E-Paper

চাপের কাছে নতিস্বীকার

বর্তমান চুক্তি অনুসারে, আমেরিকা সেই শুল্কের হার কমিয়ে ১৮% করল। আর, বিনিময়ে ভারত আমেরিকাকে তিনটি উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছে।

বিশ্বজিৎ ধর

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৮

আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে ভারত সম্মত হওয়ার প্রায় এক বছর পর, দুই দেশ একটি অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তিতে সম্মত হয়ে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে প্রথম পদক্ষেপ করেছে। ফেব্রুয়ারির গোড়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, ট্রুথ সোশ্যালে চুক্তিটির কথা ঘোষণা করেন— তার দিন চারেক পরে আমেরিকা-ভারত যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়। গত অগস্ট থেকে দু’দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, এই অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তির ফলে তা অন্তত সাময়িক ভাবে থামল।

অগস্টের গোড়ায় ট্রাম্প ভারতের উপরে ২৫% শুল্ক আরোপ করেন; এবং তার কিছু দিনের মধ্যেই রাশিয়ার থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসাবে আরও ২৫% বাড়তি শুল্ক চাপে ভারতের উপরে। মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৫০%। বর্তমান চুক্তি অনুসারে, আমেরিকা সেই শুল্কের হার কমিয়ে ১৮% করল। আর, বিনিময়ে ভারত আমেরিকাকে তিনটি উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছে। প্রথমত, আমেরিকার সমস্ত শিল্পজাত দ্রব্য, এবং সে-দেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বড় অংশের উপরে ভারত হয় আমদানি শুল্ক তুলে নিয়েছে, নয় বহুলাংশে কমিয়েছে, এবং শুল্ক-বহির্ভূত বাধা দূর করেছে। অর্থাৎ, আমেরিকা থেকে আমদানি মোটের উপরে শুল্কহীন হতে চলেছে। দ্বিতীয়ত, ভারত রাশিয়ান পেট্রোপণ্যের ‘প্রত্যক্ষ’ বা ‘পরোক্ষ’ আমদানি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এবং আমেরিকার জ্বালানি-পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। তৃতীয়ত, ভারত আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকা থেকে ৫০,০০০ কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি-পণ্য, বিমান এবং বিমানের যন্ত্রাংশ, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি পণ্য এবং কোকিং কয়লা কেনার ‘ইচ্ছা প্রকাশ’ করেছে। এত দিন ধরে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতের যে উদ্বৃত্ত থাকত— অর্থাৎ, আমেরিকায় ভারতের রফতানির পরিমাণ ভারতে আমেরিকান পণ্যের আমদানির পরিমাণের চেয়ে কম হত— ট্রাম্প খুব সচেতন ভাবে চুক্তি আরোপ করে সেই রাস্তাটি বন্ধ করে দিলেন।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত আমেরিকার চাপের কাছে নতিস্বীকার করলেও দেশের কিছু মহলে সমর্থন পেয়েছে এই চুক্তি। চুক্তি-সমর্থকদের দাবি, আমেরিকা তার শুল্ক কমানোর ফলে, ভারতীয় ব্যবসাগুলি এখন বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে তাদের উপস্থিতি আরও বাড়াতে পারবে। তাঁরা আরও যুক্তি দিয়েছেন যে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলির ক্ষেত্রে আমেরিকার বাজারে আমদানি শুল্কের হার যে-হেতু ১৯-২০ শতাংশ, ফলে ১৮% শুল্কের দৌলতে ভারতীয় পণ্য সেখানকার বাজারে তুলনামূলক ভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। তবে এই যুক্তি এখন আর প্রযোজ্য নয়, কারণ সম্প্রতি আমেরিকা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করেছে তাতে আমাদের পড়শি দেশকে কয়েকটা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বিনা শুল্কে আমেরিকাকে পোশাক-পণ্য রফতানি করতে পারবে।

চুক্তিপন্থীদের যুক্তিগুলো খুবই সন্দেহজনক। যেমন, ভারতের ক্ষেত্রে অতি তাৎপর্যপূর্ণ, এবং গোলমেলে, একটি বিষয় হল বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস। বিশেষত দানাশস্যের ক্ষেত্রে। সে বিষয়ে এই অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তি সম্পূর্ণ নীরব। এত দিন ভারত যত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, তার প্রতিটিতেই স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা থাকত যে, ভারতের শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সাম্প্রতিক ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতেও এই কথা রয়েছে। এই শর্তটি কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিকূলতা থেকে দেশের কৃষকদের রক্ষা করার জন্য ভারতীয় সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। আমেরিকার সঙ্গে আলোচ্য বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটল।

খাদ্যশস্যের ক্ষেত্রে ভারত আমদানি শুল্ক হ্রাস করবে না— আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে এই কথাটির কোনও উল্লেখ নেই দেখে সংশয় হয়, আমেরিকার কৃষিপণ্য ব্যবসার জন্য ভারতের কৃষিপণ্যের বাজারটি সম্পূর্ণত খুলে দেওয়ার জন্য ট্রাম্প লাগাতার যে চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন, ভারত সম্ভবত তার কাছে নতিস্বীকার করল। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় আমেরিকার সেক্রেটারি অব এগ্রিকালচার ব্রুক রলিন্সের বিবৃতি থেকে। রলিন্স বলেছেন যে, আমেরিকা-ভারত চুক্তি ভারতের বিশাল বাজারে আরও আমেরিকান কৃষিপণ্য রফতানি করতে, দাম বাড়াতে এবং আমেরিকার গ্রামাঞ্চলে আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তব্য নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা— এ কথা জানানো যে, আমেরিকা থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করা হলেও, কৃষকদের জীবিকা ও দেশের কষ্টার্জিত খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিপন্ন হতে দেওয়া হবে না। স্মর্তব্য, গত স্বাধীনতা দিবসে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষকদের এই আশ্বাস দিয়েছিলেন।

আমেরিকার খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের বাজারে যে শুল্ক-বহির্ভূত বাধা রয়েছে, সে বিষয়ে আমেরিকা দীর্ঘ দিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে আসছে। এই চুক্তিতে ভারত জানিয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বের খাতিরে এ বার এই সমস্যার সমাধান করতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইঙ্গিতটি স্পষ্ট— ভারত সম্ভবত আমেরিকার আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ দাবি মেনে নিয়ে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জিএম) কৃষিপণ্যের আমদানির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে চলেছে। কৃষিক্ষেত্রে এটিই ভারতের সবচেয়ে বড় শুল্ক-বহির্ভূত বাধা ছিল।

আমেরিকার সঙ্গে অন্তর্বর্তিকালীন চুক্তিটিই সম্ভবত ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে অসম বাণিজ্য চুক্তি। ভারত আমেরিকান পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক এবং শুল্ক-বহির্ভূত বাধা দূর করল, আর আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের উপরে ১৮% শুল্ক চাপিয়ে দিল। ট্রাম্পের শুল্ক-যুদ্ধের আগে, আমেরিকায় ভারতীয় আমদানির উপরে গড় শুল্ক ছিল আড়াই শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ, এই চুক্তিতে ভারত তার পণ্যের উপরে সাত গুণ শুল্ক-বৃৃদ্ধি মেনে নিল। এ প্রসঙ্গে দু’টি কথা মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন— এক, ভারত আমেরিকার চাপের কাছে নতিস্বীকার করলেও, ব্রাজ়িল এবং চিন কিন্তু তা করেনি; এবং দুই, বাণিজ্যসঙ্গী দেশের কোনও অন্যায্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে দীর্ঘ দিন ধরে ভারত যে সুনাম অর্জন করেছিল, সেটি ভূলুণ্ঠিত হল।

কয়েক মাস আগে ট্রাম্প যখন রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তি হিসাবে ভারতের উপরে অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক চাপিয়ে দিলেন, তখন ভারত বলেছিল যে, দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা প্রয়োজন, ভারত সেটাই করবে। অর্থাৎ, যদি রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল পাওয়া যায়, ভারত তা-ই কিনবে— কারণ, তাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে, এবং মূল্যস্ফীতির উপরে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। এ বার ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে আমেরিকার তেল কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পশ্চিম গোলার্ধ থেকে চড়া দামে তেল কিনলে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে ভারত তার ঠেলা সামলাবে কী করে, সেটাই দেখার।

ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, তিনি তাঁর প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন, ভারত ফের রাশিয়ান তেল আমদানি আরম্ভ করল কি না, সে দিকে নজর রাখতে। করলে, ফের ২৫% শুল্ক চাপবে। ভারত এখনও এই বিবৃতির বিরোধিতা করেনি। কাজেই, ধরে নেওয়া যায় যে, ভারতের তেল আমদানির উপরে আমেরিকা নজরদারি করবে, এ কথাটি ভারত মেনে নিচ্ছে। এতে একটি বৃহত্তর আশঙ্কা জন্মায়— ভারতের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করতে পারে, এমন ক্ষেত্রেও আমেরিকা ভবিষ্যতে নজরদারি করবে, প্রশাসন সেই দরজা খুলে দিচ্ছে না তো?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america Trade Deal

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy