জমি, বাড়ি, দোকান ভাড়া দিতে পুর-প্রতিনিধি বা পাড়ার নেতাদের অনুমতি লাগবে। লেনদেন পাকা হলে একাংশ দিতে হবে তাঁদেরও। ট্যাক্সি, রিক্সা, অটো, টোটো স্ট্যান্ডে ঢুকতে বরাদ্দ ‘প্রণামী’। রেস্তোরাঁ থেকে বিনা পয়সায় খাবার যাবে, পুরসভার কর্মীরা তাঁদের বাড়ি, ক্লাবে গায়ে-গতরে খেটে দেবেন।
নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই রকম অসংখ্য অপব্যবহারের কথাই এখন ঘুরছে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে। পুকুর ভরাট, সিন্ডিকেট, দালালির মতো আর্থিক অনিয়ম তো ছিলই। তার সঙ্গে এই রকম নিত্যদিনের ‘জুলুমবাজি’ সাধারণ মানুষের মনে যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছিল, এখন সে সবই ঘুরছে সদ্যবিদায়ী শাসক শিবিরের ঘরোয়া আলোচনায়। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘বিজেপি ও কেন্দ্রের শাসক সব ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ রাজ্য নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় এই রকম বাহিনী দিয়ে তার মোকাবিলা সম্ভব নয়! তাই তৃণমূলের প্রতিরোধ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।’’ তাঁর অভিজ্ঞতা, এ সব বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, এ ধরনের অভিযোগ দলের কাছে এলে অভিযোগকারীকেই ‘চিহ্নিত’ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে সন্তুষ্ট করতে হয়েছে দলের এলাকাভিত্তিক ‘মনোনীত’দের।
ভোটের ফল বিশ্লেষণে এখনও সামগ্রিক মূল্যায়নে বসেনি তৃণমূল। প্রাথমিক ভাবে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে কয়েক দফায় দলের নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন, তাতে নির্বাচন কমিশনের ‘পক্ষপাতিত্ব’, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার এবং গণনায় ‘লুটে’র কথা বলেছেন তিনি। সেই সব আলোচনায় দলের পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই-প্যাকে’র কাজে কেন্দ্রীয় সরকারের বাধা দেওয়ার বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু দলের ভাল বা মন্দ কাজের কথা তাঁদের বিশ্লেষণে আসেনি। তবে যে নেতারা এ বারের নির্বাচনে জনসংযোগে ছিলেন, তাঁদের অনেকের অভিজ্ঞতাই ভিন্ন। এক সাংসদের কথায়, ‘‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধির জীবনযাত্রা তো রাজার মতো! ভোটে জিতে যেন নিজের নিজের এলাকার অলিখিত ‘লিজ়’ পেয়েছেন! এটা শুধু শহরে নয়, গ্রামাঞ্চলেও একই ভাবে এই ইজারার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।’’
আগামী ১৪-১৫ মে দলের পরাজিত প্রার্থীদের বৈঠক ডেকেছেন মমতা। তবে সপ্তাহ কেটে গেলেও কেন্দ্রীয় ভাবে মূল্যায়নে বসেননি দলীয় নেতৃত্ব। প্রাথমিক ভাবে এ বারের ভোটে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে বিজেপি-সহ কেন্দ্রের শাসক শিবিরের আগ্রাসী মনোভাবকে চিহ্নিত করা হলেও দলের নানা স্তরে এখন কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। দৈনন্দিন প্রশাসন থেকে দূরে, দলের এমন একটা বড় অংশই মনে করছে, দরজা খুলেই এই তৃণমূলকে দেখে মানুষ তিতিবিরক্ত হয়ে গিয়েছে। ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব বা সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে সামনে রেখে এ সব আড়াল করা সম্ভব হয়নি। নানা ভাবে ভাতা দিলেও মানুষ বুঝেছেন, এ টাকা সরকারের, তৃণমূলের নয়। বরং, তা পেতে নানা ভাবে জনপ্রতিনিধি বা নেতাদের ‘সন্তুষ্ট’ করতে হয়েছে। আর চোখের সামনে তাঁদের বাড়ি-গাড়ির বিলাসবহুল জীবন মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করেছে যে, তৃণমূল মানেই দুর্নীতি, গা-জোয়ারি। এক নেতা মানছেন, ‘‘তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে একটি দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি আর আমাদের নেতারা সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন!’’
আর এই সব পাড়ার ‘দাদা’দের জন্মদিনে, মরসুমী শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের আয়োজনে ছবি, কাট আউটে বিরক্তি চরমে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দলের একাংশের মতে, এ সবের মধ্যে ব্যতিক্রমীদের পরিচ্ছন্নতা আড়ালে চলে গিয়েছে। মানুষ সার্বিক ভাবে প্রত্যাখ্যানের জন্য তৈরি হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)