E-Paper

বিভেদ ভাঙার নতুন মন্ত্র

কর্মজীবী নারীদের এই অসন্তোষের মূলে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য বা ‘জেন্ডার পে গ্যাপ’-এর ভূমিকাও বিরাট।

অমিতাভ পুরকায়স্থ

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০২৬ ০৮:১৭

সোল শহরের ব্যস্ত রাস্তায় যখন কোনও তরুণী ভিড় ঠেলে কর্মস্থলের দিকে এগিয়ে যান, তখন তাঁর চোখেমুখে কেবল পেশাদারিরই ছাপ থাকে না, মিশে থাকে এক নীরব অথচ দৃঢ় বিদ্রোহের গল্পও। এই বিদ্রোহের নাম ‘ফোর-বি’ আন্দোলন। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ কোরিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এই আন্দোলনের ঢেউ এসে লেগেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বলা চলে ভারতের মতো দেশেও, যেখানে কর্মজীবী মহিলারা আজও পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন।

এই আন্দোলনের শুরুটা গভীর এক ক্ষত থেকে। ২০১৬-য় সোলের গ্যাংনাম স্টেশন সংলগ্ন এক শৌচাগারে এক তরুণীর নির্মম হত্যাকাণ্ড দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের মনে এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, শুধু কঠোর পরিশ্রম বা আধুনিক জীবনযাপন তাঁদের নিরাপত্তা বা যোগ্য সম্মান নিশ্চিত করতে পারছে না। এর পর পরই শুরু হয় ‘এসকেপ দ্য করসেট’ আন্দোলন, মহিলারা তাঁদের লম্বা চুল কেটে ফেলা, বা প্রসাধন সামগ্রী ভেঙে ফেলে কৃত্রিম সৌন্দর্যের চাপিয়ে দেওয়া মাপকাঠিকে প্রত্যাখ্যান করা শুরু করেন। এ থেকেই ক্রমে জন্ম নেয় ‘ফোর-বি’ নীতি— যা হল চারটি ‘বি’ (Bi) বা ‘না’: বিহন (বিয়েতে না), বিচুলসান (সন্তান জন্মদানে না), বিয়োনায়ে (প্রেমে না) এবং বিসেক্সু (পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে না)। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে কোনও সহযোগিতা না করার এক কঠোর শপথ।

তবে এই বিদ্রোহের পিছনে কেবল সামাজিক মর্যাদা বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবও। কর্মজীবী নারীদের এই অসন্তোষের মূলে লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য বা ‘জেন্ডার পে গ্যাপ’-এর ভূমিকাও বিরাট। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে চিত্রটি বেশ উদ্বেগের: উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় মজুরি বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী সেখানে এক জন নারী গড়ে এক জন পুরুষের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বেতন পান। অর্থাৎ, একই যোগ্যতা ও একই পরিশ্রম সত্ত্বেও স্রেফ লিঙ্গপরিচয়ের কারণে তাঁদের শ্রমের মূল্য কম দেওয়া হয়। এই অর্থনৈতিক বঞ্চনা মেয়েদের মনে এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে— যে সমাজ তাঁদের পেশাদার সত্তাকে যোগ্য পারিশ্রমিক দিতে কার্পণ্য করে, সেই সমাজের প্রথাগত পারিবারিক কাঠামোকে কেন তাঁরা নিজেদের রক্ত-জল করা শ্রমে টিকিয়ে রাখবেন?

ভারতের প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি কি খুব একটা ভিন্ন? নারীসুরক্ষার প্রশ্ন ছেড়েই দেওয়া যাক। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম-এর ২০২৫ সালের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ রিপোর্ট অনুসারে ভারত ১৪৮টি দেশের মধ্যে ১৩১তম স্থানে। এ দেশে পুরুষ ও নারীর মধ্যে সমান কাজের মজুরিতে ৩৩ শতাংশ ফারাক। ভারতের বড় শহরগুলোতে আজ অগণিত মেয়ে স্বাধীন ভাবে উপার্জন করছেন, বহুজাতিক সংস্থাতেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে এই বিভাজন ভাঙার লড়াইয়ের পাশাপাশি, ঘরেও তাঁদের লড়তে হয় সেই চিরকালীন প্রত্যাশার সঙ্গে— যেখানে সাফল্য ও জীবনের লক্ষ্য মানে ঘরোয়া লক্ষ্মী মেয়েটি হয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসা। এক জন উচ্চশিক্ষিতা ভারতীয় নারীর কাছে সমাজের এই দাবির বোঝা আজও চাপে: তিনি চাকরি সামলে নিপুণ ভাবে গৃহস্থালিতে ‘অদৃশ্য শ্রম’ দেবেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার আন্দোলন এখানেই ভারতীয় নারীদের প্রেক্ষিতেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যদিও ভারতের আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈবাহিক সম্পর্ক বা মাতৃত্ব ত্যাগ অনেক মেয়ের পক্ষেই কঠিন, তবু এই আন্দোলনের অন্তরালে থাকা ‘না’ বলার স্পর্ধিত স্বর ভারতীয় অন্দরমহলেও আলোড়ন তুলছে। মেয়েরা প্রশ্ন করছেন— কেন বিয়ের পর কেবল তাঁদেরই কেরিয়ারে আপস করতে হবে? কেন ঘরের কাজ কেবল তাঁদেরই একার দায়িত্ব হবে? পিতৃতান্ত্রিক প্রথাকে আঁকড়ে ধরে রাখার যে বাধ্যবাধকতা, তা ভাঙার মানসিক প্রেরণা জোগাচ্ছে এই আন্দোলন। ভারতের বহু কর্মজীবী তরুণী মুখ ফুটে বলছেন, তাঁরা তাঁদের শ্রম, মেধা ও আবেগকে অন্যের প্রত্যাশা পূরণের বদলে নিজের উন্নতির জন্য ব্যয় করতে চান। সমাজ বদলে যাক বা না যাক, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারার যে আনন্দ, তা-ই আজ এই প্রজন্মের নারীদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠছে ক্রমে।

ভারতে এখন অনেক মেয়েই ‘সিঙ্গল বাই চয়েস’ বা স্বেচ্ছায় অবিবাহিত তথা একা থাকার পথ বেছে নিচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, একা থাকা কোনও অভিশাপ নয়, তা নিজের শর্তে বাঁচার এক অনন্য সুযোগও হয়ে উঠতে পারে। এই নীরব বিবর্তনকে আগাপাছতলা পুরুষ-বিদ্বেষ ভাবলে পূর্ণ সত্য ও বাস্তবতাকে বোঝা যাবে না। ঘরে-বাইরে ক্রমাগত পুরুষ ও পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে লড়াই এ দেশে ঘোর বাস্তব বটেই, সেই সঙ্গে এ হল মেয়েদের আপন অস্তিত্ব ও আত্মসম্মান খুঁজে নেওয়ার এবং তা প্রতিষ্ঠা করারও লড়াই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Seoul Women Protest

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy