E-Paper

আমি কে, আমরা কারা

ভারতে ভাষাভিত্তিক উত্তেজনার ইতিহাস নতুন নয়। হিন্দি বনাম তামিল, মরাঠি বনাম হিন্দি, কন্নড় বনাম হিন্দি— এ ধরনের সংঘাত বার বার সামনে এসেছে।

শুভঙ্কর ঘোষ

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ০৯:১১

লোকাল ট্রেনে যেতে যেতে কথা হচ্ছিল আনিসুরের সঙ্গে। উত্তর চব্বিশ পরগনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলে। স্নাতক স্তরের পরে আর পড়াশোনা এগোয়নি। অভাবী পরিবারের সন্তান। বহু দিন ধরে উত্তর ভারতের এক দ্রুত শিল্পায়িত রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখন কাজ বা রোজগার নয়; পরিচয়। সে নিজেকে কী বলে পরিচয় দেবে? বাঙালি? মুসলিম? শ্রমিক? ভারতীয়? না কি, এ সব কিছুরই মিশ্রণ? প্রশ্নটা শুনতে সরল, কিন্তু উত্তর দেওয়া আজ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ পরিচয় এখন আর কেবল ব্যক্তিগত নয়; তা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রশাসনিক শ্রেণিবিভাগেরও বিষয়।

আসলে এই সঙ্কট শুধু আনিসুরের নয়। কমবেশি আমাদের সকলের। কর্মস্থলে, জনপরিসরে, এমনকি দৈনন্দিন আলাপচারিতাতেও আমরা ক্রমশ বাধ্য হচ্ছি নিজেদের নির্দিষ্ট কোনও পরিচয়ের মধ্যে বেঁধে ফেলতে। অথচ মানুষের সত্তা কখনও একরৈখিক নয়। সময়, পরিবেশ, সম্পর্ক, পেশা এবং সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলায়। এক জন মানুষ একই সঙ্গে বাবা, মা, সন্তান, শিক্ষক, শ্রমিক, নাগরিক, বাঙালি, ভারতীয়, হিন্দু, মুসলিম, নারী, পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী এই পরিচয়গুলির কোনওটি সামনে আসে, কোনওটি আড়ালে থাকে। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনীতি পরিচয়ের এই বহুমাত্রিকতাকে সহজ ভাবে মেনে নিতে চাইছে না। বরং ক্রমাগত মানুষকে একটিমাত্র সত্তায় আবদ্ধ করার প্রবণতা বাড়ছে।

এই কারণেই ভাষা, ধর্ম, জাতপাত বা আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে সংঘাতও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ভারতে ভাষাভিত্তিক উত্তেজনার ইতিহাস নতুন নয়। হিন্দি বনাম তামিল, মরাঠি বনাম হিন্দি, কন্নড় বনাম হিন্দি— এ ধরনের সংঘাত বার বার সামনে এসেছে। এর পিছনে শুধু ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্ন নেই; আছে আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও। মাতৃভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতি, আবেগ এবং আত্মসম্মানের সঙ্গে জড়িত। ফলে অন্য কোনও ভাষাকে যদি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তা স্বাভাবিক ভাবেই প্রতিরোধ তৈরি করে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়— ভাষার নামে এই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত লাভ কার?

আমেরিকার ভাষাবিদ নোম চমস্কি মনে করতেন, পৃথিবীর সমস্ত ভাষার ভিতরেই একটি সাধারণ কাঠামোগত সাযুজ্য রয়েছে। তাঁর তত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, কিন্তু একটি চিন্তার জায়গা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে থেকে কেউ পৃথিবীকে দেখলে হয়তো মানুষের ভাষাগত বিভাজন এতটা তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে না। ফরাসি, ইংরেজি, বাংলা, তামিল বা আরবি— সব ভাষার মধ্যেই মানুষ তার অনুভূতি, সম্পর্ক, ভয়, ভালবাসা এবং অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। ভাষা আলাদা, কিন্তু মানবিক অভিব্যক্তির মূল সুর অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন। অথচ পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষা, ধর্ম এবং পরিচয়ের প্রশ্নে সংঘাতের পরিমাণ বিপুল।

এই জায়গায় এমন মানুষদের কথাও মনে পড়ে, যাঁরা পরিচয়কে কঠোর ভাবে নির্দিষ্ট করতে চান না। ধরুন, কারও নাম রাজু। নাম শুনে বোঝার উপায় নেই তিনি কোন ধর্মের, কোন অঞ্চলের বা কোন ভাষাভাষী। তাঁকে যদি ধর্মপরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি হয়তো বলবেন— ‘যেমন ভাববেন, আমি তেমনই’। সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণেও তাঁর জড়তা নেই, আবার কোরানের বাণীও অনর্গল বলতে পারেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর প্রিয়, কৃষিকাজ তাঁর পেশা। প্রয়োজনে বাংলাদেশে আত্মীয়ের বাড়ি যান, আবার এ দেশেও সমান স্বচ্ছন্দ। রাষ্ট্রের নথিপত্রে তাঁকে হয়তো নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় বা জাতীয় পরিচয়ে বেঁধে দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর সত্তা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং বহুমাত্রিক।

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এক বার একটি গল্প বলেছিলেন। ছোটবেলায় তাঁর এক বন্ধু নানান পাখির নাম এবং বৈজ্ঞানিক নাম মুখস্থ বলতে পারত। ফাইনম্যান তা পারতেন না। কিন্তু তিনি পাখিটির আচরণ, গঠন এবং বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন গভীর ভাবে। পরে তিনি বলেছিলেন, কেবল নাম জানলেই কোনও কিছুকে সত্যিকারের জানা হয় না। মানুষের ক্ষেত্রেও সেই কথাই প্রযোজ্য। নাম, ভাষা, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় কোনও মানুষের সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। সঙ্গীত, সাহিত্য, বিজ্ঞান, খেলাধুলা বা শিল্প— সব ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত মানুষের সৃজনশীলতা, শ্রম এবং মানবিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই কারণেই আজকের সময়ে সতর্ক থাকা জরুরি। পরিচয় মানুষের বাস্তব জীবনের অংশ, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যখন পরিচয়ই মানুষের একমাত্র সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ায়, তখন বিপদ তৈরি হয়। কারণ তখন মানুষকে তার জটিলতা, অভিজ্ঞতা এবং মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি মাত্র ছকে ফেলে দেখা শুরু হয়। আনিসুরের মতো মানুষদের সঙ্কট আসলে সেই বৃহত্তর সময়েরই প্রতিফলন— যেখানে ‘আমি কে’ প্রশ্নটির উত্তর ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আর সেই কারণেই হয়তো আজ সবচেয়ে বেশি দরকার এমন এক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা নাম, ভাষা বা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষকে মানুষ হিসাবেই দেখতে শেখায়।

পদার্থবিদ্যা বিভাগ, সেন্ট জ়েভিয়ার’স কলেজ, কলকাতা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Democracy humanity Mother Tounge

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy