E-Paper

মামুলি ও আধুলি

নিয়ন্ত্রণ মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। সমাজ আর ব্যক্তির নিত্য চলাচলে নিয়ন্ত্রণের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো আমরা গড়ে তুলি প্রতি দিন। এই প্রতি দিনই আমাদের ছাপোষা জীবনে একমাত্র ধ্রুব। এক-এক জনের এক-এক রকম।

সুমিত চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ০৭:২৫

এই যে বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধ, প্রতি দিন খবরের কাগজে চোখ রাখলেই এক-একটা গ্রাম-শহর ধ্বংস অথবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার খবর, এ সবই ক্রমাগত গা-সওয়া হয়ে আসে। যুদ্ধ আদতে আধুনিকতা বা সভ্যতার এক রকম আখ্যানের সূচক। এর বিবিধ কারণ, বিচিত্র নকশা, রাজনীতির জটিল সব আঁকিবুকি। আমরা আমআদমি, আমাদের কাছে অত খুঁটিনাটি পৌঁছয় না। পৌঁছলেও সবটা বুঝে উঠতে পারি না মোটে। আমাদের জ্বালানির দাম বাড়ে, রান্নার গ্যাস কম পড়ে, বাজার আগুন হয়ে থাকে। গড়পড়তা মধ্যবিত্ত মানুষ এই সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে চলতে অভ্যস্ত। মেনে নিতে নিতে আর মানিয়ে নিতে নিতেই জীবন কেটে যায়।

যদি খানিক ছড়িয়ে ভাবি, সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের রোজকার জীবনে তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় কিছুই থাকে না। বাজারের দর, যোগ্যতামাফিক চাকরি, চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান খরচ। সরকারি খয়রাতির নির্ভরতা আর পারিবারিক চাহিদার এ দিক-ও দিক কাটাকুটি করে টু-পাইস ধাঁচের জীবন কেটে যায় এক রকম করে। এ সবই অভ্যাস। ব্যতিরেক কদাচিৎ হয়, তাও কিছু মানুষের জীবনে, সেও এক সময় গড্ডলিকার দায়ে স্মৃতির কানাচে গিয়ে পড়ে থাকে। প্রতি দিনের মামুলির চলমানতায় আধুলির দর বুঝে ওঠা হয় না খুব।

তবু, নিয়ন্ত্রণ মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম। সমাজ আর ব্যক্তির নিত্য চলাচলে নিয়ন্ত্রণের একটা নির্দিষ্ট কাঠামো আমরা গড়ে তুলি প্রতি দিন। এই প্রতি দিনই আমাদের ছাপোষা জীবনে একমাত্র ধ্রুব। এক-এক জনের এক-এক রকম। কেউ ভোরে উঠে ফুল তোলে, স্নান সেরে ঈশ্বরের স্তব করে; কেউ শরীরচর্চা করে, কেউ গলা সাধে, কেউ দুধ আনতে গিয়ে সকালের রোদ গায়ে মেখে খানিক হেঁটে ফেরে, কেউ ক্রিকেট খেলতে যায়। তার পর যে যার নিজস্ব চাহিদা আর প্রয়োজনমতো দিনটাকে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। নৈমিত্তিক কত ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও একটা কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করে নিজের যাপনকে। সব রাগ-দুঃখ, হাসি-কান্নার পরেও যেটুকু নিয়ন্ত্রণ আমাদের পক্ষে সম্ভব।

আসলে এই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার ভিতরে একটা পরিসরের ভাবনা নিহিত থাকে। ব্যক্তিগত পরিসর, আমি আর আমার পরিবারের মানুষজন। এটুকুই। যুদ্ধ অথবা মহামারি, তামাম বিশ্বের হাজারো মর্মান্তিক সমস্যা আমার এই গণ্ডির বাইরে ঘটে চলে। তার রেশ কি এতটুকুও আমার দুনিয়ায় দাগ কাটে না? কাটে। নিশ্চিত ভাবে কাটে। ছাপোষা জীবনে যতটুকু কাটা সম্ভব, ততটুকুই। বাড়ির লোক অতিমারির জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যায়, ক’দিন ছোটাছুটি চলে তাকে নিয়ে, পরিজনের দুশ্চিন্তা, ব্যয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগ এক দিন ঘরে ফেরে, পারিবারিক একান্ত শুশ্রূষায় ফেরে, ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। অপর দিকে, অন্য দেশে ঘটে চলা যুদ্ধের রেশটুকুও এসে লাগে। বাজার অগ্নিমূল্য হয়, আমরা খানিক কাটছাঁট করি। পরিবারের কোনও এক জনের হয়তো চাকরি থাকে না, সকলে মিলে কোনও এক রকম ভাবে ঠিক কেটে যায় দিন। যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রদেশ থেকে আন্তর্জালে ভেসে ওঠা শিশুর মৃতদেহ হাতে নিয়ে আর্তনাদ করা মায়ের ছবি দেখে আমাদের মনখারাপ হয় খুব। বিমর্ষ হই। নিজেকে সান্ত্বনা দিই, এ বিষয়ে আমি কী-ই বা করতে পারি! সন্ধ্যাবেলায় নিজের পরিবারের সঙ্গে আরও একটু নিবিড় হয়ে বসি।

এত ক্ষণ এক রকম নিয়ন্ত্রণের কথা বললাম আসলে ওই মামুলির থেকে আধুলিকে আলাদা করার জন্যই। অনেক না-পাওয়ার আনাচে-কানাচে লেগে থাকে দুঃখের রেশ। সে আমাদের এক রকম প্রতি দিন। নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন প্রতি দিন। পরিসরের ভিতরের প্রতি দিন। এ আমাদের নিত্যকার দুঃখ, বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতার দুঃখ। তবু, এই পরিসরের বাইরে রয়ে যায়, এমন ঘটনাও তার নিতান্ত ব্যক্তিগত অভিঘাত নিয়ে আসে আমাদের কাছে। ক’দিন আগে এমন একটা ঘটনার সাক্ষী রইলাম— মৃত্যু, আর মৃত্যুজনিত শোক। এই মৃত্যুও কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই আমাদের চেনা পরিসরের, চলমান জীবনের প্রতি দিনের অংশ। আমাদের প্রিয়জনেরা আমাদের ছেড়ে চলে যায়। আমরা দুঃখ পাই, কখনও শোক। দুর্লঙ্ঘ্য এক অন্ধকার আমাদের ঘিরে ধরে। আবার পরিজনের শুশ্রূষায় জীবনের নৈমিত্তিক চলমানতায় ফিরে আসি। তবে, যে ঘটনার সূত্র ধরে সে দিনের অভিজ্ঞতা হল, তা আমাদের পরিসরের মধ্যেকার হলেও, সচরাচরের নয়।

মধ্যবয়স্ক পিতা সদ্য হারিয়েছেন তাঁর একমাত্র, সদ্যযুবক সন্তানকে। সন্ধ্যার শান্ত গোরস্থানে এসে দাঁড়িয়েছেন সন্তানের সমাধির সামনে। আমি রয়েছি খানিক তফাতে। দেখছি। সমাধি তো খোলা আকাশের নীচে, মাটি লেপে তৈরি। বৃষ্টিতে ভিজে যায়, রোদ্দুরে ফেটে যায়। খুঁজে পেতে সমাধি ঢাকার মনমতো কাপড় পাওয়া যায়নি। ভাল মখমল খুঁজে, দর্জিকে দিয়ে কিনারায় সফেদ লেসের কাজ করা চাদর বানিয়ে এনেছেন। তাই দিয়ে যত্নে ঢাকা সমাধি। তলায় পলিথিনের আর একটা ঢাকা। চারিদিকে ইট দিয়ে চাপা দেওয়া, হাওয়ায় যেন উড়ে না যায়। কাঁধের ঝোলাব্যাগ থেকে বার করছেন একটা ছোট কাপড়ের টুকরো। পরম মমতায় সেই কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করছেন সমাধির উপরে পড়ে থাকা ঝরাপাতা, খড়কুটো, ধুলো। কাপড়টা ঝেড়ে নিয়ে আরও কয়েক বার। তার পর ব্যাগ থেকে বেরোল অনেকগুলো টাটকা সূর্যমুখী ফুল। একটা একটা করে সাজিয়ে দিলেন সমাধির উপরে। একটা করে ফুল রাখছেন, আর ফুলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ফুল সাজানো শেষ হলে সমাধির উপর দিয়ে সন্তানের গায়ে হাত বোলাচ্ছেন পিতা।

আমি বুঝতে পারছি, কখনও সন্তানের হাত দুটোয় আদরের প্রলেপ দিচ্ছেন, কখনও তার পায়ে, কখনও তার বুকের কাছে। ঘুরে ঘুরে চারিদিক প্রদক্ষিণ করে সন্তানের শরীরের এক-একটা অংশ খুঁজে নিচ্ছেন তিনি। কপালের কাছে অনেকক্ষণ হাত বোলালেন, চোখেমুখেও বুঝি। হাত বোলাচ্ছেন আর নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, দু’-একটা কথাও বলছেন অস্ফুটে। বাপে-ছেলেতে কথা, যে কথা আর কেউ শুনতে পাবে না। তার পর চশমা খুলে, ঝুঁকে পড়ে সন্তানের কপালে কপাল ঠেকালেন, স্থির হয়ে রইলেন কিছু ক্ষণ, শুধু শরীরটা কেঁপে উঠছে এক-এক বার। এক সময় উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বার করলেন ভদ্রলোক। মাথায় পরে নিলেন। আল্লার কাছে কিছু প্রার্থনা করলেন খানিক ক্ষণ। চোখ ঢাকা। তার পর সমাধির উপর থেকে চশমাটা নিয়ে পরে নিলেন। ব্যাগ-কাঁধে হাঁটা দিলেন।

যে তীব্র শোক কল্পনার অতীত, তাকে কাছ থেকে নিরীক্ষণের অভিঘাত আমাকে ভাবায়। এই যে সমাধি ছুঁয়ে ছুঁয়ে সন্তানকে প্রতি দিন আরও এক বার অনুভব করা, এই সন্তাপের শিখা আমাদের রোজকার পরিসরের বাইরে। রোজ কত কী ঘটে যাহা, তাহা এমন সত্যি হয় না। যে সাধারণ দুঃখ আমরা প্রতি দিন প্রিয়জনের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি, এই দুঃখ বুঝি তার থেকে তফাতে দাঁড়িয়ে। এর ভাগ দেওয়া কঠিন, নেওয়া কঠিন। অথচ, আমাদেরই সামাজিক অথবা ব্যক্তিগত পরিসরে, পরিচিত পরিসরে এমন কেউ যাঁকে আমরা চিনি, এমন শোক বহন করে চলেছেন নিয়ত। যা নিয়ন্ত্রণের অসাধ্য তাকে নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন। আমাদের সঙ্গে চা খাচ্ছেন, গল্প করছেন, বাজারে যাচ্ছেন, সন্তানের প্রতি উৎসর্গ করার জন্য ফুল কিনছেন প্রতি দিন।

যে ব্যক্তিগত পরিসরের কথা বলছিলাম খানিক আগে, যাকে আমরা আগলে রাখি, বেঁধে রাখি, যত্নে রাখি, তা তছনছ হয়ে গিয়েছে এই মানুষটার। তবুও কোথাও তাঁর বহির্মুখী সত্তা তাঁর অন্তর্মুখী সত্তার সঙ্গে এক রকমের বোঝাপড়া করে চলেছে নিয়ত। এই সন্তাপের নিয়ন্ত্রণও আমাদের মনোজগতের অন্তর্গত। এই শক্তি মানুষমাত্রেই রয়েছে। এই প্রতীতি আমাদের সাধারণ জীবনেও এক অন্যতর আলো ফেলে। যা অসহনীয়, তাকে সহনশীল হয়ে মেনে নিয়ে সমাজের মধ্যে বেঁচে থাকার নিরন্তর অভ্যাসও আমাদের রোজকার জীবন সম্বন্ধে অনেক কথা বলে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Human Behaviour Society

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy