E-Paper

ব্রাত্য পরিবেশ

রাজ্যের বায়ুদূষণ রোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা-সহ বিবিধ ক্ষেত্রে যার খেসারত দিতে হয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালতে, রাজ্যের উপর চেপেছে বিপুল জরিমানা।

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ ০৮:৩৭

সময়কাল— পনেরো বছর। দায়িত্বপ্রাপ্ত— মোট ন’জন মন্ত্রী। বারংবার মন্ত্রী বদলের চক্রে নিতান্ত অনাদরের এ-হেন দফতরটি পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ দফতর। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রবল দাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ যখন কার্যত বিশ্বের প্রতি কোণে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন এই রাজ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ দফতরটিকে ‘মিউজ়িক্যাল চেয়ার’-এ পরিণত করা হয়েছিল। দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেসে থাকা রাজ্যের বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তালিকার অন্য নামগুলিও যথেষ্ট ওজনদার। এতৎসত্ত্বেও একমাত্র প্রথম পরিবেশমন্ত্রী ছাড়া কেউ-ই নিজেদের মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। স্বাভাবিক ভাবেই, দফতরের কাজ অবহেলিত হয়েছে। রাজ্যের বায়ুদূষণ রোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা-সহ বিবিধ ক্ষেত্রে যার খেসারত দিতে হয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালতে, রাজ্যের উপর চেপেছে বিপুল জরিমানা।

লক্ষণীয়, এই পনেরো বছর সময়কালে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে, একাধিক ঐতিহাসিক পদক্ষেপও ঘোষিত হয়েছে আন্তর্জাতিক স্তরে। এর ঠিক পূর্বে, ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ (আইপিসিসি)-এর চতুর্থ রিপোর্ট। এই রিপোর্টেই বিভিন্ন প্রমাণের মধ্য দিয়ে জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠার তত্ত্বটি। এবং এই উষ্ণতা বৃদ্ধির মূল সম্ভাব্য কারণ (নব্বই শতাংশ) হিসাবে উঠে আসে মনুষ্যসৃষ্ট কাজকর্মের কথা। সতর্ক করা হয়, সমুদ্রের জলতল বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে এবং বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে তা উষ্ণতর করবে। অতঃপর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই তত্ত্বের সত্যতা সংশয়াতীত ভাবে প্রমাণ করেছে। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বাক্ষরিত হয়েছে প্যারিস চুক্তি। এবং ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে উন্নয়নশীল দেশগুলি, যার মধ্যে ভারত অন্যতম। সেই ভারতের রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের বিপদটি দু’দিকেই। তার উত্তর ভাগে হিমালয় এবং দক্ষিণে বিস্তৃত সুন্দরবন অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় এই দুই অঞ্চলই সর্বাধিক বিপন্নের তালিকায় নাম তুলেছে বহু আগেই। তৎসত্ত্বেও রাজ্য সরকারি স্তরে পরিবেশকে এত দিন প্রায় ব্রাত্য করে রাখা হল।

অবাধে বুজিয়ে ফেলা জলাভূমি, শহরাঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, একদা নদীবিধৌত রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলির শুকিয়ে আসা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব— আপাতত পশ্চিমবঙ্গের দশা এমনই। রাজ্যের নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধুমাত্র পরিবেশ বিধিগুলিকে কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করাই নয়, পরিবেশ দফতরটির দায়িত্ব এমন কারও হাতে অর্পণ করা, যিনি বা যাঁরা পরিবেশ রক্ষার্থে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়নে পূর্ণ মনোযোগ দেবেন। কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে পরিবেশ রক্ষাকে অন্যতম লক্ষ্য হিসাবে তুলে ধরেছে। পশ্চিমবঙ্গ আগামী দিনে সেই নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন করবে, না কি পরিবেশ রক্ষার আড়ালে আরও এক নিকোবর, সরিস্কা বা আরাবল্লী-র নিদর্শন দেখবে রাজ্যবাসী, সময়ই বলবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

State Poluution Control Board Pollution Global Warming

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy