পশ্চিমবঙ্গে শিল্প কি পায়ের নীচে জমি খুঁজে পাবে শেষ পর্যন্ত? গত কয়েক দিনে একাধিক ঘোষণায় আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। রাজ্যে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ গতিশীল হবে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। শিল্পের জন্যও জমির জট ছাড়তে চলেছে বলেই আশা। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প প্রয়োজন, তা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই। বিশেষত, ক্ষমতায় আসার পরে নতুন সরকার জানিয়েছে যে, রাজ্যে কল্যাণমূলক যে প্রকল্পগুলি চলত, সেগুলি অব্যাহত থাকবে। তার উপরে, সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ প্রদান, সপ্তম বেতন কমিশন চালু করা ইত্যাদি প্রাক্-নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। অতএব, পশ্চিমবঙ্গের মূল সঙ্কটটি অপরিবর্তিতই থাকছে— রাজ্য সরকারের হাতে যথেষ্ট টাকা নেই। সেই টাকার সংস্থান করার একমাত্র পথ শিল্পায়ন। সে পথে প্রধানতম বাধার নাম জমি। সিঙ্গুরের জমি-অসন্তোষের হাওয়ায় পাল মেলে রাজ্যের মসনদ দখল করার পর তৃণমূল কংগ্রেস গত পনেরো বছরে জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নটিকে সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছে। অবস্থা এমনই যে, অধিগ্রহণের সংশোধিত নিয়মাবলি অবধি নেই। শাসক দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, শিল্পের জন্য জমির ব্যবস্থা হবে। রাজ্যবাসী আপাতত আশ্বাসপ্রাপ্ত, কিন্তু, প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায়িত্ব যেন শাসক দল বিস্মৃত না হয়।
জমি অধিগ্রহণ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি, তা প্রশ্নাতীত। মূলত শিল্পের অভাবেই এই রাজ্যে কৃষি-নির্ভরতা প্রবল, এবং সেই কারণেই জমির প্রশ্নটি অনেকের কাছেই কেবল অর্থনৈতিক নয়, তা নির্ভরতার প্রতীক। তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের অনিশ্চয়তাকে প্রশ্রয় দিয়ে অধিগ্রহণের প্রশ্নে সম্পূর্ণ হাত গুটিয়ে থেকে তার শাসনের প্রথম পর্বে রাজনৈতিক ভাবে বিলক্ষণ লাভবান হয়েছিল। কিন্তু, রাজ্যের মানুষ যে এই ‘শিল্পবিরোধী’ অবস্থানকে শেষ অবধি সমর্থন করেনি, তার প্রমাণও যথেষ্ট। বিজেপির সুবিধা, জমি নিয়ে এই দ্বন্দ্বের পর্বটি পেরিয়ে তারা ক্ষমতায় এসেছে। ভারতের পরিযায়ী শ্রমিক-রাজধানী হয়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চল শিল্পের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে, অধিগ্রহণের প্রশ্নে বাম ফ্রন্টকে যে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, বিজেপির ক্ষেত্রেততখানি না হওয়ারই সম্ভাবনা। কিন্তু, একই সঙ্গে এই কথাটিও সত্য যে, জমি অধিগ্রহণ করার জন্য স্পষ্ট, ন্যায্য ও স্বচ্ছ নীতি প্রয়োজন— ক্ষতিপূরণের অঙ্ক যার অপরিহার্য অঙ্গ। এ রাজ্যের অভিজ্ঞতা হল, সরকার যে দামে জমি অধিগ্রহণ করে, তার বহু গুণ বেশি দামে সে জমি শেষ অবধি বাজারে পৌঁছয়। তাতে জমিহারাদের মনে বঞ্চনার ক্ষোভ যেমন জন্মায়, তেমনই অন্যরা জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে আরও অনিচ্ছুক হয়ে উঠতে থাকেন। এই পরিস্থিতি এড়াতেই হবে।
জমির বর্তমান বাজারদর কত, শিল্পায়নের জন্য অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে তা প্রধান বিবেচ্য হতে পারে না— কারণ, শিল্পের কারণেই সে জমির চরিত্রও পাল্টাবে, তার দামও বাড়বে বহু গুণ। ভবিষ্যতের সেই লাভ থেকে জমির মালিকদের বঞ্চিত করা ন্যায্য নীতি নয়। কাজেই, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বর্তমান বাজারদরের পরিবর্তে ভবিষ্যতের প্রত্যাশিত মূল্যের মাপকাঠিতে স্থির করা বিধেয়। জমিতে যে শিল্প তৈরি হবে, তার লাভেরও একটি অংশ কোনও ভাবে জমি বিক্রেতাদের দেওয়া যায় কি না, ভাবতে হবে সে কথাও। সংস্থার লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অনুপাত কোনও একটি তহবিলে এনে তার থেকে জমির মালিকদের ডিভিডেন্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। অবশ্যই গোটা প্রক্রিয়ায় শিল্পক্ষেত্রের লাভযোগ্যতার কথাও মাথায় রাখতে হবে। জমির মালিক ও বিনিয়োগকারী, উভয় পক্ষের স্বার্থরক্ষা করার দায়িত্বই সরকারের উপরে বর্তায়। পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ গতিপথকে সমৃদ্ধির দিকে ঘোরাতে হলে এই দায়িত্ব পালন করা ভিন্ন নতুন সরকারের উপায়ান্তর নেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)