E-Paper

নিরাপত্তা মানে নিয়ন্ত্রণ নয়

এখানেই নারীবাদী রাজনীতির একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে। নারীবাদ রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা দাবি করে।

অমৃতা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৭:২৬

ভারতে নারীবাদী গণ-আন্দোলনগুলি গত কয়েক দশকে যৌন হিংসা, নারীনির্যাতন এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই আন্দোলনগুলি কেবল বিচারের দাবি তোলেনি; বরং পিতৃতন্ত্র, সামাজিক বৈষম্য এবং ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি জটিল বাস্তবও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে— এই আন্দোলনগুলিই বহু সময় এমন রাজনৈতিক শক্তির জন্য জনসমর্থনের রাস্তা খুলে দেয়, যাদের প্রকল্প নারীবাদী নয়, বরং গভীর ভাবে পুরুষতান্ত্রিক এবং দক্ষিণপন্থী।

নারীবাদী আন্দোলনের শক্তি তার নৈতিক অবস্থানে। ধর্ষণ বা যৌন হিংসার ঘটনার পরে যে ক্ষোভ, শোক এবং ন্যায়বিচারের দাবি তৈরি হয়, তা দ্রুত বৃহত্তর সামাজিক সমর্থন অর্জন করতে পারে। কিন্তু এই আবেগ-নির্ভর চরিত্রই আন্দোলনকে রাজনৈতিক ভাবে ভঙ্গুরও করে তোলে। আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে পিতৃতন্ত্র, রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা, শ্রেণি ও জাতপাতের বৈষম্য নিয়ে যে কাঠামোগত প্রশ্ন ওঠে, আন্দোলন বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা অনেক সময় সরলীকৃত হয়ে ‘বিচার চাই’ বা ‘নিরাপত্তা চাই’-এর মতো স্লোগানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন আন্দোলনের ভিতরে যে জটিল সামাজিক বিশ্লেষণ ছিল, তা সরে যায়; তার জায়গায় আসে নৈতিক ক্ষোভ, প্রতীকী শাস্তি এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতি। এই সরলীকরণের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে— দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি ঢুকে পড়ে এই রাজনীতির পরিসরে। ‘শক্তিশালী রাষ্ট্র’, ‘আইনশৃঙ্খলা’, ‘নিরাপত্তা’, ‘নারীসুরক্ষা’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ ক্রমে নারীবাদী ক্ষোভকে এক ধরনের কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী খোপে আবদ্ধ করতে চায়— রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার বদলে উঠে আসে কঠোরতর রাষ্ট্রের দাবি।

এখানেই নারীবাদী রাজনীতির একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব সামনে আসে। নারীবাদ রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা দাবি করে। কিন্তু একই সঙ্গে নারীবাদ রাষ্ট্রের পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতারও সমালোচনা করে। ফলে যৌন হিংসার ঘটনার পরে আন্দোলন যখন ‘আরও নিরাপত্তা’-র দাবি তোলে, তখন সেই নিরাপত্তার ভাষা অনেক সময় নজরদারি, নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণশীল নৈতিকতার ভাষায় পরিণত হয়। অর্থাৎ নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন ধীরে ধীরে নারীর ‘রক্ষা’-র প্রশ্নে বদলে যায়।

ভারতে ধর্ষণ বা যৌন হিংসার ঘটনার পরে জনপরিসরে বার বার ‘নারী মানে দেবী’ ধরনের ভাষা ফিরে আসে। এই প্রতীকায়ন নারীর নাগরিক পরিচয়কে সঙ্কুচিত করে। নারী তখন আর পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন রাজনৈতিক সত্তা নন; তিনি ‘মা’, ‘দেবী’, ‘ভগিনী’, ‘জাতির সম্মান’-এর প্রতীকে পরিণত হন। এর ফলে নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতা— শ্রম, যৌন স্বাধীনতা, চলাফেরার অধিকার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি— এই প্রশ্নগুলি আড়ালে চলে যায়। পরিবর্তে সামনে আসে ‘সংস্কৃতি রক্ষা’, ‘নারীকে সুরক্ষিত রাখা’-র ভাষা।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই প্রতীকী কাঠামোকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে। কারণ হিন্দুত্বের নারীনীতিতে নারী সমান নাগরিক নন; তিনি মূলত জাতি, ধর্ম, পরিবার এবং সংস্কৃতির ধারক। ফলে নারীকে ‘রক্ষা’ করার প্রশ্নটি খুব সহজেই সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অংশ হয়ে যায়। এই জায়গায় ‘ফেমোন্যাশনালিজ়ম’ ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ— অর্থাৎ নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার ভাষাকে ব্যবহার করে জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া। মুসলিম পুরুষকে ‘বিপজ্জনক’, বা ‘নারীর শত্রু’ হিসাবে চিত্রিত করা, অন্য দিকে সংখ্যাগুরু পুরুষতন্ত্রকে ‘রক্ষাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করা— এই দ্বৈত কাঠামো গত এক দশকে ভারতীয় রাজনীতিতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। ফলে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটি পিতৃতন্ত্রের সমালোচনা থেকে সরে গিয়ে ‘অপর’-এর বিরুদ্ধে নৈতিক যুদ্ধের ভাষায় পরিণত হয়েছে।

এখানে নারীবাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রেই আন্দোলনগুলি স্বতঃস্ফূর্ত, বিকেন্দ্রীভূত এবং আবেগনির্ভর, যা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতা তৈরি করতে পারে। স্পষ্ট সংগঠন, শ্রেণিভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান না থাকলে আন্দোলনের ভাষা সহজেই বদলে যায়। গণমাধ্যম, সমাজমাধ্যম এবং রাজনৈতিক দলগুলি তখন আন্দোলনের আখ্যান নিজেদের মতো করে নির্মাণ করতে শুরু করে। আন্দোলনের মূল প্রশ্ন— শ্রমের অনিরাপত্তা, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্কট, সামাজিক বৈষম্য— পিছিয়ে পড়ে। সামনে আসে প্রতীকী ক্রোধ এবং নৈতিক উত্তেজনা।

এই জায়গায় নারীবাদী রাজনীতি একটি জটিল ফাঁদে পড়ে। যদি ‘দেবী’, ‘সম্মান’, ‘সংস্কৃতি’-র ভাষাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে, তবে জনসমর্থনের একটি বড় অংশ হারানোর ঝুঁকি থাকে। আবার সেই ভাষা গ্রহণ করলে পিতৃতান্ত্রিক নৈতিক কাঠামোকেই বৈধতা দেওয়া হয়। ফলে নারীবাদী রাজনীতি ক্রমশ প্রতিরক্ষামূলক হয়ে পড়ে, আর দক্ষিণপন্থী শক্তি আবেগের পরিসর দখল করে ফেলে। যৌন হিংসার বিরুদ্ধে আন্দোলনগুলি অনেক সময় শেষ পর্যন্ত নারীর স্বাধীনতার বদলে নিয়ন্ত্রণমূলক নৈতিকতার দিকে গিয়ে দাঁড়ায়। নারীর চলাফেরা, পোশাক, সম্পর্ক, যৌনতা— সব কিছুর উপরে সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে তখন ‘নিরাপত্তা’-র নামে বৈধতা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, যে আন্দোলন পিতৃতন্ত্রকে প্রশ্ন করার কথা ছিল, সেটিই উল্টো পথে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।

নারীবাদী রাজনীতি কী ভাবে নিজের ভাষা এবং রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠন করবে? নারীকে ‘দেবী’ নয়, পূর্ণ নাগরিক হিসেবে কল্পনা করা; নিরাপত্তাকে নিয়ন্ত্রণ নয়, স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে দেখা; এবং যৌন হিংসাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বৃহত্তর সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোর অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা— এই কাজগুলি না হলে নারীর নিরাপত্তার নামে যে রাজনীতি শুরু হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত নারীর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে সঙ্কুচিত করতে পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Women Safety

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy