E-Paper

ঘরের টান

ইংরেজি ‘হোম সিকনেস’ কথাটার মধ্যেও অসুস্থতার এই অনুষঙ্গ মেলে। আধুনিক চিকিৎসা অবশ্য ‘নস্টালজিয়া’-কে অসুখ বলে মনে করে না। বরং বলে, একাকিত্ব, উদ্বেগ, একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে সাহায্যই করে স্মৃতিমেদুরতা।

শেষ আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ ০৭:৪৫

তখন ভরা ভাদ্র মাস, সদ্য জন্মাষ্টমী গিয়েছে, কিন্তু আফগানিস্তানে মনসুন কোথায়? সন্ধ্যার ঝিরঝিরে হাওয়ায় পাগনানের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এক বাঙালি যুবক ভাবছে, “এখন সিলেটে নিশ্চয়ই জোর বৃষ্টি হচ্ছে। মা দক্ষিণের ঘরের উত্তরের বারান্দায় মোড়ার উপর বসে আছে। তার কুড়িয়ে-পাওয়া মেয়ে চম্পা তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর হয়তো বা জিজ্ঞেস করছে, ‘ছোট মিয়া ফিরবে কবে?’” ঘরের জন্য প্রবাসীর মন-কেমন নিমেষে মূর্ত করে তোলে সৈয়দ মুজতবা আলীর কলম (শবনম, ১৯৬০)। মানবচিত্তের এ এক চির-রহস্য— এক দিকে অজানা-অচেনা, অনিশ্চয়তার দিকে ছুটে যেতে চায় সব বন্ধন ছিঁড়ে, অন্য দিকে কেবলই অনুভব করে শিকড়ে ফেরার টান। বাল্য-কৈশোরের নিশ্চিন্ততায়, নিতান্ত পরিচিতের নিবিড় সান্নিধ্যে ফিরে যেতে চায় মন। একান্ত ঘরোয়া, নেহাত সাধারণ কিছু দৃশ্য, শব্দ, গন্ধ সহসা বিহ্বল করে দেয় অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত মানুষকেও। সম্রাট বাবরের মতো তুখোড় যোদ্ধা তাঁর জীবনীতে লিখছেন, “সে দিন একটা খরমুজ এনে দিল, সেটা কাটতে গিয়ে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হল। যতক্ষণ খেলাম, পুরো সময়টা কাঁদলাম আমি।” কাবুলের মনোরম শীতল আবহাওয়া, সেখানকার আঙুর, খরমুজের মতো ফলের স্মৃতি জুড়ে ছিল বাবরের মন। তাঁর জন্মস্থান বর্তমান উজ়বেকিস্তানের ফারগানা, ক্ষমতাচ্যুত হয়ে হিন্দুকুশ পেরিয়ে কাবুল জয় করে বাইশ বছর বাস করেছিলেন সেখানে। বাড়তি সম্পদের টানে ভারত অভিযানে আসেন, কিন্তু শীতল-সুন্দর কাবুলকে ভোলেননি। ফারগানা নয়, ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সারা জীবন কাতর ছিলেন কাবুলের জন্য। তাঁর ইচ্ছানুসারে ভারত-সম্রাটকে মৃত্যুর পর সমাধিস্থ করা হয় কাবুলে। বাবরের খরমুজের মতো, ফরাসি লেখক মার্সেল প্রাউস্ট-এর উপন্যাস ইন সার্চ অব লস্ট টাইম-এর মূল চরিত্রটিকে নিমেষে ছেলেবেলার গ্রামে নিয়ে গিয়েছিল একটি বিস্কুট। তাঁর আন্টি যে এমনই চায়ে-ভেজানো বিস্কুট খেতে দিতেন রবিবার সকালে! পুরনো গির্জা, বাগান, মানুষজন-সহ গোটা গ্রামের ছবি মুহূর্তের মধ্যে প্লাবিত করে তাঁকে। প্রাউস্ট লিখছেন, অতীত যখন নিশ্চিহ্ন, মানুষেরা মৃত, জিনিসপত্র ভাঙাচোরা, বিক্ষিপ্ত, তখনও সে সব কিছু তাদের স্বাদ-গন্ধ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে দীর্ঘ দিন, তাদের মুহূর্তটির অপেক্ষায়।

ফেলে-আসা ঘরের জন্য বেদনা সমগ্র মানবসভ্যতার এক চরিত্র। মহাভারতে যুধিষ্ঠির যে সুখী মানুষের সংজ্ঞায় জুড়েছিলেন ‘অপ্রবাসী’ শব্দটি, তা এই জন্যই। সুখী হতে কে না চায়, কিন্তু দুঃখেই জন্ম নেয় মহৎ সাহিত্য— কালিদাসের ‘মেঘদূত’ থেকে হোমার-এর ‘ওডিসি’, কত না কাব্য লেখা হয়েছে ঘরে ফেরার অপ্রতিরোধ্য আবেগের আলোড়ন নিয়ে। ডিজিটাল যোগাযোগের বিশ্বায়িত জীবনেও সমান জোরদার নস্টালজিয়া। দু’টি গ্রিক শব্দ, ‘নস্টস’ (ঘরে ফেরা) আর ‘আলগোস’ (বেদনা, দুঃখ) মিলিয়ে তৈরি ‘নস্টালজিয়া’ শব্দটি। বাড়ির ফেরার অপূর্ণ ইচ্ছার জন্য যে দৈহিক ও মানসিক ক্লেশ, তাকে ‘নস্টালজিয়া’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন সুইৎজ়ারল্যান্ডের এক ডাক্তারি ছাত্র, জোহানেস হোফার (১৬৮৮)। এর একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত রয়েছে। সতেরো-আঠারো খ্রিস্টাব্দে আল্পসের কোলে পশু-চরানো রাখালদের অনেকে যোগ দিতেন ইউরোপের নানা রাজার বাহিনীতে। নিজের গ্রাম থেকে বহু দূরে, সেনাশিবিরে বসে এই সৈন্যরা যেই শুনতেন কারও গলায় পশুদের বাড়ি ফেরানোর গান, অমনি স্বদেশ-আকুতিতে বিহ্বল হয়ে পড়তেন। সেই রাখাল-যোদ্ধাদের পরীক্ষা করে হোফার নস্টালজিয়ার লক্ষণ বর্ণনা করেছিলেন: গভীর অবসাদ, অনিয়ন্ত্রিত কান্না, নিদ্রাহীনতা, খিদে হারানো, জ্বর, ভুল দেখা, প্রভৃতি। শোনা যায়, যোদ্ধাদের দশা দেখে ইউরোপের সেনানায়কেরা নাকি রাখাল-গীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন।

ইংরেজি ‘হোম সিকনেস’ কথাটার মধ্যেও অসুস্থতার এই অনুষঙ্গ মেলে। আধুনিক চিকিৎসা অবশ্য ‘নস্টালজিয়া’-কে অসুখ বলে মনে করে না। বরং বলে, একাকিত্ব, উদ্বেগ, একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে সাহায্যই করে স্মৃতিমেদুরতা। এই আবেগ তিক্ত-মধুর— তা যেমন আনন্দের মুহূর্তগুলো ফিরিয়ে দেয়, তেমনই জানান দিয়ে যায় যে সে সব দিন ফিরে আসবে না। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে মানুষের জীবনে ধারাবাহিকতার বোধ তৈরি করে, মানববন্ধনকে দৃঢ় করে। জীবনের প্রবল ঝড়ঝাপ্টার সময়ে নস্টালজিয়া যেন মেঘ-ভাঙা রোদের মতো, আনন্দ-আশ্বাসের উষ্ণ স্পর্শ দিয়ে যায়। ঘরে ফেরার টান মানুষকে শেষ অবধি ফিরিয়ে আনে নিজের কাছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nostalgia Human Nature

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy