E-Paper

ভালবাসা খুঁজে নেয় যারা

জার্মান তথ্যচিত্রকার ওয়ার্নার হেরজ়গ দক্ষিণ মেরুতে দলছুট এক পেঙ্গুইনকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। তারা ভিড় করে সমুদ্রের ধারে, বরফের সঙ্গে একত্র বোঝাপড়ায়।

অনমিত্র বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ ০৭:২১

ডাক্তার মুনসীর বইটি ছাপবে পেঙ্গুইন, কিন্তু পাণ্ডুলিপি ‘মিসিং’। ‘রাজকোষ হতে চুরি’র নিয়মে চোর ধরা পড়ল, লেখাটা উদ্ধার হল না। ফেলুদার কেরামতির পরিপূরণ জটায়ুর আলোক-সংস্করণ উপস্থাপনে: “টাইপিং শুরু করে দিন, শেষ হলে পর সোজা নর্থ পোল।” অবশ্য একটা জটায়ু-মার্কা ভুল হল— পেঙ্গুইন নর্থ পোলে থাকে না, থাকে সাউথ পোলে। তা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুঁদে জনসংযোগ কর্মীও সেই ভুল করলে আপনভোলা জটায়ুর কী আর দোষ?

জার্মান তথ্যচিত্রকার ওয়ার্নার হেরজ়গ দক্ষিণ মেরুতে দলছুট এক পেঙ্গুইনকে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন। তারা ভিড় করে সমুদ্রের ধারে, বরফের সঙ্গে একত্র বোঝাপড়ায়। সে হেঁটে চলেছিল ভূমিখণ্ডের অভ্যন্তরে, হয়তো নিশ্চিত মৃত্যুমুখে। সংস্পর্শ ও প্রেম পথের ধুলার মতো তার পা আঁকড়ায়, পরিত্যক্ত মৃৎপাত্রের মতো সে দেয় ‘ধূলিরে ফিরায়ে’। হোয়াইট হাউস থেকে বার্তা: তুষারবক্ষে জীবনবিমুখী পেঙ্গুইনটির হাত ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প চলেছেন গ্রিনল্যান্ড দখলে। তিনি যে ভূখণ্ডের খনিজের প্রতি লুব্ধ, তার প্রাণ-প্রকৃতি সম্পর্কে এতই অজ্ঞ। ফেলুদার সংশোধনী ভর্ৎসনায় লালমোহনের মতো আদৌ কুণ্ঠিত নন। মমত্বহীন অধিকারবোধই একমাত্র সত্য যেন।

জাপানের এক চিড়িয়াখানায় মাতৃপরিত্যক্ত বাঁদরছানা ‘পাঞ্চ’কে উত্তাপের অনুভূতি দিতে একটা ‘প্লাশি’ দেওয়া হয়েছিল। ওরাং ওটাং-এর পুতুল। পুতুলটা সে ছেঁচড়ে সঙ্গে নিয়ে বেড়ায়। ঘুমায় তার কোলের মধ্যে জায়গা করে, একটা হাত টেনে নেয় নিজের গায়ে। অন্য বড় বাঁদরেরা তাড়া করলে পালিয়ে ওর আড়ালেই লুকোয়। সে ওই জড় পুতুলে তার মা’কে খুঁজে পেয়েছে। মা যদি তাকে কোলে না নেয়, সে-ই মা-কে সঙ্গে নিয়ে ঘুরবে। পুতুলটার সবটুকু আদর সে আদায় করে নেবে। হিম বিধাতার মন সে গলাবেই।

২০১৭-য় জাপানের তোবু চিড়িয়াখানার সঙ্গীহীন পেঙ্গুইন গ্রেপ-কুন (ছবি) একটা মেয়ে-পেঙ্গুইনের কার্টুন কাট-আউটের দিকে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকত দিবারাত্র। কাট-আউটগুলো বিজ্ঞাপনী; মেয়াদ ফুরোলে অন্যগুলো সরিয়ে নিলেও, গ্রেপ-কুনের খাঁচার কাট-আউটটা রেখে দেন কর্তৃপক্ষ। আজ সেখানে অন্য কাট-আউট, গ্রেপ-কুন আর হুলুলু নামের সেই কার্টুন পেঙ্গুইনটি এক সঙ্গে। গ্রেপ-কুন নাকি হুলুলুর প্রেমে পড়েছিল; কর্তৃপক্ষ গ্রেপ-কুনকে জানাচ্ছেন, ‘তোমাকেও আমরা ভালবেসেছিলাম, তোমাকে আমরা মনে রেখেছি।’

গল্পকথায় আছে, শিশু মীরা বরযাত্রী দেখে প্রশ্ন করেছিল, ‘আমার স্বামী কে?’ মা নির্ভাবনায় দেখিয়েছিলেন গোপালের মূর্তি। অকস্মাৎ মীরার পুতুলখেলা ‘মূর্তিপূজা’য় পরিণত হয়; বিবাহিতা মীরাবাই বুঝতে শেখেন, গিরিধর তাঁর স্বামী নয়, ‘নাগর’। ‘গেরিলা যুদ্ধ স্বামীর ঘরে’— দেখাসাক্ষাৎ হবে সঙ্গীতের রাজপথে।

‘দেবতার জন্ম’কে শিবরাম চক্রবর্তী কুসংস্কার হিসেবেই দেখিয়েছেন। তবে মানুষের যা কিছু মহৎ চিন্তা, সহৃদয় ভালবাসা, অসহায়তার বিরুদ্ধে মানসিক যুদ্ধপ্রস্তুতিও ওর মধ্যে নিহিত নয় কি? সে আপন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে পাষাণে, ভক্তি দিয়ে পাষাণকে দ্রব করেছে। ‘পাঞ্চ’ বাঁদরছানাটিকে পুতুলটা বিপদ-আপদ থেকে না-ই বা বাঁচাল— ওর মধ্যে মায়ের গা-ঘেঁষা আশ্রয়টা না পেলে তার বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে যেত হয়তো। পাঞ্চের ক্রমশ বন্ধু জুটছে, বড় হচ্ছে সে। উষ্ণতার জৈবিক অপরিহার্যতায় মা’কে আর প্রয়োজন নেই তার। প্রাপ্তবয়স্ক শ্রীকৃষ্ণের দৌড়ঝাঁপে মা যশোদা ভূমিকাহীনা বলে মহাভারতে তাঁর উল্লেখ নেই। কিন্তু পাঞ্চ এখনও পুতুলটা সঙ্গে নিয়ে ঘোরে। ভয় পেলে তার বুকে মুখ লুকোয় না, কিন্তু কর্মীরা পুরনোটা বদলে নতুন পুতুল দিলে বেঁকে বসে।কে জানে, দ্বারকায় লোকচক্ষুর আড়ালে শ্রীকৃষ্ণ কদাচিৎ আভীরপল্লির সুর তুলে বাঁশিতে চুম্বন করেছিলেন কিনা!

আদিতে বুদ্ধ ভাবতেন, ‘ধম্ম’ পুরুষের। গৌতমীর অনুনয়েও দীক্ষা দেননি। পরে শিষ্য আনন্দ তাঁকে রাজি করান, তর্কে। কী ক্ষতি হত, যদি তিনি নেহাত মায়ের মন রাখাকেই একটু বেশি গুরুত্ব দিতেন? আমেরিকায় গোমাংস-ভক্ষণের অভিযোগ উঠলে, ভক্তদের শ্রদ্ধা ও ধর্মে অধিকার হারানোর অর্থহীনতা ছাপিয়ে জনমদুখিনী মায়ের প্রতিক্রিয়াহীন মর্মাঘাতই সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে বিব্রত করেছিল।

শঙ্কর-শিষ্য যোগানন্দের ‘কস্ত্বং কোঽহং কুত আয়াতঃ, কা মে জননী কো মে তাতঃ?’ প্রশ্নে কেউ বিশ্বব্যাপারকে স্বপ্নজ্ঞানে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। এরা জ্ঞানী, বিচক্ষণ। সংসারত্যাগী পেঙ্গুইনটির মতো নিরুদ্দেশে বেরোয় ‘নেই’-এর তপস্যা করতে। এদের কাছে ভালবাসা অর্থহীন, নেই আবেগের তাৎপর্য। পর্দার শার্লকের মতো বলে, “সেন্টিমেন্ট ইজ় আ কেমিক্যাল ডিফেক্ট ফাউন্ড অন দ্য লুজ়িং সাইড।” আবার, কারও কারও চোখে আলো ফেলে সূর্য বলে ওঠে, ‘আছি’। ঝড়ের হাওয়া জানান দিয়ে যায় ‘আছি’, জঙ্গুলে মাটির সোঁদা গন্ধ হৃদয় ভরায় ‘আছি’-র অনুরণনে। এরা সরল, উন্মাদ। ‘অস্তি’কে খোঁজে সঙ্গীতে, বিজ্ঞানে, শ্বাসপ্রশ্বাসে; সোৎসাহে, প্রগাঢ় ভালবাসায়— বাঁদরছানাটির মতো। ‘নেই’-এর বিশ্বাস তার মনে গেঁথে বসেনি। পরিপার্শ্বের সামান্যতার মধ্যে ভালবাসার উপাদান খুঁজে নিয়ে সে বিধাতাকে লজ্জিত করতে জানে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Punch Penguin

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy