E-Paper

বাজার মানে তো আমরাই

সকালের শহর কত অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা: কেউ ট্রেন-বাস ধরছে, কেউ হাঁটছে। প্রত্যেকেরই একটা লক্ষ্য আছে, কারও কাছে কাজ মানে রোজগার, কারও কাছে নিজের পরিচয়, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়।

সৈকত সরকার

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ০৭:২৪

যদি একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়, তবে অর্থনীতি আমাদের কিছুই বলে না। চাহিদা, জোগান, দাম— এই শব্দগুলো যেন অনেক পরে আসে। তার আগে আসে একেবারে সহজ কিছু অনুভূতি: ক্ষুধা, ক্লান্তি, ইচ্ছা, লজ্জা, স্বপ্ন। অনুভূতিগুলো আমাদের চালিত করে। আমরা কী কিনি, কী ছেড়ে দিই, কোথায় যাই, কোথায় থেমে যাই, এ-সব সিদ্ধান্তের ভিতরে সেই অদৃশ্য হিসাব কাজ করে, যার নাম আমরা পরে দিই অর্থনীতি। আমরা প্রায়ই ভাবি, মানুষের চাওয়া সোজা: যত বেশি পাবে, তত বেশি চাইবে। বাস্তব এত সরল নয়। আমরা এক দিকে হিসাব করি কতটা দরকার, কতটা সামর্থ্য আছে, অন্য দিকে এমন কিছু চাই যার কোনও নির্দিষ্ট কারণ নেই। দুইয়ের টানাপড়েনেই তৈরি হয় আমাদের জীবন, ধীরে ধীরে তা এক বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

সকালের শহর কত অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা: কেউ ট্রেন-বাস ধরছে, কেউ হাঁটছে। প্রত্যেকেরই একটা লক্ষ্য আছে, কারও কাছে কাজ মানে রোজগার, কারও কাছে নিজের পরিচয়, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। এই ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া এক সঙ্গে মিশে তৈরি করে এক অদৃশ্য স্রোত, যা আমাদের সবাইকে এগিয়ে নিয়ে যায়, থামিয়েও দেয়। এই স্রোতকে আমরা হঠাৎ চিনতে পারি গল্পে, সিনেমায় ঢুকে পড়লে, তারা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতিচ্ছবি। পথের পাঁচালী-তে অপু-দুর্গা ছোট ছোট ইচ্ছের মধ্যে বাঁচে। আমরা দেখি: প্রাপ্তি যখন সীমিত, তখন তার মূল্য অনেক বেশি। তা টাকায় মাপা যায় না। অপরাজিত-তে এসে সেই ছোট জগৎ বড় হয়ে যায়। কিন্তু এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা থাকে; সে পাচ্ছে, সেই সঙ্গে কিছু হারিয়েও ফেলছে। এই টানাপড়েন চেনা: আমরা যখন কোনও সিদ্ধান্ত নিই আজ একটু বাঁচব, না কাল একটু ভাল থাকব, তখন একই দ্বিধার মধ্যে দিয়ে যাই।

মেঘে ঢাকা তারা-য় নীতা নিজের সব কিছু দিয়ে অন্যদের বাঁচিয়ে রাখে; তার নিজের ইচ্ছে, স্বপ্ন চাপা পড়ে যায়। এখানে এক ধরনের নীরব বিনিময়: এক জন দেয়, অন্যরা পায়। এই দেওয়া-নেওয়ার ভারসাম্য সব সময় ন্যায্য হয় না, তবু জীবন চলে। সুবর্ণরেখা-য় এই ভারসাম্য ভেঙে যায়; মানুষ নিজে নয়, পরিস্থিতি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে চাওয়া আটকে যায় বেঁচে থাকার সীমার মধ্যে। আমরা বুঝতে পারি, সব মানুষ সমান ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায় না। একদিন প্রতিদিন-এ রাতে একটি মেয়ের বাড়ি না ফেরা পরিবারকে অস্থির করে তোলে। বোঝা যায়, একটি মানুষের আয়, উপস্থিতি— সাধারণ জিনিসগুলোই কত বড়। আমরা অনেক সময় এগুলোকে স্বাভাবিক ধরে নিই, যত ক্ষণ না তা হঠাৎ হারিয়ে যায়। কলকাতা ৭১-এ দেখি একই শহর, কিন্তু আলাদা আলাদা জীবন: কারও সুযোগ বেশি, কারও কম। চাওয়া আর পাওয়ার দূরত্ব এক সামাজিক বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়।

এই সব ছবির নীরবতার পাশে অন্য এক গতিও এসে পড়ে। এই যাত্রার শুরুটা হয় প্রয়োজন দিয়ে। মডার্ন টাইমস ছবিতে দেখি, মানুষ প্রথমে টিকে থাকতে চায়। শিল্পায়নের চাপে, কাজের অভাবে, অনিশ্চয়তার মধ্যে তার সবচেয়ে বড় চাওয়া একটা কাজ, একটু স্থিরতা। এখানে জীবন মেশিনের ছন্দে বাঁধা, সেই ছন্দ ছাড়া বাঁচা সম্ভব নয়। অর্থাৎ, অর্থনীতি এখানে মানুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া এক বাস্তবতা। আবার বাইসাইকেল থিভস-এ (ছবি) একটি সাইকেল হয়ে ওঠে জীবনের কেন্দ্র। অর্থনীতি এখানে নেমে আসে একেবারে ব্যক্তিগত স্তরে, একটি বস্তুই সেখানে জীবন ও জীবিকার সেতু।

ধীরে ধীরে সমাজ বদলায়, প্রয়োজন জায়গা করে দেয় প্রাচুর্যকে। দ্য গ্রেট গ্যাটসবি-র জগতে মানুষ অন্যের চোখে ধরা পড়তে চায়। অর্থনীতি এখানে পরিচয় গড়ার মাধ্যম: কে কতটা খরচ করতে পারে, তাতেই তৈরি হয় সামাজিক অবস্থান। দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট-এ তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মানুষ আর বাঁচার জন্য চায় না; চায় কারণ সে চাইতে পারে। অর্থনীতি উন্মাদনায় রূপ নেয়। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না, এর ভিতরেই তৈরি হয় ভাঙন। প্যারাসাইট ছবিতে দেখি একই সমাজে ও সময়ে দুই জীবন— একটি উপরে, একটি নীচে। অর্থনীতি এখানে সবার জন্য সমান পথ তৈরি করে না, বরং বিভাজন আরও গভীর করে।

এই দীর্ঘ যাত্রার দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষ নিজের মতো করে বেছে নিচ্ছে, অসংখ্য আলাদা আলাদা সিদ্ধান্তের ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে একটি বড় ছবি: এক সামগ্রিক ব্যবস্থা যার কোনও একক নিয়ন্ত্রক নেই, তবু তা এগিয়ে চলে। অ্যাডাম স্মিথ লিখেছিলেন, মানুষ যখন নিজের স্বার্থে কাজ করে, তখনও সে কোনও অদৃশ্য হাতের দ্বারা এমন ভাবে পরিচালিত হয়, যার ফলে সমাজের সামগ্রিক উপকার হতে পারে। কেউ নিজের লাভের কথা ভাবলেও, সেই সব বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত একত্রে এক বড় ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। কিন্তু এই গল্পগুলো আমাদের দেখায়, সেই অদৃশ্য হাত সর্বদা সমান ভাবে কাজ করে না। কোথাও তা মানুষকে এগিয়ে দেয়, কোথাও বৈষম্য থামাতে পারে না, কোথাও তা মানুষকে এতই ক্লান্ত করে যে সে সব ছেড়ে সরল জীবনে ফিরতে চায়।

চাহিদা ও জোগানের রেখাগুলি জীবনের প্রতিচ্ছবি। আমরা যেমন ভাবি, তেমনই বাজার তৈরি হয়; যেমন ভয় পাই, তেমনই দাম ওঠানামা করে; যেমন স্বপ্ন দেখি, তেমনই নতুন চাহিদা জন্ম নেয়। বাজার কোনও বাইরের যন্ত্র নয়, তা আমাদের আচরণ, আমাদের অদৃশ্য মনস্তত্ত্ব। অর্থনীতিকে বুঝতে গেলে আমাদের নিজেদেরও পড়তে হয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Supply demand Human Behaviour

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy