E-Paper

জীবনের সন্ধানে, দূরে

ভারতের আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থায় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্টরা সরকারি ভাবে নিবন্ধিত এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক ভাবে কাজ করেন।

তুতান আহমেদ

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ ০৭:৩৫

অনেক মানুষের কাছে বিদেশ মানে শুধু আর একটি দেশ নয়; একটি সম্ভাবনা, একটি নতুন শুরুর স্বপ্ন, কখনও বা শেষ ভরসা। মুর্শিদাবাদ বা নদিয়ার কোনও গ্রামের এক রাজমিস্ত্রি, কিংবা আখখেতের এক শ্রমিকের কাছে ‘বিদেশ’ মানে নৈর্ব্যক্তিক মানচিত্রের দূরের কোনও বিন্দু নয়; বরং জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে খানিকটা নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। প্রতি দিনের আর্থিক টানাপড়েন, অনিয়মিত কাজ, সীমিত আয়— এই বাস্তবের ভিতর থেকেই জন্ম নেয় দূর দেশে পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা। সেই যাত্রা অনেক সময় শুরু হয় খুব সাধারণ কোনও আলাপচারিতা থেকে। চায়ের দোকানে বসে কারও মুখে শোনা গল্প— “ওই পাড়ার লোকটা তো দুবাই গিয়েছিল”— এমন একটি বাক্যও কখনও কখনও হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের নতুন কল্পনার শুরু।

কিন্তু বিদেশে যাওয়ার পথ মোটেই সরল নয়। এটি অনেকটা অচেনা নদী পার হওয়ার মতো— যেখানে স্রোত যেমন আছে, তেমনই আছে অদৃশ্য গভীরতা। ও পারে কী অপেক্ষা করছে, তা পুরোপুরি কেউ জানে না। তবু মানুষ যাত্রা শুরু করে, কারণ এই পারে দাঁড়িয়ে থাকাও আর সম্ভব হয় না। এই পুরো পথচলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন স্থানীয় এজেন্টরা। গ্রামবাংলার অলিগলি এবং শহরের বড় অফিসের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য সেতু তৈরি করেন তাঁরা। অনেক সময় তাঁরাই প্রথম খবর দেন— কোথায় কাজ আছে, কী ধরনের কাজ, কত টাকা লাগবে, কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন। আবার তাঁরাই কখনও প্রার্থীদের নিয়ে যান শহরে, বড় এজেন্টদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন, বা পুরো প্রক্রিয়ার খোঁজখবর রাখতে সাহায্য করেন।কেউ তাঁদের পথপ্রদর্শক বলে মনে করেন, কেউ সংগঠক; কেউ বা কেবল এমন এক জন পরিচিত মুখ, যাঁর উপস্থিতি অনিশ্চিত যাত্রার শুরুতে খানিক সাহস জোগায়।

ভারতের আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থায় বৈধ রিক্রুটিং এজেন্টরা সরকারি ভাবে নিবন্ধিত এবং মূলত শহরকেন্দ্রিক ভাবে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা সীমিত, আর সম্ভাব্য শ্রমিকরা ছড়িয়ে রয়েছেন অসংখ্য গ্রাম ও ছোট শহরে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরাসরি পৌঁছনো সহজ নয়। গ্রামের পরিস্থিতিও বিচিত্র। এখানে শ্রমিকরা কেন্দ্রীভূত নন। কোথাও দু’জন শ্রমিক, কোথাও চার জন, আবার বহু এলাকায় কেউ নেই। কিছু অঞ্চলে অবশ্য নির্দিষ্ট পেশার মানুষের ঘনত্ব দেখা যায়— মুর্শিদাবাদ বা নদিয়ার কিছু এলাকায় রাজমিস্ত্রি, উত্তর ২৪ পরগনা বা হাওড়া-হুগলি অঞ্চলে ড্রাইভার বা লজিস্টিকস-সংযুক্ত শ্রমিক, আবার দার্জিলিং বা কালিম্পং অঞ্চলে হোটেল ও হসপিটালিটি ক্ষেত্রের কর্মী। কিন্তু এই আংশিক ঘনত্বও সমস্যার সমাধান করে না। প্রত্যেক সম্ভাব্য প্রার্থীর কাছে পৌঁছনো, তাঁদের একত্রিত করা এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে ধরে রাখা— এই কাজ সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং প্রায়শই অনিশ্চিত। এখানেই স্থানীয় এজেন্টদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই এজেন্টরা অনেক সময় এমন মানুষ, যাঁদের এলাকায় সবাই চেনে। কেউ আগে নিজে বিদেশে গিয়েছিলেন, কেউ দীর্ঘ দিন ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের কথায় এক ধরনের ভরসা থাকে। আবার সেই ভরসার ভিতরেই লুকিয়ে থাকে সংশয়। কারণ, সম্পর্কের ভিত্তি এখানে কাগজে লেখা চুক্তি নয়; বরং দীর্ঘ দিনের পরিচয়, অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক যোগাযোগ। এক জন স্থানীয় এজেন্ট অনেক সময় একাধিক রিক্রুটিং এজেন্টের সঙ্গে কাজ করেন। কোথাও তিনি মধ্যস্থতাকারী, কোথাও তথ্যের বাহক, কোথাও আবার পুরো প্রক্রিয়ার অলিখিত সংগঠক। এই ব্যবস্থার মধ্যে যেমন সহায়তা রয়েছে, তেমনই রয়েছে অনিশ্চয়তাও। প্রার্থীরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে, কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কাকে বিশ্বাস করা উচিত, আর কাকে নয়। কেউ মাঝপথে সরে দাঁড়ান, কেউ আর্থিক কারণে পিছিয়ে পড়েন, আবার কেউ শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যান কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। ফলে একই ব্যবস্থার ভিতর থেকেও তৈরি হয় একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা— কারও কাছে বিদেশযাত্রা সাফল্যের গল্প, কারও কাছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার স্মৃতি।

আইনগত কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৩ সালের অভিবাসন আইন আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করলেও, গ্রাম স্তরে সক্রিয় স্থানীয় এজেন্টদের ভূমিকা সেখানে স্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে একটি ফাঁক থেকেই যায়। এই ফাঁকই অনেক সময় পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও জটিল করে তোলে। নিয়ম আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ সব সময় দৃশ্যমান নয়। প্রক্রিয়া আছে, কিন্তু তা সব সময় স্বচ্ছ নয়। এই অদৃশ্য পরিসরই অনেক সময় এক জন শ্রমিকের অভিজ্ঞতাকে নির্ধারণ করে।

আন্তর্জাতিক শ্রম অভিবাসনের প্রক্রিয়াটি বহুমাত্রিক। এক জন প্রার্থীকে কাজের বিবরণ বোঝানো থেকে শুরু করে সাক্ষাৎকারে যোগদানের ব্যবস্থা করে দেওয়া, নথিপত্র প্রস্তুত করা, মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো, ভিসার জন্য আবেদন— প্রতিটি ধাপের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। এর সঙ্গে জুড়ে থাকে শহরে যাতায়াত— কখনও কলকাতা, কখনও দিল্লি, কখনও অন্য কোথাও। প্রতিটি যাত্রায় সময়, তার জন্য অর্থ এবং মানসিক প্রস্তুতি প্রয়োজন। এই পথ তাই শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি এক ধরনের দীর্ঘ মানসিক পরীক্ষাও। প্রতিটি ধাপে থাকে অপেক্ষা, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর কিছু নতুন উদ্যোগ সামনে এসেছে। যেমন, আইআইটি খড়্গপুরের উদ্যোগে ‘ওভারসিজ় এআই’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে, যেখানে প্রার্থীরা সরাসরি নিবন্ধন করে চাকরির তথ্য দেখতে পারেন এবং নিজেরাই আবেদন করতে পারেন। এই ধরনের উদ্যোগের লক্ষ্য তথ্যকে সহজলভ্য করা এবং প্রার্থীদের সামনে একটি বিকল্প পথ তৈরি করা। বাস্তবে দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের মানুষ এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। কেউ সরাসরি চাকরির জন্য আবেদন করেছেন, কেউ তথ্য জানতে এসেছেন, আবার কেউ এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছেন। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় স্তরেও নতুন ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে— বিশেষ করে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে, যাঁরা আগে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনগুলি আরও গভীর ভাবে বোঝার প্রয়োজন রয়েছে।

তবে প্রযুক্তি যতই এগোচ্ছে, একটি বিষয় ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে— মানুষের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে এই ব্যবস্থাকে বোঝা সম্ভব নয়। গ্রাম থেকে বিদেশের পথে যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি গভীর ভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক। সেই কারণেই এই অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। কী ভাবে পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ করা যায়? কী ভাবে প্রার্থীরা সহজে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে পারেন? কী ভাবে বিদেশে যাওয়ার পথটিকে আরও নিরাপদ এবং মর্যাদাপূর্ণ করা যায়?

নীতিগত দিক থেকেও তাই নতুন ভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। অভিবাসন আইন, ১৯৮৩-র কাঠামোর মধ্যে গ্রাম স্তরের পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যেখানে চাকরির ধরন, শর্ত, বেতন এবং পুরো প্রক্রিয়ার ধাপগুলি পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপিত থাকবে। বর্তমানে সরকারি ই-মাইগ্রেট প্ল্যাটফর্ম মূলত বিদেশি নিয়োগকর্তা এবং রিক্রুটিং এজেন্টদের তথ্য সংরক্ষণ করে। কিন্তু প্রার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট— যেখানে তাঁরা সহজেই যাচাইযোগ্য তথ্য পাবেন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারবেন। একটি স্বচ্ছ এবং সহজবোধ্য ব্যবস্থা যেমন প্রার্থীদের আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে, তেমনই পুরো প্রক্রিয়াটিকেও আরও সংগঠিত করে তুলতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার এই যাত্রা কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি গভীর ভাবে মানবিক। এক জন মানুষ যখন নিজের গ্রাম ছেড়ে অজানা দেশের পথে পা বাড়ান, তখন তিনি শুধু কাজের খোঁজে যান না। সঙ্গে নিয়ে যান পরিবারের আশা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, এবং আরও ভাল জীবনের আকাঙ্ক্ষা। সেই কারণেই এই পথকে আরও স্বচ্ছ, নিরাপদ এবং সম্মানজনক করে তোলা জরুরি। কারণ বিদেশের পথ কখনওই কেবল দূরের পথ নয়; তা খুব কাছের মানুষের জীবন, উদ্বেগ ও ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

migrant labour

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy