E-Paper

মৃত্যু-পরবর্তী

‘প্রাপ্য সুযোগসুবিধা আগেই জেনেবুঝে নেওয়া উচিত ছিল,’ এক শোকার্ত মায়ের সামনে রাষ্ট্রের এই পেশাদার রূপটি নিষ্ঠুর বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক।

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৭:৪৭

সব সেনাই নয় সমান। কেন্দ্রীয় সরকার এ কথা জানিয়েছে বম্বে হাই কোর্টে, এক ‘অগ্নিবীর’-এর মায়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে। গত বছর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ নিহত মুরলী নায়েকের মা আদালতে আবেদন করেছিলেন, তাঁর ছেলের ক্ষেত্রে যেন পরিবার ‘নিয়মিত’ সেনাদের সমান পেনশন ও মৃত্যু-পরবর্তী সুবিধা পায়। যুক্তি ছিল, অগ্নিবীররাও অন্য সেনাদের মতোই সমান দায়িত্ব পালন করেন, জীবনের ঝুঁকি তাঁদেরও সমান, শুধু স্বল্পমেয়াদি এক প্রকল্পে নিযুক্ত বলেই কেন অগ্নিবীর ও তাঁদের পরিবারকে আর্থিক ও অন্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে— এ কি বৈষম্য নয়? ভারত সরকার হলফনামায় জানিয়ে দিয়েছে, অগ্নিবীর ও ভারতীয় সেনার শ্রেণিবিভাগ; উভয়ের কাজের মেয়াদ, নিয়োগ ও শর্তাবলির ভিন্নতা, সবই যৌক্তিক, সাংবিধানিক ভাবেও বৈধ। ভারতীয় সেনার ঐতিহাসিক ও আইনি ভিত্তি যেখানে ‘আর্মি অ্যাক্ট’, ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্পের মাধ্যমে অগ্নিবীর-নিয়োগ সেখানে একান্তই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া নীতিগত সিদ্ধান্ত, তার সব শর্তও গোড়া থেকেই বাঁধা— নিয়মিত সেনাদের জন্য প্রযোজ্য সুবিধাগুলি অগ্নিবীরদের পরিবার দাবি করতে পারে না।

চার বছর আগে অগ্নিপথ প্রকল্প চালু করার সময় অগ্নিবীর নিয়োগের মেয়াদ, বেতন, আর্থিক সুবিধা ইত্যাদির খুঁটিনাটি যে কেন্দ্রের তরফে বলে দেওয়া হয়নি তা নয়, তবে দেশপ্রেমের বিপুল আবেগে সে-সব চাপা পড়ে গিয়েছিল। কেন মাত্র চার বছরের জন্য নিয়োগ, মেয়াদ শেষে মাত্র ২৫ শতাংশের স্থায়ী কর্মনিযুক্তি হলে বাকিরা কী করবেন— এই নিয়ে তখনও যে আঙুল ওঠেনি তা-ও নয়, কিন্তু কেন্দ্রে বিজেপি শাসনে ভারতীয় সমাজে ইদানীং সেনাবাহিনী নিয়ে আবেগ এমনই তুঙ্গস্পর্শী যে বিরোধীদের সে-সব প্রশ্ন আমল পায়নি। নানা দেশে নানা সময়ে ও পরিস্থিতিতে ‘মার্সিনারি’ বা ভাড়াটে সৈন্য নিয়োগের উদাহরণ ইতিহাসের পাতাতেই রয়েছে, একুশ শতকের ভারতে অগ্নিপথ-অগ্নিবীর ইত্যাদিও তারই নামান্তর কি না, এই অস্বস্তিকর প্রশ্নও এখন উঠে আসছে ‘রণাঙ্গন’-এ এক অগ্নিবীরের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের তরফে। ‘প্রাপ্য সুযোগসুবিধা আগেই জেনেবুঝে নেওয়া উচিত ছিল,’ এক শোকার্ত মায়ের সামনে রাষ্ট্রের এই পেশাদার রূপটি নিষ্ঠুর বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। সঙ্গে এও মনে রাখা দরকার— কেন্দ্র আদালতে বলেছে যে সেনাবাহিনীতে ‘শহিদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় না, যে অগ্নিবীর মারা গেছেন তিনি রাষ্ট্রের পরিভাষায় ‘ব্যাটল ক্যাজুয়ালটি’, যুদ্ধ নামের ‘কর্তব্য’ পালনের সময় নিহত।

অগ্নিপথ প্রকল্পের লক্ষ্য সেনাবাহিনীতে তারুণ্যের শক্তি ও প্রযুক্তির প্রগতিকে যুক্ত করা, চার বছর আগে কেন্দ্র এমন কথাই বলেছিল। উচ্চ ভাবনা সন্দেহ নেই, তবে সেনা-বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, এর পিছনে রয়েছে ভারতের ‘নিয়মিত’ সেনাবাহিনীর অবসরকালীন আর্থিক সুবিধাদানের বিশাল বোঝা কেন্দ্রের তরফে একটু হলেও লাঘব করার চেষ্টা। সে ভার কতটা কমল তা অন্য প্রশ্ন, কিন্তু অগ্নিবীরের মৃত্যু ও পরিবারের এ-হেন দাবি ভবিষ্যতে এ-হেন সামরিক নিয়োগে প্রভাব ফেলে কি না, সেটাই দেখার। রাষ্ট্র তথা সরকারের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায় এই দুইকেই আদৌ নিশ্চিত করতে পারে কি না, সে-প্রশ্নও রয়ে গেল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Indian Army Agniveer Central Government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy