গত আড়াই মাস ধরে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ফলে দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। তার আগে অর্থনীতিতে মন্দার মেঘ ঘনাচ্ছে দেখে আজ মোদী তাঁর সরকারের সমস্ত মন্ত্রীকে নতুন করে আর্থিক সংস্কারের কাজে গতি আনার নির্দেশ দিলেন।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, সমস্ত বকেয়া কাজ সেরে ফেলতে হবে। অযথা বিতর্কে জড়ালে চলবে না। শুধুমাত্র সুশাসন ও পরিষেবার দিকে নজর দিতে হবে। দ্রুত ফাইল ছাড়তে হবে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ফলে এলপিজি ও অন্যান্য গ্যাস আমদানিতে সমস্যা তৈরি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী জৈব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে বলেছেন।
গত সপ্তাহে সাত দিনের জন্য পাঁচ দেশের সফরে রওনা হওয়ার আগে মোদী দেশের মানুষের কাছে পেট্রল-ডিজ়েল-সোনা-বিদেশ যাত্রায় খরচ কমানোর জন্য আর্জি জানিয়েছিলেন। কারণ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ফলে আমদানিরজন্য বিপুল ডলার খরচ হচ্ছে। টান পড়েছে বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে। টাকার পতন অব্যাহত। তার সমাধানে দেশের মানুষের সামনে কাজের তালিকা ঝুলিয়ে দিয়ে মোদী নিজেই বিদেশ সফরে রওনা হয়ে যাওয়ায় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, দেশের অর্থনীতির এই অনিশ্চয়তার মধ্যে মোদী ইটালির প্রধানমন্ত্রীকে টফি উপহার দিতে বিদেশ সফরে কেন গেলেন? বাংলার বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় যেমন বলেন, ‘‘বিজেপির সব কিছুই দ্বিচারিতায় ভরা। মুখে যা বলে কাজে তার উল্টো করে। প্রধানমন্ত্রী গোটা দেশের মানুষকে ব্যয় কমানো, বিদেশযাত্রা এড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন আর নিজে গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’’ অর্থনীতিবিদরা অভিযোগ তুলেছিলেন, মোদী জমানায় বিজেপি নির্বাচনে জিতে চলেছে বলে অর্থনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে না।
এই প্রশ্নের মুখে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেই বিকেল পাঁচটা থেকে প্রধানমন্ত্রী সমস্ত পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে প্রধানমন্ত্রীর নতুন দফতর সেবাতীর্থে ম্যারাথন বৈঠক চলে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দেশের সফরে প্রাপ্তির তালিকা তুলে ধরেন। তার আগেই অবশ্য বৈঠকের শুরুতে মন্ত্রীরা টেবিল চাপড়ে মোদীকে বিদেশ সফরে সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
সরকারি সূত্রের দাবি, তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী সংস্কারে নতুন করে জোর দিয়েছেন। বার বার তিনি ‘রিফর্ম এক্সপ্রেস’-এর কথা বলেছেন। সমস্ত মন্ত্রককে সংস্কারের তালিকা তৈরি করতেও বলেছেন। এ দিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে মোট ন’টি মন্ত্রক ‘প্রেজ়েন্টেশন’-এর মাধ্যমে তাদের সংস্কার কর্মসূচির সবিস্তার ব্যাখ্যা তুলে ধরে। নীতি আয়োগ এবং ক্যাবিনেট সচিবালয়ের তরফেও মন্ত্রীদের সামনে আর্থিক সংস্কারের কর্মসূচি তুলে ধরা হয়। সরকারি সূত্রেরব্যাখ্যা, এখন যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে। তার ফলে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির হার বাড়লে তাতে লাগাম পরাতে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ককে ঋণের উপরে সুদের হার বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে শিল্পের জন্য ঋণের খরচ বেড়ে গিয়ে আর্থিক বৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রী নতুন করে সংস্কারে জোর দিয়েছেন।
সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে অর্থনীতিতে গতি আনার প্রয়োজন মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, তাঁর সরকার দেশের স্বাধীনতার শতবর্ষ ২০৪৭-এ ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত রাষ্ট্রের তালিকায় ভারতকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যের কথা বলেছে। এটা নিছক স্লোগান নয়, প্রতিশ্রুতি। তার জন্য কাজে গতি আনতে হবে। কাজের প্রক্রিয়া সরল করতে হবে। কম সময়ে বেশি কাজ করতে হবে। ফাইল আটকে রাখলে চলবে না। কোন কোন মন্ত্রক দ্রুত ফাইল পাশ করে, তা-ও এ দিন তুলে ধরা হয়।
নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে ২৬ মে প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সেই হিসেবে আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে তাঁর ১২ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। ২০২৪ সালে তৃতীয় বার ক্ষমতায় আসার পরে তিনি ৯ জুন ফের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সেই হিসেবে আগামী মাসে তৃতীয় মোদী সরকারের দু’বছর পূর্ণ হতে চলেছে। মোদী এ দিন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে বলেছেন, সরকারের ১২ বছর পূর্তিতে সংস্কার ও কাজের খতিয়ান মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। তবে শুধু গত ১২ বছরের কাজ নিয়ে চর্চা না করে ভবিষ্যতের দিকে নজর দিতে হবে।
গত জুনে শেষ বার সব পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক হয়েছিল। নিতিন নবীনের বিজেপি সভাপতির দায়িত্ব নেওয়া, পাঁচ বিধানসভা নির্বাচন, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে সাফল্য ও আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনকে মাথায় রেখে মোদী সরকার খুব শীঘ্রই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এবং বিজেপির সাংগঠনিক রদবদল করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান চেহারায় মন্ত্রিপরিষদের এটিই শেষ বৈঠক হয়ে থাকবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)