাই অবাস্তব। কিন্তু নাগরিক হিসাবে আমরা অন্তত এটুকু দেখতে চাই— যে কাজগুলো শুরু হয়েছে, সেগুলো এগোচ্ছে; কথার বদলে বাস্তবের ভিত ধীরে শক্ত হচ্ছে। শাসনের আসল সাফল্য বড় ঘোষণায় নয়, এই নীরব অগ্রগতির ধারাতেই ধরা পড়ে।
ভূতপূর্ব আইএএস
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)