E-Paper

বহুত্বের সংস্কৃতিতে ফিরছে লাহোর গলি

পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য, সেই বহুত্বের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা, যা দেশভাগের পর ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছিল।

সংবাদ সংস্থা

শেষ আপডেট: ২০ মে ২০২৬ ০৮:১১
লোহোর।

লোহোর। ফাইল চিত্র।

দেশভাগের প্রায় আট দশক পরে চাপা পড়া ইতিহাস যেন ফিরে আসছে লাহোরের রাস্তাঘাটে। শহরের বহু পুরনো এলাকার হিন্দু, শিখ, জৈন এবং ব্রিটিশ আমলের নাম আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। ইসলামপুরা আবার হয়ে উঠছে কৃষ্ণনগর। বাবরি মসজিদ চৌক ফিরছে জৈন মন্দির চৌকের পরিচয়ে। সুন্নতনগর হচ্ছে সন্তনগর, রহমান গলি ফিরছে রাম গলিতে আর মুস্তাফাবাদ ফিরে পাচ্ছে তার পুরনো নাম ধরমপুরা।

পাকিস্তানের পঞ্জাব সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য, সেই বহুত্বের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা, যা দেশভাগের পর ধীরে ধীরে মুছে যেতে বসেছিল। পঞ্জাব সরকারের এক আধিকারিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে লাহোর ও আশপাশের বিভিন্ন রাস্তা ও এলাকার ঐতিহাসিক নাম পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে। সেই মতো গত দু’মাসে শহরের নানা প্রান্তে পুরনো নাম লেখা নতুন সাইনবোর্ড দেখা যেতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যেই নয়টি এলাকার সরকারি নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন— লক্ষ্মী চৌক, যেটির নাম এক সময় মৌলানা জাফর আলি খান চৌক রাখা হয়েছিল; ডেভিস রোড, যা পরে স্যার আগা খান রোড নামে পরিচিত হয়; কিংবা কুইন্স রোড, যেটি দীর্ঘ দিন ফাতিমা জিন্না রোড নামে পরিচিত ছিল। এমনকি লাহোরের বিখ্যাত লরেন্স গার্ডেনও বহু বছর ধরে ‘বাগ-এ-জিন্নাহ’ নামে পরিচিত থাকার পর আবার তার ঔপনিবেশিক পরিচয়ের দিকে ফিরে যাচ্ছে।

তবে লাহোরবাসীর কাছে এই পুরনো নামগুলো কোনও দিনই পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। চায়ের দোকানি থেকে রিকশাচালক, দোকানদার থেকে সাধারণ মানুষ— বেশির ভাগই এখনও দৈনন্দিন কথাবার্তায় পুরনো নামগুলোই ব্যবহার করেন। অনেকের কাছেই লক্ষ্মী চৌক আজও লক্ষ্মী চৌক, সরকারি নথিতে যা-ই লেখা থাকুক না কেন। শুধু রাস্তার নাম নয়, লাহোরের সার্বিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে গত বছর থেকে। তারই দায়িত্বপ্রাপ্ত এলএএইচআর-এর(লাহোর অথরিটি ফর হেরিটেজ রিভাইভাল) কর্ণধার কামরান লশরির মতে, লাহোর একই সঙ্গে মুসলিম, শিখ, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের শহর।

অমৃতসর থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লাহোর এক সময় ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পঞ্জাবিদের যৌথ সাংস্কৃতিক ঠিকানা। ব্যস্ত বাজার, পুরনো কলেজ, বাগান, আখড়া, মন্দির, গুরুদ্বার ও দরগা— সবই ছিল এক অবিভক্ত পঞ্জাবের অংশ। দেশভাগের পরে অধিকাংশ হিন্দু ও শিখ পরিবার শহর ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তী দশকগুলোতে ধীরে ধীরে বহু রাস্তা, এলাকা ও সৌধের নাম বদলে যায়। বর্তমানে লাহোরে একশোরও বেশি ঐতিহ্যবাহী সৌধ রয়েছে। সেগুলিরও পুনর্নির্মাণ ও সংরক্ষণের কাজ চলছে। পুরনো গির্জা ও রণজিৎ সিংহের স্মৃতিবিজড়িত শিখ আমলের নানা স্থাপত্য সংস্কার করা হচ্ছে। ফিরিয়ে আনা হচ্ছে খেলাধুলোর ঐতিহ্য। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ লাহোরের ঐতিহাসিক ক্রিকেট মাঠ ও পুরনো কুস্তির আখড়া ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। এখনকার গ্রেটার ইকবাল পার্ক আগে পরিচিত ছিল মিন্টো পার্ক নামে। লালা অমরনাথ, ইনজামাম উল হকের মতো ক্রিকেট তারকা, গামা পালোয়ান-ইমাম বক্সের মতো কুস্তিগির এই মাঠ থেকেই উঠে এসেছিলেন। দেশভাগের আগে লাহোরের হিন্দুরা ওখানেই জড়ো হতেন দশেরা উদ্‌যাপনে। কামরান বলছেন, ‘‘লাহোরের আনারকলি বাজার, নীলা গুম্বাদ, মল রোডের কথা ভারতেও সবাই জানেন। নওয়াজ় শরিফ বলেছেন আমায়, তিনি যখনই ভারতে গিয়েছেন, লোকে ওই জায়গাগুলোর কথা তাঁকেজিজ্ঞাসা করেছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Lahore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy