E-Paper

কংগ্রেসের অগ্নিপরীক্ষা

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। সীতারাম ইয়েচুরির আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, কোনও ভাবেই যাতে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটে ভাঙন না ধরে। জাতীয় স্তরে জোট টিকে যায়, কিন্তু অনেক রাজ্যে বিরোধীদের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়নি।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ০৯:০৬
সঙ্গী: তামিলনাড়ুর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সি জোসেফ বিজয়ের পাশে রাহুল গান্ধী ও অন্য নেতারা।

সঙ্গী: তামিলনাড়ুর নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সি জোসেফ বিজয়ের পাশে রাহুল গান্ধী ও অন্য নেতারা। ছবি: পিটিআই।

আপনি তো রাহুল গান্ধীর ‘ফ্রেন্ড, ফিলসফার, গাইড’ হয়ে উঠেছেন!” দিল্লিতে সিপিএম-এর সদর দফতর এ কে গোপালন ভবনের দোতলায় সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডায় এ কথা শুনে সীতারাম ইয়েচুরি মুচকি হেসেছিলেন। তার পরে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিলেন, “তোমরা এ সব লিখবে! আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাববেন, সীতারাম ইন্ডিয়া জোটে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। তাঁর রাগ গিয়ে পড়বে কংগ্রেসের উপরে। বিজেপির বিরুদ্ধে বিরোধী ঐক্য নষ্ট হবে।”

এটা ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। সীতারাম ইয়েচুরির আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, কোনও ভাবেই যাতে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটে ভাঙন না ধরে। জাতীয় স্তরে জোট টিকে যায়, কিন্তু অনেক রাজ্যে বিরোধীদের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়নি। তা সত্ত্বেও ‘চারশো পার’-এর লক্ষ্য নিয়ে ভোটে নেমে বিজেপি লোকসভায় ২৪০ আসনে আটকে যায়।

বলা বাহুল্য, লোকসভা ভোটের সেই ‘অ্যাডভান্টেজ’ বিরোধী শিবির ধরে রাখতে পারেনি। হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার— একের পর এক বিধানসভা নির্বাচনে হারে ইন্ডিয়া জোট আবার ছন্নছাড়া। সদ্য শেষ হওয়া পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে হেরে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে, বিরোধী শিবিরের কাছে যা ‘অভাবনীয়’ ছিল।

বিজেপি তথা এনডিএ এখন ২২টি রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায়। উত্তরে জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, পঞ্জাব; দক্ষিণের কেরল, কর্নাটক, তামিলনাড়ু বাদ দিলে দেশের মানচিত্রে বাকি অংশে কার্যত গেরুয়া-রাজ। কংগ্রেস-পরবর্তী রাজনীতিতে যারা প্রধান চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছিল, বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া আজ তেমন আঞ্চলিক দলগুলিকে একের পর এক ধরাশায়ী করেছে।

ষাটের দশক পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের একদলীয় রাজত্ব চলেছে। তার পর ক্ষয়ের শুরু। আশির দশকের শেষ থেকে কংগ্রেসের রেখচিত্র আরও নিম্নমুখী হয়, বিশেষ করে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্টের পর থেকে। উল্টো দিকে, তখন থেকেই আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান শুরু। তাই ১৯৮৯-এর পর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত ২৫ বছর জাতীয় স্তরে জোট রাজনীতি কায়েম ছিল। বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ, কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ ক্ষমতায় এলেও সেই সরকার পুরোপুরি আঞ্চলিক শরিক দলের উপরে নির্ভরশীল ছিল।

এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। লোকসভায় বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না-থাকায় নরেন্দ্র মোদী সরকার খাতায়-কলমে নীতীশ কুমারের জেডি(ইউ), চন্দ্রবাবু নায়ডুর তেলুগু দেশমের উপরে নির্ভরশীল ঠিকই, বাস্তবে এই আঞ্চলিক দলগুলি এখন অতীতের ছায়া। তাই বিজেপি ইচ্ছামতো নীতীশকে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে নিজের নেতাকে গদিতে বসাতে পারে। একই হাল দেবগৌড়ার জেডি(এস)-এর। তেলুগু দেশমের চন্দ্রবাবু নায়ডু অন্ধ্রে ক্ষমতায় আছেন বলে তাঁর এখনও নিজস্ব শক্তি রয়েছে। বিরোধী শিবিরে তৃণমূল, ডিএমকে এখন ভগ্নমনোরথ। বিহারে হারের পর লালুপ্রসাদ-তেজস্বীর আরজেডি-রও একই পরিস্থিতি। শরদ পওয়ারের এনসিপি, উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা দু’টুকরো হয়ে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই করছে। আম আদমি পার্টি দিল্লিতে হারের পরে পঞ্জাবে কঠিন লড়াইয়ের মুখে। তার আগেই দলের সাত রাজ্যসভা সাংসদ বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। লোকসভা ভোটে উত্তরপ্রদেশে ভাল ফল করার পর অখিলেশ যাদবের সামনে এখন আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচন অগ্নিপরীক্ষা। কেরলে হারের পরে বামেরা পঞ্চাশ বছর পরে এই প্রথম কোনও রাজ্যে ক্ষমতায় নেই। এনডিএ ও ইন্ডিয়া-র বাইরে থাকা দলের মধ্যে নবীন পট্টনায়কের বিজেডি, তেলঙ্গানার বিআরএস ক্ষমতাচ্যুত হয়ে টিকে থাকার লড়াই করছে।

আঞ্চলিক দলগুলির এই শক্তিক্ষয় কি কংগ্রেসের সামনে নতুন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ? সে জন্য আগে কংগ্রেসকে নিজের সংগঠন শক্তিশালী করতে হবে, পুনরুদ্ধার করতে হবে আঞ্চলিক দলের কাছে হারানো জমি। আশির দশকের পর থেকে রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেসের জমি দখল করেই আঞ্চলিক দলগুলি মাথা তুলেছিল। এখন আঞ্চলিক দলগুলি মুখে বলে, বিজেপির বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের লড়াইয়ে সাফল্য পেতে হলে কংগ্রেসকে মজবুত হতে হবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এম কে স্ট্যালিন থেকে অখিলেশ বা তেজস্বী যাদবরা কংগ্রেসকে সূচ্যগ্র মেদিনীও ছাড়তে রাজি হন না। বরং কংগ্রেস যেখানে শক্তিশালী, অরবিন্দ কেজরীওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা সেখানে গিয়ে ভোটে লড়ে বিজেপিকে সুবিধা করে দিয়েছেন। গত লোকসভা নির্বাচনে জাতীয় স্তরে ইন্ডিয়া জোট টিকে গেলেও অনেক রাজ্যেই ইন্ডিয়া-র শরিকদের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়নি।

পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের পর ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে এই টানাপড়েন আরও বেড়েছে। এক দিকে তামিলনাড়ুতে কংগ্রেস তড়িঘড়ি ডিএমকে-র সঙ্গ ত্যাগ করে সি জোসেফ বিজয়ের টিভিকে দলকে সমর্থন করেছে। তাই সংসদে ডিএমকে কংগ্রেসের থেকে দূরত্ব তৈরির বার্তা দিয়েছে। অখিলেশ কংগ্রেসকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন, সমাজবাদী পার্টি বিপদের সময় শরিকদের ছেড়ে যায় না। অন্য দিকে আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোটে হারের পরে কংগ্রেসের সম্পর্কে তাঁর ‘অ্যালার্জি’ ত্যাগ করে এখন কংগ্রেস, বাম, অতি-বামের রামধনু জোট চাইছেন— সকলে মিলে ‘প্রথম শত্রু বিজেপি’-র বিরুদ্ধে জোট বাঁধার আহ্বান জানিয়েছেন।

মুশকিল হল, রাহুল গান্ধী জোট শরিকদের নিয়ে নানা সুরে কথা বলছেন। বিহারে হারের পর তিনি প্রথমেই রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের কাছে জানতে চান, আরজেডি-র সঙ্গে জোট আর রাখার প্রয়োজন আছে কি না। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-কংগ্রেস-বাম জোট হারার পর তিনি স্ট্যালিনের সঙ্গে আলোচনা না করেই বিজয়কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। বামেরাও বিজয়কে সমর্থন করেছেন; তবে স্ট্যালিনকে এ কথা জানিয়ে যে, বিজয়কে সরকার গঠনে সাহায্য না করলে তামিলনাড়ুতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে বিজেপি রাজত্ব করবে। রাহুল গান্ধী সে-সবের ধার ধারেননি। আবার অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে ভোট চুরির অভিযোগ তোলার পর তিনি তৃণমূলকে সমর্থন জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে রাহুল গান্ধী বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বা তার পর দাবি করেছেন, একমাত্র কংগ্রেসই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ে বিজেপিকে হারাতে পারে। কারণ এটা মতাদর্শের লড়াই। সেই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোনও দলই বিজেপির বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না। কথাটা তাত্ত্বিক ভাবে যতই ঠিক মনে হোক, বাস্তবে তার প্রতিফলন বিশেষ দেখা যায় না। মোদীর গত ১২ বছরের শাসনকালে এত দিন আঞ্চলিক দলগুলিই বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য পেয়েছে। উল্টো দিকে, বিজেপির বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে কংগ্রেসের ট্র্যাক রেকর্ড খুবই খারাপ— তা সে বিধানসভা নির্বাচন হোক বা লোকসভা। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফল দেখলেই বোঝা যাবে, কংগ্রেস যেখানে তুলনামূলক ভাবে শক্তিশালী এবং বিজেপি-কংগ্রেসের মুখোমুখি লড়াই, সেই কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়, হরিয়ানাতেও বিজেপি সিংহভাগ আসনে জিতেছে। না হলে বিজেপি ২৪০ আসনেও পৌঁছত না। শরিকদের সমর্থনেও সরকার হত না। তৃতীয় বার মোদীর ক্ষমতায় ফেরা হত না। তাই কংগ্রেসকে আঞ্চলিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে, রাহুল গান্ধী ভবিষ্যতে একার জোরে বিজেপিকে হারানোর যতই স্বপ্ন দেখুন না কেন। জাতীয় স্তরে প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার পথে বিজেপিকেও অকালি দল, শিবসেনা, জেডি(ইউ)-এর মতো শরিকদের নির্ভর করেই এগোতে হয়েছিল।

অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ জয়ের পরে এখন এক ঝাড়খণ্ড বাদে পূর্ব ভারতের বাকি সব রাজ্যই বিজেপির দখলে। অন্য রাজ্যে বিজেপির যেটুকু শক্তিক্ষয় হয়েছে, ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পূর্ব ভারত থেকে তা পূরণ করতে চাইবে। কংগ্রেসের সামনে ২০২৯-এর আগে চ্যালেঞ্জ হল, নিজেকে জাতীয় স্তরে বিজেপির বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা এবং একই সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। সীতারাম ইয়েচুরির স্মরণসভায় রাহুল গান্ধী বলেছিলেন, ইন্ডিয়া জোটের মধ্যে সীতারাম সেতুবন্ধনের কাজ করতেন। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত আগামী তিন বছর বিরোধী জোটে কে ‘সেতুবন্ধন’ করবেন, তা-ই এখন মূল প্রশ্ন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Congress Vijay Thalapathy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy