E-Paper

ক্ষমতা ও দুর্নীতির আঁতাঁত

এই আঁতাঁতের উচ্চস্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামোর প্রতিটি স্তম্ভ পরস্পর সমন্বয়ে কাজ করে। নেতারা যেমন ভোট পেতে বা বেআইনি কাজ করাতে মস্তানতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল।

শ্রীদীপ

শেষ আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ ০৮:২৪

নির্বাচনের সময় প্রচারমাধ্যমে প্রার্থী, ভোট-কৌশল, ভোটব্যাঙ্ক ও ফলাফল নিয়ে প্রচুর আলোচনা চোখে পড়ে, কিন্তু ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো— যা ভোটে জয় বা পরাজয়-নির্বিশেষে টিকে থাকে, তা নিয়ে বিশ্লেষক আলোচনা হয় না। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, যায়; রয়ে যায় নেতা, পুঁজিপতি, আমলা, অপরাধী ও প্রভাবশালী মাতব্বরদের নিয়ে গঠিত আঁতাঁত— নিজেদের মধ্যে যারা ভাগ করে নেয় মুনাফা ও ক্ষমতা।

এই আঁতাঁতের উচ্চস্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামোর প্রতিটি স্তম্ভ পরস্পর সমন্বয়ে কাজ করে। নেতারা যেমন ভোট পেতে বা বেআইনি কাজ করাতে মস্তানতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। পুলিশ প্রায়ই এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড অবজ্ঞা করে— শুধু বদলি এড়াতেই নয়, অবৈধ লেনদেনে নিজেদের জন্য একটি অংশ নিশ্চিত করতেও। ও-দিকে ব্যবসায়ীরা ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নীতি নির্ধারণ করে; পরিবর্তে শাসক দল সময়মতো পেয়ে যায় পার্টির জন্য অনুদান। অর্থের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ— তা চাঁদাই হোক কি হপ্তা, কেবল ব্যয়বহুল নির্বাচনী খরচ মেটায় না, রোজকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতেও তার ভূমিকা অসীম।

ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির তাগিদে নেতাদের প্রায়ই দেখা যায় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যবসায় ঢুকতে। ঠিক যেমন ব্যবসায়ী ও মস্তানরা ক্ষমতা, পুঁজি ও অবৈধতা থেকে সুবিধা পেতে খোঁজে রাজনীতিতে প্রবেশের পথ। অসংগঠিত ক্ষেত্রে এটি কার্যত সর্বজনীন ভাবে স্বীকৃত যে, পুলিশ ও দলীয় কর্মীদের হাতে না রেখে ব্যবসা চালানো অসম্ভব। অনুমতি, সুরক্ষা, হস্তক্ষেপহীনতা ও পৃষ্ঠপোষকতা নির্ধারিত হয় অনুদান ও কমিশনের অনুপাতে।

বৃহৎ প্রকল্প থেকে স্থানীয় জবরদখল, সব অবৈধতাই দুর্নীতিলব্ধ আয়ের সম্ভাব্য উৎস। অবৈধ পুঁজি, মস্তান, নেতা ও ঠিকাদারদের আঁতাঁত নিয়ন্ত্রণ করে ভোট, মুনাফা ও ক্ষমতার কলকব্জা। এই প্রাতিষ্ঠানিক লুম্পেনতন্ত্র এতই প্রতাপশালী যে, দুর্নীতি হয়ে ওঠে অতি স্বাভাবিক। দল, প্রার্থী আসে যায়, পুলিশে বদলি হয়, আমলা অবসর নেন— কিন্তু ক্ষমতার দুর্নীতিগ্রস্ত কাঠামো চিরস্থায়ী।

এই আঁতাঁতের নিম্নস্তরে মধ্যস্থতাকারী তথা দালালরা সুগম করে দেয় সুবিধা পাওয়ার পথ। দল ও প্রশাসনের মদতপুষ্ট এই ‘এজেন্ট’রা ‘পাইয়ে দেওয়া’র কল। জল, বিদ্যুৎ, ভর্তুকি পেতে গেলে খেটে খাওয়া মানুষকে বিলম্ব ও হেনস্থার মুখে পড়তে হয়; মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে রুদ্ধ দ্বার প্রবেশযোগ্য হয়ে ওঠে। মৌলিক অধিকারগুলো পেতে গেলেও দিতে হয় ঘুষ, বা ভোটের প্রতিশ্রুতি। মধ্যস্থতাকারীরা পর্যায়ক্রমে যা সংগ্রহ করে তার নির্দিষ্ট অংশ বণ্টিত হয় দলীয় ক্যাডার, নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে সরকারি কর্মকর্তার মধ্যেও।

অর্থাৎ, আঁতাঁতের উচ্চস্তরে রাজনৈতিক দলগুলো অবৈধ আর্থিক অনুদান ও কমিশনের বিনিময়ে বিনিয়োগকারী ও ঠিকাদারদের অনুমতিপত্র বিলিয়ে থাকে। দুর্নীতি এখানে ক্ষমতার স্থিতি নিশ্চিত করে। অন্য দিকে, নিম্নস্তরে দৈনন্দিন রাজনীতি, সুযোগ-সুবিধা ও ফাঁপা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোক্তা-নাগরিকদের তুষ্ট রেখে চলে। রাজনীতি, পুঁজি ও অপরাধের এই সমন্বয় অপরিহার্য। দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা কাঠামোগত ভাবেই আত্ম-সংশোধনে অক্ষম। মুনাফা ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে, সক্রিয় ভাবে অবৈধতা ও আরও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে হয়। অভিজাত থেকে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত এই দুর্নীতির চক্র স্বয়ংক্রিয়: কে ক্ষমতায় এল বা কে ক্ষমতাচ্যুত হল, তাতে কিছু আসে-যায় না। নেতা বা দলের ঊর্ধ্বে এই চিরস্থায়ী ব্যবস্থার অধিষ্ঠান।

উপরমহল থেকে রাজনৈতিক অর্থায়ন ও নিচুতলা থেকে সমর্থন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা— দুর্নীতিচক্রকে আরও বাধ্যতামূলক করে তোলে। উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতে রাজনৈতিক অভিজাত, প্রভাবশালী পুঁজিপতি, ধনী ভূস্বামী ও আমলাতন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত শাসক জোটের মধ্যেই ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। এরা একে অপরের স্বার্থ রক্ষা করে; একচেটিয়া ভাবে মুনাফা ও রাজনৈতিক প্রভাবের লভ্যাংশ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। এই আঁতাঁতকে উপেক্ষা করে কোনও রাজনৈতিক শক্তিই ক্ষমতা দখল করতে পারে না। দুর্নীতির কাছে মাথা নত না করে ক্ষমতার আসনে বসা কাঠামোগত ভাবে অসম্ভব।

মানুষ তবু আশায় বাঁচে। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক, কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে মরিয়া হয়ে বাড়ির দিকে ছোটেন। এ এক রূঢ় বাস্তব, যেখানে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোকে রেশন ও মোবাইল রিচার্জের মতো সামান্য দাক্ষিণ্যে নামিয়ে আনা হয়। এই সামান্য প্রাপ্তির উপর চরম নির্ভরশীলতা তাঁদের অটল আনুগত্য নিশ্চিত করে, কারণ তাঁরা এই পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ককে অবজ্ঞা করার মতো জায়গায় নেই।

আমাদের রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে মূল লক্ষ্য ভোটে জেতা, মুনাফা লোটা। লুটেরার শাসন আমাদের সয়ে গেছে। ভোটারদের হাতে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন বা অপসারণের নামমাত্র অধিকার থাকলেও, তাঁরা দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিতে অক্ষম। জমি, বন, খনি, সম্পদে একচেটিয়া অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ যে গোষ্ঠীর— সেই নেতা, বানিয়া, বাহুবলী, বাবু ও দারোগার জোটই লভ্যাংশ ভাগ বা ভোগ করে। নির্বাচনী ফল যা-ই হোক, এই আঁতাঁত অপরাজেয়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Corruption

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy