E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: লাদাখের লড়াই

লাদাখে শীত কালে তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়, আর বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। সেই প্রেক্ষিতেই তিনি বরফের স্তূপ দিয়ে ‘কৃত্রিম হিমবাহ’ তৈরি করেছেন, যাতে বসন্তের শেষে গলিত বরফের জল দিয়ে জলের অভাব মেটানো যায়।

শেষ আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ ০৭:১৬

অশোক ভট্টাচার্যের ‘অঞ্চলের অধিকার ও কেন্দ্র’ (৭-৪) প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। চেতন ভগতের কাহিনি অবলম্বনে আমির খানের অভিনয়ে সমৃদ্ধ থ্রি ইডিয়টস ছবিতে ‘র‌্যাঞ্চো’ চরিত্রটি আমাদের মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিনির্ভর শিক্ষা-পদ্ধতি যে সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী তৈরিতে ব্যর্থ, তা অত্যন্ত সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই ছবিতে। এই চরিত্রকে অনেকে বাস্তবে খুঁজে পান সোনম ওয়াংচুকের মধ্যে। একাধারে শিক্ষাবিদ, অন্য দিকে পরিবেশকর্মী— তিনিও চান সরকারি স্কুল-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। উদ্দেশ্য, সময় ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক, যুগোপযোগী শিক্ষা— অর্থাৎ শিক্ষাকে বহন নয়, বাহন করে তোলার উপায় শেখানো।

লাদাখে শীত কালে তাপমাত্রা মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়, আর বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। সেই প্রেক্ষিতেই তিনি বরফের স্তূপ দিয়ে ‘কৃত্রিম হিমবাহ’ তৈরি করেছেন, যাতে বসন্তের শেষে গলিত বরফের জল দিয়ে জলের অভাব মেটানো যায়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য তিনি সৌরবিদ্যুৎচালিত ভ্রাম্যমাণ তাঁবুও তৈরি করেছেন— হাড় কাঁপানো শীতল সীমান্তে অতন্দ্র প্রহরী জওয়ানদের জন্য খানিক উষ্ণতার ব্যবস্থা। পরিবেশ রক্ষা করেই পর্যটকদের থাকার বিশেষ ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছেন।

অনেক সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ পেয়েছেন, পেয়েছেন বিদেশি অনুদানও। লাদাখের প্রকৃতি ও জনজাতি গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় তাঁর দীর্ঘদিনের লড়াই চলছেই। অনশন কর্মসূচি ও দীর্ঘ পদযাত্রার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে তেমন সাড়া মেলেনি। আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে সোনম অনশন মাঝপথে স্থগিত করেন এবং অনুগামীদের হিংসার পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার প্রতিবাদ করা কি অন্যায়? শান্তিপূর্ণ অনশন আন্দোলন কি নাগরিকরা করতে পারবেন না? পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে প্রশাসনের ঔদাসীন্য বরাবরই দেখা যায়। লাদাখের মতো শান্ত জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে এ ধরনের পরিস্থিতি অভূতপূর্ব। চিন-সীমান্তবর্তী এলাকায় এই ধরনের অশান্তি দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষেও ক্ষতিকর। প্রশ্ন ওঠে, এমন ন্যায্য দাবি মানতে এত অনীহা কেন।

রাজেশ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া

কঠিন পরীক্ষা

অশোক ভট্টাচার্যের ‘অঞ্চলের অধিকার ও কেন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান ভারতের রাজনীতির এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর দিক উন্মোচন করেছে। লাদাখের বর্তমান সঙ্কট কেবল স্থানীয় কোনও দাবি নয়; বরং তা ভারতের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিবেশগত নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা। লাদাখ কেবল একটি ভূ-রাজনৈতিক সীমান্ত নয়, এটি ভারতের ‘তৃতীয় মেরু’ এবং জলনিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের চেয়ে পরিবেশগত ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যথেচ্ছ খনি-খনন এবং বৃহৎ শিল্পপ্রকল্পের হাত থেকে হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা না করলে তা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে সমগ্র উত্তর ভারতের জন্য জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

চিন ও পাকিস্তান-সীমান্তবর্তী লাদাখের মতো অঞ্চলে জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হল স্থানীয় মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা ও সন্তুষ্টি। স্থানীয় জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে বা তাঁদের কণ্ঠস্বর দমন করে কেবল সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা কঠিন। প্রবন্ধে যে ভাবে দমনমূলক পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়েছে, তা ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির পক্ষে নেতিবাচক এবং অন্য রাষ্ট্রগুলির কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

প্রশাসনের উচিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ও ‘স্থানীয় অধিকার’— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি স্থায়ী সাংবিধানিক সমাধান নিশ্চিত করা।

দেবাশিস চক্রবর্তী,মাহেশ, হুগলি

সংলাপের রাস্তা

অশোক ভট্টাচার্যের ‘অঞ্চলের অধিকার ও কেন্দ্র’ প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। সোনম ওয়াংচুকের মুক্তির সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতভেদ, আন্দোলন ও সংলাপের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

লাদাখের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা রক্ষার প্রশ্নে তিনি বহু বার সরব হয়েছেন। তাঁর গ্রেফতারি অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক। জাতীয় নিরাপত্তা আইন মূলত এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি, যেখানে দেশের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি হয়। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ধরনের কঠোর আইন রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করা হয়।

কোনও ব্যক্তিকে দীর্ঘ সময় ধরে বিচার ছাড়াই আটক রাখা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ— এ বার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। লাদাখের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরছেন। সোনম ওয়াংচুক সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। এখানে আর একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ— লাদাখ একটি সংবেদনশীল সীমান্তাঞ্চল। যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, সেখানে যদি মানুষের দাবি ও উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তা হলে তা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

সুতরাং কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত, লাদাখের মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বার করা। গণতন্ত্রের শক্তি দমন নয়, সংলাপ। মতভেদ থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে নেওয়াই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ।

প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি

বিপন্ন

‘অঞ্চলের অধিকার ও কেন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। বহুত্ববাদী এই ভারতভূমিতে বহুমতের সমন্বয়ই স্বাভাবিক। অথচ ন্যূনতম প্রতিবাদী মানুষের উপর বারংবার রাষ্ট্রীয় রোষানল আছড়ে পড়ছে নির্মম, স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায়। যেন এক অদৃশ্য ফরমান— হয় তুমি আমার রোদচশমায় দেশকে দেখো, নচেৎ তুমি দেশবিরোধী।

সোনম দেশের স্বার্থে কী করেননি! তুষারাচ্ছাদিত লাদাখে সেনানীদের জন্য এমন আচ্ছাদন তৈরি করেছেন, যেখানে উষ্ণতার জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন হয় না; ফলে পরিবেশ দূষণও কমে। কৃত্রিম হিমবাহ বা বরফের স্তূপ তৈরির অভিনব কৌশল উদ্ভাবন করেছেন, যা অনাবৃষ্টির সময়ে পানীয় ও সেচের জলের জোগান দেয়। সেই নাগরিককেই আজ ‘আরব বসন্ত’-সদৃশ বিদ্রোহের জনক হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে!

লাদাখের নতুন প্রজন্ম ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে, মূলত কর্মসংস্থানের অভাবে। এই বিষয়ে সোনম দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। সৌরশক্তির পাশাপাশি লাদাখের খনিজ সম্পদের উপরেও শিল্পপতিদের দৃষ্টি পড়েছে। সোনম-সহ বহু পরিবেশবিদ লাগামছাড়া শিল্পায়নের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছেন— লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ বিপন্ন হলে তার অভিঘাত সমগ্র দেশের উপরই পড়বে।

রাষ্ট্রের নীতিতে মণিপুর অশান্ত হয়েছে; লাদাখকেও একই পথে ঠেলে দিলে তা দেশের পক্ষে গভীর বিপদের কারণ হতে পারে। ভুলে গেলে চলবে না— লাদাখের এক দিকে পাকিস্তান, অন্য দিকে চিন। চেতনার এই আচ্ছন্নতা ও বুদ্ধির এই স্থবিরতা আগামী দিনে ভারতকে আরও গভীর সঙ্কটে ফেলবে না তো? মানুষ যে বার বার জানাচ্ছেন— ‘অল ইজ় নট ওয়েল’।

সৌমিত্র মুখোপাধ্যায়,কলকাতা-৮

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sonam Wangchuk Ladakh protests Activist

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy