এপ্রিলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভোট দিতে ফিরলেন পরিযায়ী শ্রমিকেরা। বাসস্ট্যান্ডে ভিড়, ট্রেনের কামরায় ঠাসাঠাসি, স্টেশন চত্বরে বিশৃঙ্খলা। সংবাদপত্র আর সমাজমাধ্যমে সেই সব ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরই মধ্যে গুরুগ্রামনিবাসী এক জন সমাজমাধ্যমে লিখলেন— “গুরুগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি কামনা করে। আমরা আমাদের পরিচারিকাদের নিরাপদ এবং দ্রুত প্রত্যাবর্তন চাই।” একটু এ দিক-ও দিক বদলে একই ধরনের পোস্ট অন্য শহর থেকেও ছড়িয়ে পড়েছে। আপাতদৃষ্টিতে হালকা রসিকতা। কিন্তু এই রসিকতার ভিতরেই ধরা পড়ে ভারতের শ্রমবাজারের নির্মম বাস্তব— কোটি কোটি পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন অন্যের প্রয়োজনের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে থাকলেও, তাঁদের নাগরিক মর্যাদা এবং নিরাপত্তা এখনও অনিশ্চিত।
পশ্চিমবঙ্গের এ বারের নির্বাচন স্মরণীয় হয়ে থাকবে শুধু এসআইআর-এর কারণেই। গত কয়েক মাসে বহু পরিযায়ী শ্রমিককে বার বার কাজের জায়গা ছেড়ে ফিরতে হয়েছে নিজেদের গ্রাম বা শহরে। কখনও ফর্ম জমা দিতে, কখনও শুনানিতে হাজিরা দিতে, কখনও বাদ পড়া নাম ফের অন্তর্ভুক্ত করানোর আবেদন করতে। যাঁরা দূর শহরে আট-দশ জন মিলে ছোট ঘরে থাকেন, প্রতিটি পয়সা বাঁচিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠান— ছাদ সারাতে, চিকিৎসা করাতে, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া চালাতে— তাঁদের কাছে এই যাতায়াত নিছক প্রশাসনিক ঝামেলা নয়; ছিল সরাসরি আর্থিক বিপর্যয়। কয়েক দিনের অনুপস্থিতি মানেই মজুরি কাটা, কাজ হারানোর আশঙ্কা, নতুন ঋণ।
গুরুগ্রাম বা অন্য শহরের যে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি পরিচারিকা বা শ্রমিকদের দ্রুত ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিল, তাদের মধ্যে কত জন এই মানুষগুলির নাগরিক অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা। বস্তুত, সেই নিয়োগকারী পরিবারের অধিকাংশের কাছে সম্ভবত এই প্রশ্নটার কোনও অর্থই হয় না।
পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন সাধারণত খবর হয় না। তাঁরা ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য। বাসন মাজেন, বাড়ি তৈরির ইট-বালি-সিমেন্ট বহন করেন, হোটেলে রান্না করেন, কারখানায় কাজ করেন, শহরের বর্জ্য সরান, রাস্তাঘাট গড়েন। তাঁরা না থাকলে শহর থমকে যাবে— কিন্তু তাঁরা দৃশ্যমান হন কেবল বিপর্যয়ের মুহূর্তে। হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ফেরার সময় রেললাইনে মৃত্যু হলে, বা হিংস্র আক্রমণের শিকার হলে। বাকি সময় তাঁরা অর্থনীতি নামক সুবৃহৎ যন্ত্রটিতে অদৃশ্য ‘লুব্রিক্যান্ট’— তাঁরা যন্ত্র সচল রাখেন, কিন্তু আলাদা করে চোখে পড়েন না।
এই পরিস্থিতিকে ঘিরে রাজনৈতিক তর্কও স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কেন কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে যান, ‘যেতে বাধ্য হন’— এই প্রশ্ন নতুন নয়। মজুরির হার কেন কম, কৃষিক্ষেত্রে আয় কী ভাবে বাড়বে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলিকে টিকিয়ে রাখতে নতুন ধরনের সরকারি পরিকল্পনা কোথায়— এই প্রশ্নগুলি রাজ্য সরকারের প্রতি অবশ্যই তোলা উচিত। বিদায়ী তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি; তাদের বৈধতা হারানোর পিছনে এটা সম্ভবত একটা বড় কারণ। রাজনৈতিক পালাবদলের পরে যাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁদেরও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু শুধু পশ্চিমবঙ্গকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে সমস্যার মূল কাঠামো আড়াল হয়ে যায়।
প্রশ্ন তোলা দরকার কেন্দ্রীয় সরকারের দিকেও। গত এক দশকে কেন কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার এত মন্থর? কেন ভয়াবহ বেকারত্ব এবং অনিশ্চিত শ্রমের বিস্তার ঘটছে? কেন ৮০ শতাংশেরও বেশি শ্রমিক এখনও অসংগঠিত ক্ষেত্রে ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা ছাড়া কাজ করেন? কেন কৃষিক্ষেত্র ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার বদলে বহু মানুষ আবার কৃষির দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন? কেন পঞ্জাব থেকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার থেকে ছত্তীসগঢ়— দেশের বিস্তীর্ণ অংশে শিল্প বিনিয়োগ স্থবির? কেন আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর কোনও সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল চোখে পড়ে না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়া পরিযায়ী শ্রমিক-সমস্যার কোনও বাস্তব সমাধান সম্ভব নয়।
ভারতের সংবিধান দেশকে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসাবে চিহ্নিত করেছে। এই ধারণার ভিতরে একটি মৌলিক অঙ্গীকার আছে— আন্তঃরাজ্য চলাচল, শ্রম, পুঁজি এবং সুযোগের অবাধ বিনিময়। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তামিলনাড়ু, কেরল বা হরিয়ানায় কাজ করতে যাবেন, যেমন বিহার বা উত্তরপ্রদেশের বহু মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আসেন। বাজার যখন পুঁজি ও সম্পদের অবাধ চলাচলকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়, তখন শ্রমিকের চলাচল নিয়ে এত অস্বস্তি, এত অপমান, এত সন্দেহ কেন?
বিশ্বায়িত বাজার অর্থনীতিতে পুঁজির আঞ্চলিক কেন্দ্রীভবন নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কিছু অঞ্চল দ্রুত উন্নত হয়, কিছু অঞ্চল পিছিয়ে পড়ে। আমেরিকায় নিউ ইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়া যেমন কাজের আকর্ষণে মানুষ টানে, তেমনই ভারতের ধনী রাজ্যগুলি শ্রমিক টানে অপেক্ষাকৃত গরিব অঞ্চল থেকে। পশ্চিমবঙ্গও এই বাস্তবের বাইরে নয়। শুধু কোনও একটি সরকারের ব্যর্থতা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পতনের দীর্ঘ ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যাবে না। এর মধ্যে আছে দেশভাগের অভিঘাত, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির উত্তরাধিকার, শিল্পনীতির পরিবর্তন, বিনিয়োগের আঞ্চলিক অসমতা— বহু স্তরের ইতিহাস। সমসাময়িক অর্থনৈতিক গবেষণাও সেই দিকেই ইঙ্গিত করে।
কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তব যতই জটিল হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট— পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি সামাজিক এবং রাজনৈতিক আচরণ ক্রমশ উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলায় কথা বলার কারণে একাধিক অন্য রাজ্যে শ্রমিকদের উপর আক্রমণ হয়েছে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির খুব কম। শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপও চোখে পড়ে না। এই প্রশ্ন শুধু কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নয়; সমাজ হিসাবেও আমাদের সামনে ফিরে আসে। আমরা কি সত্যিই নিজেদের এক দেশের মানুষ বলে ভাবি? না কি অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সময় শ্রমিককে ব্যবহার করি, আর অন্য সময়ে তাঁকে বহিরাগত বলে দূরে ঠেলে দিই?
জাতিরাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক কল্পনা। সেই কল্পনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একে অন্যের স্বজন হয়ে ওঠেন। কিন্তু বাস্তবে কি সেই অনুভূতি তৈরি হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের অন্য রাজ্যে মর্যাদার সঙ্গে থাকা এবং কাজ করার অধিকার সামাজিক ভাবে স্বীকৃত এবং রাজনৈতিক ভাবে সুরক্ষিত কি না— এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প হল কি না, তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তারও আগে জরুরি এই প্রশ্ন— দেশের এক অংশের নাগরিক অন্য অংশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বীকৃত জীবন পাবেন কি না।
আজ পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘিরে নানা রাজনৈতিক হিসাব চলছে। কে কাকে ভোট দিলেন, কার সুবিধা হল, কোন দল লাভবান হল— এই সব বিশ্লেষণ চলবে। কিন্তু সেই হিসাবের আড়ালে একটি বড় প্রশ্ন চাপা পড়ে যাচ্ছে। এত বার লাইনে দাঁড়িয়ে, এত বার নিজের পরিচয় প্রমাণ করেও পরিযায়ী শ্রমিকরা কি এখনও এই দেশের পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হয়ে উঠতে পেরেছেন? না কি, তাঁরা এখনও প্রয়োজনের সময়ে ডেকে নেওয়া, আর অপ্রয়োজনের সময়ে ভুলে যাওয়া মানুষ হিসাবেই রয়ে গেলেন?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)