E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: স্বচক্ষে দেখা

কী ভাবে নিজের পরিবারের মা-বাবা, ভাইবোন মিলিয়ে দশ জন মানুষকে তিনি রক্ষা করেছিলেন, তার ছবি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ০৯:১৭

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরীর ‘আরতি, অদিতি, কণা’ (১-৫) লেখাটি পড়তে পড়তে আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে দেখা এক কর্মরতা নারীর কথা মনে পড়ে গেল। সত্তরের দশকে বাম ও অতি বাম রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্ত। গ্রামগঞ্জ, মফস্‌সলেও সেই রাজনৈতিক ঝড় আছড়ে পড়েছিল। বহু উচ্চশিক্ষিত যুবককে দেখেছিলাম সেই রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিতে। এমনই এক পরিবারের এক যুবক জড়িয়ে পড়েছিলেন আন্দোলনে, আর শুরু হয়েছিল সেই পরিবারের প্রায় অনাহারে দিন কাটানো। পুলিশের ভয়ে আত্মীয়স্বজনও সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। অসহায় হয়ে পড়েছিল গোটা পরিবার। পৃথিবীতে যখনই এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখনই নারীশক্তির উত্থান আমরা দেখেছি। ঠিক তেমনই সেই পরিবারের এক মহিলা— ধরা যাক তাঁর নাম আরতি, অদিতি কিংবা কণা— সংসারের হাল ধরতে চাকরির আশায় কলকাতায় পাড়ি দিয়েছিলেন।

কী ভাবে নিজের পরিবারের মা-বাবা, ভাইবোন মিলিয়ে দশ জন মানুষকে তিনি রক্ষা করেছিলেন, তার ছবি আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। পাড়ার লোকজনের বাঁকা চাহনি কিংবা নিজের জীবনের শখ-আহ্লাদ— সব জলাঞ্জলি দিয়ে নির্ভীক ভাবে তাঁকে নিজের পরিকল্পিত পথে এগিয়ে যেতে দেখেছি। ছোট ভাইবোনদের শিক্ষিত করে, আগামী দিনের উপযুক্ত মানুষ হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তিল তিল করে নিজের জগৎও নিজের হাতে নির্মাণ করেছিলেন সেই নারী। তৎকালীন সামাজিক বাধা পেরিয়ে জনজীবনে তাঁর নিজস্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইও খুব কাছ থেকে দেখেছি। আজ সেই পরিবারের অনেকেই আর ইহজগতে নেই। যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁরা সত্যিই মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেঁচে আছেন।

নারী-সংগ্রামের চলচ্চিত্র শুধু কল্পনার রং দিয়ে তৈরি হয় না। বাস্তবেও আমাদের সমাজে আজও কত এমন নারী-সংগ্রামের চলচ্চিত্র প্রতিনিয়ত তৈরি হয়ে চলেছে— তার হিসাবই বা কে রাখে!

তমাল মুখোপাধ্যায়, ডানকুনি, হুগলি

প্রথম অনুভব

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘আরতি, অদিতি, কণা’ প্রসঙ্গে কিছু কথা। ছোটবেলায় গুপী গাইন বাঘা বাইন কিংবা হীরক রাজার দেশে ছবির মাধ্যমে সত্যজিতের সিনেমার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলেও, সাদা-কালো টেলিভিশনে এক রবিবার সন্ধ্যায় চারুলতা দেখার অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই অন্য রকম। প্রথমে চারুলতাকে খুব অপরিচিত মনে হয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই চরিত্রটি আসলে আমাদের সমাজ ও সংসারের বহু অবহেলিত নারীর প্রতিচ্ছবি। সংসারের গণ্ডির মধ্যে থেকেও চারুলতার ইচ্ছাশক্তি, মানসিক দৃঢ়তা ও সাহিত্যপ্রেম আমাকে নারী হিসাবে অন্য ভাবে ভাবতে সাহায্য করেছিল।

সত্যজিৎ রায় তাঁর নারীচরিত্রগুলির মাধ্যমে প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তাঁর ছবির নারীরা কেবল সংসারের অলঙ্কার নন; তাঁরা স্বাবলম্বী, স্বাধীন এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। এই চরিত্রগুলি সমাজে লিঙ্গভেদের প্রাচীর ভেঙে সংসার ও সমাজে এক নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও কিছুটা মজবুত করে। ঘরের বাইরে পেশাগত জগতে নারীর প্রবেশ যে পরিবার ও সমাজে তাঁর বলিষ্ঠ ভাবমূর্তির সহায়ক, তা প্রথম অনুভব করেছিলাম সত্যজিৎ রায়ের এই কালজয়ী চরিত্রগুলির মধ্য দিয়েই। যদিও আজও নারীকে ঘরের বাইরে পা রেখে কর্মজগতে প্রবেশ করতে গেলে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়, তবু আরতি, অদিতি, কণার মতো নারীরা নিজেদের জায়গা পোক্ত করে উন্নত সমাজ গঠন ও ক্ষমতায়নের পথ সুগম করে চলেছেন এখনও।

কেকা চৌধুরী, হরিপাল, হুগলি

জাদুকর

বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় এমন এক নির্মাতা, যিনি সীমিত প্রযুক্তি, অল্প অর্থ এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও অসামান্য সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন। তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে— তিনি ‘প্রযুক্তি ছাড়া প্রযুক্তির জাদুকর’।

পথের পাঁচালী ছবির শুটিং বার বার থেমে গিয়েছিল অর্থের অভাবে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয়, এত প্রতিকূলতা পেরিয়েও ছবিটি আন্তর্জাতিক স্তরে বিপুল প্রশংসা অর্জন করে। এটি প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তি নয়, বরং শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গিই চলচ্চিত্রের আসল শক্তি।

প্রযুক্তির অভাবকে তিনি কখনও বাধা হিসাবে দেখেননি। বরং প্রাকৃতিক আলো এবং বাস্তব লোকেশন ব্যবহার করে তিনি এক অনন্য বাস্তবধর্মী পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলেন। ‘ট্রেন দৃশ্য’— যেখানে অপু ও দুর্গা মাঠের মধ্যে দিয়ে দৌড়ে ট্রেন দেখতে যায়— সেই দৃশ্যটি ধারণ করতে তাঁকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কৃত্রিম সেট বা উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াই এই দৃশ্য আজও দর্শকের মনে গভীর আবেগ জাগায়।

শুধু চিত্রগ্রহণ নয়, শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সত্যজিৎ রায় ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল শব্দ পরিকল্পনা সম্ভব না হলেও তিনি নীরবতা, প্রাকৃতিক শব্দ এবং সূক্ষ্ম আবহসঙ্গীতের মাধ্যমে দৃশ্যের আবহ তৈরি করেছেন। এই নীরবতার ব্যবহার তাঁর চলচ্চিত্রকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলেছে।

গুপী গাইন বাঘা বাইন-এর মতো চলচ্চিত্রে সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেও তাঁর কল্পনার জগৎ, দৃশ্য নির্মাণ এবং সুরের মাধুর্য আজও দর্শকদের মুগ্ধ করে। খুব সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করেও তিনি এমন এক জাদুময় জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন, যা সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে।

তাঁর জীবন ও কাজ আমাদের ভরসা জোগায়। শেখায়— সত্যিকারের শিল্পের জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিশীলতা, অধ্যবসায় এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রযুক্তি সেখানে কেবল সহায়ক; মূল শক্তি কিন্তু শিল্পীর কল্পনা, অনুভূতি এবং শিল্পবোধ।

পাপান রায়, কলকাতা-৭৬

উত্তরাধিকার

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী বাঙালি সংস্কৃতির আকাশে কেবল একটি নাম নন, তিনি এক কালজয়ী ঐতিহ্যের মজবুত ভিত্তি। তাঁর সাহিত্যিক ও শৈল্পিক প্রতিভা ছিল পরাধীন জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর এক নীরব হাতিয়ার। উপেন্দ্রকিশোরের সৃষ্টি মানেই বাস্তব ও কল্পনার এক জাদুকরী মিশেল। তিনি যখন টুনটুনির বই লিখছেন বা গুপী গাইন ও বাঘা বাইনের মতো কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করছেন, তখন তার নেপথ্যে কাজ করেছে লোকজ সংস্কৃতিকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার এক বলিষ্ঠ প্রত্যয়।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে যখন পাশ্চাত্য শিক্ষাকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হত, তখন উপেন্দ্রকিশোর ছোটদের জন্য দেশীয় রঙে রঙিন এক আধুনিক জগৎ নির্মাণ করেছিলেন। এই সৃষ্টিশীলতার উত্তরাধিকার তাঁর পরিবারের রক্তে এমন ভাবে মিশে গিয়েছিল যে, পরবর্তী বহু প্রজন্ম ধরে তাঁরা ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাজচেতনা আসলে বাবার দেওয়া সেই সাহসী সৃষ্টিশক্তিরই এক অভিনব রূপান্তর।

বিশ্ব চলচ্চিত্রের মানচিত্রে ভারতকে যে সম্মান সত্যজিৎ রায় এনে দিয়েছেন, তার ভিতেও ছিল উপেন্দ্রকিশোরের নিখুঁত শৈল্পিক বোধ এবং গল্পের মধ্য দিয়ে সত্যকে প্রকাশ করার ক্ষমতা। গুপী গাইন বাঘা বাইন-ই হোক বা পথের পাঁচালী— প্রতিটি ফ্রেমেই যেন সত্যজিতের পূর্বজের সেই ধ্রুপদী রুচিবোধ, অলঙ্করণশৈলী ও কল্পনার উত্তরাধিকার প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাঁর বুনে যাওয়া সৃষ্টিশীলতার বীজ আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত, যার ছায়ায় বসে বাঙালি আজও গর্বের সঙ্গে নিজের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে আয়নায় দেখে।

শুভজিৎ বসাক, কলকাতা-৫০

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Film industry

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy