E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: অধিকারের লড়াই

ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। ঋতুস্রাব নিয়ে ট্যাবু, বিধবা নারীকে সামাজিক ভাবে বঞ্চিত করা, বা নারীর শরীরকে ‘পাপের উৎস’ হিসেবে দেখার প্রবণতা— এ সবই ধর্মীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে চালু রয়েছে।

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ ০৭:২৯

‘ধর্মের দস্তানা’ (১৪-৪) প্রসঙ্গে দু’চার কথা। ধর্মাচরণে নারী-পুরুষ সমান সুযোগ পেল কি পেল না, প্রশ্নটা শুধুমাত্র এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে রয়েছে আরও মৌলিক একটি সত্য: ঐতিহাসিক ভাবে ধর্মীয় কাঠামো নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ হিসেবে দেখেছে। বহু ধর্মগ্রন্থ, আচার ও সামাজিক বিধিনিষেধে নারীকে ‘অশুচি’, ‘নরকের দ্বার’ বা ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে শুধু মন্দিরে প্রবেশাধিকার পেলেই নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়— এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। শবরীমালার মতো ঘটনাগুলি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নারীকে কতটা শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করতে চায়। কখনও বয়স, কখনও শারীরিক অবস্থা, কখনও ‘পবিত্রতা’-র অজুহাতে নারীদের বাইরে রাখা হয়। আদালত হস্তক্ষেপ করে কিছু অধিকার দিলেও, বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে নারীদের সামাজিক হেনস্থা, হুমকি, এমনকি হিংসার মুখোমুখি হতে হয়। বস্তুত, সমস্যা কেবল প্রবেশাধিকারের নয়, সমস্যার শিকড় ধর্মীয় মানসিকতার মধ্যেই নিহিত।

ধর্মীয় কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে। ঋতুস্রাব নিয়ে ট্যাবু, বিধবা নারীকে সামাজিক ভাবে বঞ্চিত করা, বা নারীর শরীরকে ‘পাপের উৎস’ হিসেবে দেখার প্রবণতা— এ সবই ধর্মীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে চালু রয়েছে। এই মানসিকতার ভিতরে থেকে শুধু ধর্মাচরণে অংশগ্রহণ করলেই নারীর মর্যাদা ফিরে আসবে, এটা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রকৃত সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তোলা। যখন নারী নিজেকে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি থেকে বার করে এক জন পূর্ণ মানব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, তখনই তার অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। আইন, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক সচেতনতা এই চারটি স্তম্ভই নারীর মুক্তির পথ দেখাতে পারে।

অতএব, প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই কাঠামোকে প্রশ্ন করা, যা নারীকে যুগের পর যুগ অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে রেখেছে। সমানাধিকারের লড়াই তাই ধর্মীয় কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং একটি যুক্তিনির্ভর, মানবিক সমাজ গঠনের লড়াই হওয়া দরকার।

প্রতাপ চন্দ্র দাস, নবদ্বীপ, নদিয়া

কার অধিকার

‘ধর্মের দস্তানা’ সম্পাদকীয়টি সময়োপযোগী। কেরলের শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশাধিকার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা দুর্ভাগ্যজনক। যারা মহিলাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের বিল আনতে চায়, তারাই ঠিক এর বিপরীতে হেঁটে শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশাধিকার না দেওয়া নিয়ে আদালতে স‌ওয়াল ওঠায়। কারণ হিসেবে যা বলা হচ্ছে, তা নিছকই বাজে যুক্তি। যুক্তি হল— মন্দিরের বিগ্রহ আয়াপ্পাকে চিরকুমার বলে মানা হয় বলে মন্দিরে পবিত্রতা রক্ষা করতে এই নিষেধাজ্ঞা। যদি এই তত্ত্ব মানতে হয়, তবে এই বাংলায় কার্তিক মাসে যে কার্তিক পুজো হয়, তাতে ঋতুমতী মহিলারা অংশগ্রহণ করতে পারেন না, কারণ কার্তিক‌ও তো চিরকুমার। অথচ, তেমন কঠোর অনুশাসনের কথা তো এখানে শোনা যায়নি। ২০১৮ সালে শীর্ষ আদালতের পাঁচ বিচারপতির রায়ে খারিজ হয়ে গিয়েছিল শবরীমালা সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা। দুনিয়ার সব আইন মানবসৃষ্ট। মুশকিল হল, মানুষ তার সুবিধামতো সেই আইন প্রয়োগ করে। শবরীমালার আইন অনেকটাই রাজনৈতিক। এই মামলার এক দিকে রয়েছে রক্ষণশীল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, যা নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। নেতারা সেই রক্ষণশীল সমাজের হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করেন বলেই শীর্ষ আদালতে সরকারি উকিল বলতে পারেন ভারতীয় সমাজে মহিলাদের শীর্ষ স্থানে বসিয়ে তাঁদের পুজো করা হয়।

তারক সাহা, হিন্দমোটর, হুগলি

ভাগ্যনির্ধারক?

শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশে ধর্মগুরুদের নিষেধাজ্ঞায় অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলের কণ্ঠসংযুক্তি এ দেশের মাপে যাকে বলে একেবারে খাপে খাপ। সম্পাদকীয় প্রবন্ধ ‘ধর্মের দস্তানা’ পাঠ করতে গিয়ে এ কথাই মনে হল।

এত সব পড়াশোনা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাধনা, চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করে যে দেশ, সেই একই ভূখণ্ডের বিশিষ্টজনেরা এমন ভাবে ভাবেন? ভিড় বাসে কন্ডাক্টররা হাঁকেন, ‘পিছন দিকে এগিয়ে চলুন’। অনেকটা এমনই অবস্থা নয় কি? অসহায় প্রশ্ন উঠে আসে, এই সময়ে যদি বেঁচে থাকতেন বিদ্যাসাগরমশাই, রাজা রামমোহন রায়, বা তাঁদের মতো অন্য সংস্কারক, তাঁরা কি এমন হাল ছেড়ে বসে থাকতেন? নারীমুক্তি তলিয়ে যেত বিশ বাঁও জলে? না কি তাঁরা রুখে দাঁড়াতেন রুদ্ররোষে?

দ্বিতীয় এক বৃত্তান্তে নিহিত প্রথমটির কার্য-কারণ (পথের কাঁটা, দিল্লি ডায়েরি, ১২-৪)। সাংসদদের কাণ্ড। আমরা সাধারণ নাগরিকরা তো তাঁদেরই সাধারণত অনুকরণ করে থাকি। নতুন থেকে পুরনো সংসদ ভবনে সাংসদদের যেতে হয় প্রায়শই, মাঝে পড়ে মকর দ্বার। সে স্থানটি নাকি মার্জার বাহিনীর অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। জানা গিয়েছে, কোনও এক দিন সিঁড়িতে রোদের মধ্যে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে তিন সাংসদ, এক জন তাকাচ্ছেন আর এক জনের দিকে। কী, না সামনের পথ কেটে পার হয়েছে মার্জার শাবক। এখন কে আগে যাবেন? তাঁরা তাকিয়ে আছেন এমন কারও জন্যে, যিনি জায়গাটুকু পার হয়ে কাটা রাস্তা জুড়ে দিলে এঁরা এগোতে পারেন।

বাস-ট্রাক বা গাড়িচালকদের এমন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের পরিচয় আমরা পাই অনেক সময়। তবে সাংসদদের এমন দুর্বলচিত্ততা আপাতত হাসির উদ্রেক করলেও বিষয়টি গভীর উদ্বেগের। এঁরাই নাকি আমাদের ভাগ্যনির্ধারক।

বিশ্বনাথ পাকড়াশি, শ্রীরামপুর, হুগলি

পথপ্রাণীর জন্য

একটি মানবিক ও সুস্থ সমাজ গড়তে পশুদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া আজ অত্যন্ত জরুরি। সেই কারণেই নতুন সরকারের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হওয়া উচিত— সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে পশুচিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ করা, বিশেষ করে কুকুর-সহ পথপ্রাণীদের জন্য সহজলভ্য পরিষেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে দেখা যায়, গ্রাম হোক বা শহর— ভেটেরিনারি পরিকাঠামো এখনও যথেষ্ট উন্নত নয়। অনেক জায়গায় পশুচিকিৎসাকেন্দ্র নেই, যেখানে আছে সেখানেও চিকিৎসক, ওষুধ বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। ফলে অসুস্থ বা আহত প্রাণীরা সময়মতো চিকিৎসা পায় না, যা এক দিকে প্রাণীদের কষ্ট বাড়ায়, অন্য দিকে জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষ করে পথকুকুরদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও বেশি। নিয়মিত টিকাকরণ ও বন্ধ্যাকরণ না হওয়ায় জলাতঙ্কের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে ওঠে। অথচ প্রমাণিত— সঠিক পরিকল্পনায় টিকাকরণ ও বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি চালানো গেলে এই সমস্যাগুলি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি ব্লক ও শহরে আধুনিক ভেটেরিনারি হাসপাতাল গড়ে তোলা, ২৪ ঘণ্টা জরুরি পরিষেবা চালু করা, এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মোবাইল ভেটেরিনারি ইউনিট চালু করে প্রত্যন্ত এলাকায় পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া দরকার, যাতে কোনও প্রাণী চিকিৎসার অভাবে কষ্ট না পায়। পথকুকুরদের জন্য নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকাকরণ শিবির, বৃহৎ পরিসরে বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি এবং অপারেশনের পর পরিচর্যার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পশু আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কেন্দ্রও তৈরি করতে হবে, যেখানে অসুস্থ প্রাণীরা নিরাপদে থাকতে পারে।

সৌম্যদীপ ঘোষ, তালিত, পূর্ব বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gender Inequality Gender Discrimiation Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy