E-Paper

কার জীবন কতখানি দামি

একে যদি আমরা শুধুমাত্র এক জন বিকৃত ধনীর অপরাধ হিসেবে দেখি, তা হলে আজ আমরা আধুনিক সভ্যতার একটি গভীর ফাটলকে আড়াল করি।

রোহন ইসলাম

শেষ আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৬

সভ্যতার ইতিহাসকে যদি এক বাক্যে ধরতে হয়, তা হলে বলতে হয়— এটি একটি নৈতিক বাছাইয়ের ইতিহাস। সমাজ বার বার ঠিক করেছে, কার জীবন গণ্য হবে, কার যন্ত্রণা শোনা হবে, আর কারটি ব্যবস্থার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া যাবে। ‘নেশন-স্টেট’ জন্ম নিয়েছিল এই বাছাইকে ব্যক্তির খেয়াল থেকে সরিয়ে আইনের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। আশা ছিল, ক্ষমতা আর নির্ধারণ করবে না কে মানুষ, কে উপাত্ত। কিন্তু যখন আইন তার কাজ করেও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রশ্নটি আর কোনও ব্যক্তির অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন সভ্যতার আত্মপরিচয় নিয়ে— সে আদৌ কি তার নৈতিক বাছাইয়ের দায়িত্ব নিতে পারছে?

আমেরিকায় জেফ্রি এপস্টিন-কাণ্ড ঠিক এই জায়গাতেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একে যদি আমরা শুধুমাত্র এক জন বিকৃত ধনীর অপরাধ হিসেবে দেখি, তা হলে আজ আমরা আধুনিক সভ্যতার একটি গভীর ফাটলকে আড়াল করি। এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে— রাষ্ট্র, আইন ও নৈতিকতার যে কাঠামোকে আধুনিকতার ভিত্তি বলে মনে করি, তা আসলে কাদের সুরক্ষা দেয়?

ইতিহাসে ক্ষমতা কখনও এক রকম ছিল না। সামন্তযুগে ক্ষমতা ছিল প্রকাশ্য— রাজা বা প্রভুর শরীরে কেন্দ্রীভূত। আধুনিক ‘নেশন-স্টেট’ সেই ক্ষমতাকে আইনের কাঠামোয় বেঁধে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বলা হয়েছিল, আইনের চোখে সবাই সমান। ব্যক্তিগত সদিচ্ছা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়ই হবে সভ্যতার মানদণ্ড। এপস্টিন মামলা সেই প্রতিশ্রুতির সীমা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। এপস্টিনের ক্ষমতা কেবল ধনের ফল নয়। অপরিমেয় ধনসম্পদ ইতিহাসে বহু মানুষেরই ছিল। এপস্টিনের শক্তি ছিল ‘নেটওয়ার্ক’-এ— সামাজিক সংযোগে— অর্থনীতি, রাজনীতির উচ্চতম কক্ষে, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রভাবশালী সামাজিক বৃত্তের মধ্যে তাঁর চলাচলে। এই পরিসরটি রাষ্ট্রের বাইরে নয়, আবার পুরোপুরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণেও নয়। আধুনিক ক্ষমতা সবচেয়ে নিরাপদ থাকে ঠিক এই মধ্যবর্তী অঞ্চলে।

এই ব্যবস্থায় অন্যায় ঘটলেই শাস্তি— এমন কোনও সরল সমীকরণ নেই। আগে আসে হিসাব-নিকাশ। রাষ্ট্র প্রশ্ন করে না যে, এটা নৈতিক ভাবে ভুল কি না। বরং প্রশ্ন করে, “এটা প্রকাশ পেলে কী ক্ষতি হবে— রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক?” এই হিসাবই আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় সঙ্কেত। এপস্টিন মামলার ঘটনাক্রমটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৫ সালে পুলিশ একটি ১৪ বছরের মেয়ের অভিযোগ পেয়ে তদন্ত শুরু করে। এ রকম অভিযোগ আরও অনেক নাবালিকার কাছ থেকে আসে। ২০০৬ সালে পুলিশ একাধিক অভিযোগে মামলার চেষ্টা করে। কিন্তু মামলা রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের হাতে গেলে মামলার গতি একেবারে বদলে যায়। ২০০৮ সালে এক গোপন চুক্তির ফলে ফেডারাল আদালতে এপস্টিনের বিরুদ্ধে কোনও বড় অভিযোগ আর তোলা হয় না— তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়। বিনিময়ে তিনি শুধু রাজ্য-স্তরে দু’টি ছোট অভিযোগ মেনে নেন। ১৮ মাসের জেল হয়, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই এপস্টিন জেলের বাইরে ‘ওয়ার্ক-রিলিজ়’ আর বাড়িতে থেকে কাটান। এই চুক্তিতে এপস্টিন ছাড়াও চার জন নির্দিষ্ট সহযোগী এবং ‘যে-কোনও সম্ভাব্য সহ-অপরাধী’দেরও শাস্তি থেকে পুরোপুরি মুক্তি (ইমিউনিটি) দেওয়া হয়— নির্যাতিতাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে।

পরে ২০১৯ সালে আদালত জানায়, এটি ‘ক্রাইম ভিকটিমস রাইটস অ্যাক্ট’ (সিভিআরএ)-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। যদিও ২০২০ সালে ‘ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস’-এর একটি রিপোর্টে কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধে পেশাদার অসদাচরণের অভিযোগ খারিজ করা হয়, তবু ‘সিভিআরএ’ লঙ্ঘনের কথা স্বীকার করা হয়। এপস্টিন মামলার এই পরিণতি কোনও ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি দেখায়, কী ভাবে আইনের নমনীয়তা ক্ষমতাধর ও ধনীদের জন্য সুরক্ষায় পরিণত হয়।

এপস্টিন-কাণ্ডের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হল এই যে, রাষ্ট্র এখানে আইন প্রয়োগ করেনি— আইন ব্যবহার করেছে। কোথাও নিয়ম ভাঙা হয়নি, বরং নিয়মের মধ্য দিয়েই অন্যায়কে সীমাবদ্ধ, সহনীয় ও নিয়ন্ত্রিত করে রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় ন্যায় আর একটি নৈতিক মানদণ্ড নয়, বরং একটি প্রশাসনিক চলন— যা প্রয়োগ করা হয় তখনই, যখন তা শাসনের স্থিতিকে বিপন্ন করে। এই ঘটনা দেখায়, কী ভাবে আধুনিক রাষ্ট্রে ন্যায় ধীরে ধীরে একটি শর্তাধীন ধারণায় পরিণত হয়— যার প্রয়োগ নির্ভর করে সামাজিক অবস্থান, যোগাযোগ এবং অস্বস্তির মাত্রার উপর। এপস্টিন-কাণ্ডের নির্যাতিতারা অদৃশ্য ছিলেন না। তাঁদের কথা শোনা হয়েছিল, নথিভুক্তও হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা ছিলেন সেই গোষ্ঠীর বাইরে, যাঁদের যন্ত্রণা রাষ্ট্রের কাছে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত নতুন নয়— দাসপ্রথা থেকে উপনিবেশ, গণহত্যা থেকে জাতিগত নিধন— সব ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, কিছু মানুষের জীবন রাষ্ট্রীয় বিবেচনায় তুলনামূলক ভাবে কম মূল্যবান বলে গণ্য হয়েছে।

এপস্টিন-কাণ্ডে কোনও গোপন ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়নি। উন্মোচন হয়েছে একটি নীরব ঐকমত্য— কার জীবন রাষ্ট্রের কাছে মূল্যবান, আর কার জীবন কেবল ‘ম্যানেজেবল’। প্রমাণিত ঘটনাই যথেষ্ট অস্বস্তিকর— বছরের পর বছর নাবালিকাদের পাচার হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, হয়েছে হত্যাও। রাষ্ট্র তা জেনেছে, প্রতিষ্ঠানগুলি সুবিধা নিয়েছে— অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডোনেশন নিয়েছে, উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বরা তার নেটওয়ার্কে যুক্ত ছিলেন— এবং এই সব কিছু প্রকাশের পরেও কাঠামো বদলায়নি। কেবল নিজেকে সামলে নিয়েছে।

সভ্যতা আইন দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে, কিন্তু আইন নিজে কখনও নৈতিক সাহস তৈরি করতে পারে না। নেশন-স্টেটের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল— ক্ষমতার খামখেয়ালের বদলে ন্যায়কে প্রাতিষ্ঠানিক করা। কিন্তু যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমে এমন যন্ত্রে পরিণত হয়, যেখানে অন্যায় বিচার হয় না, বরং ‘ম্যানেজ’ করা হয়, তা হলে রাষ্ট্র তার নৈতিক বৈধতা হারাতে শুরু করে। এপস্টিন-কাণ্ড আমাদের দেখায়, আধুনিক সভ্যতার বিপদ আর আইনহীনতা নয়। তার বিপদ হল এমন এক আইনি শৃঙ্খলা, যা অন্যায়ের সঙ্গে সহাবস্থান শিখে নিয়েছে। ভবিষ্যৎ তাই কোনও এক ব্যক্তির অপরাধের পুনরাবৃত্তি নিয়ে নয়— ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, আমরা এই ব্যবস্থাকে ন্যায়বিচারের বাহন হিসেবে পুনরুদ্ধার করতে পারব কি না, না কি তাকে কেবল নির্লিপ্ত এক ব্যবস্থায় পরিণত হতে দেব।

কার জীবন ‘প্রশ্ন’ হয়ে উঠবে, আর কার জীবন কেবল ‘কেস ফাইল’ হয়ে থাকবে— এই বাছাইটাই আগামী দিনের সভ্যতার নৈতিক মানচিত্র আঁকবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nation State Jeffrey Epstein

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy