অশান্তি বাড়ল উপসাগরীয় অঞ্চলে। ১ মে থেকে পেট্রলিয়াম রফতানিকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক এবং ওপেক+ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-র (ইউএই) প্রস্থান একটি সুদূরপ্রসারী পরিণতিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত, যা কেবল একাধিক বৈশ্বিক সমীকরণকে পুনর্বিন্যাস করবে না, সম্ভবত সেগুলোকে অস্থিতিশীলও করে তুলতে পারে। ইউএই-র গোষ্ঠী ত্যাগের কারণ একাধিক। ওপেক-এর সীমাবদ্ধতা ছাড়াই উৎপাদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আবু ধাবি আরও স্বাধীনতা চেয়েছিল। তাদের ইচ্ছে ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ৫০ লক্ষ ব্যারেল (বিপিডি) উৎপাদন ক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা। এর ফলে, বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহ দ্রুত বাড়ত, যা বাজারে দাম কমাতে সাহায্য করত। অথচ, বর্তমান ওপেক কোটার অধীনে ইউএই-র দৈনিক মাত্র ৩৪ লক্ষ ব্যারেলের কাছাকাছি তেল উত্তোলনেরই অনুমতি ছিল, যা তাদের মতে অন্যায্য। তা ছাড়া, ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যুদ্ধে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পর্যটনের জন্য একটি নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে আমিরশাহি-র ভাবমূর্তি মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় তেল উৎপাদন বৃদ্ধি সেই সব খামতি পূরণ করবে, এমনটাই আশা ইউএই-র শীর্ষ নেতৃত্বের।
লক্ষণীয়, ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলির মধ্যেকার উত্তেজনাকেও উন্মোচিত করেছে। সুদান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনের সংঘাতের কারণে ওপেক+-এর তথাকথিত নেতা রিয়াধের সঙ্গে আবু ধাবির সম্পর্ক সাম্প্রতিক কালে তিক্ত হয়েছে। এ ছাড়াও, পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদিদের প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং আরব রাষ্ট্রগুলির উপরে ইরানের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের পরেও যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের তেহরানের প্রতি নরম মনোভাব মোটেই ভাল চোখে দেখেনি ইউএই। পাশাপাশি আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-র ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের রেখা প্রকট হওয়ার আরও একটি কারণ। আসলে, আরব রাষ্ট্রসমূহের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার পাশাপাশি নিজেকে একটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রদানকারী শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী সৌদি আরব। সে ক্ষেত্রে, এ-হেন সিদ্ধান্তকে তাদের ‘জাতীয় স্বার্থ’কে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি স্বাধীন নীতি প্রণয়নের বৃহত্তর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-র প্রস্থান উপসাগরীয় দেশগুলির ঐক্যকে আরও নড়বড়ে করে দেবে। এমতাবস্থায় এক খণ্ডিত আরব বিশ্ব আবু ধাবি-র আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথ আরও প্রশস্ত করবে।
ভারতের জন্য এই পরিবর্তন একটি কৌশলগত সুযোগ এনে দিতে পারে। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারী দেশ হিসেবে, বর্ধিত সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য থেকে লাভবান হবে দিল্লি। লক্ষণীয়, এ ক্ষেত্রে নৈকট্যের এক বিশেষ উপযোগিতা রয়েছে। তবে, এই সুবিধার সঙ্গে ঝুঁকির বিষয়টিও ভুললে চলবে না। হরমুজ় পরিস্থিতি আগামী দিনে তেলের মূল্যের অস্থিরতাও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি পাকা করার পাশাপাশি শক্তির উৎসের বৈচিত্রকরণ অব্যাহত রাখা এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোনোই বুদ্ধির কাজ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)