E-Paper

ফুটবল দিয়ে ঘষেমেজে

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও নানা জনপ্রিয় খেলাধুলার বাণিজ্যিক আয়োজনের মঞ্চকে ব্যবহার করেছেন। গল্ফ তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের খেলা, তার ব্যবসাতেও তিনি সফল।

শুভঙ্কর ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ ০৮:১৯

এক ঢিলে তিন পাখি: ব্যবসা, প্রচার, জনপ্রিয়তা। সুযোগের এমন সুন্দর সহাবস্থান আর কোথায় পাওয়া যাবে, ফুটবল বিশ্বকাপ ছাড়া? তাই অধীর অপেক্ষায় ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুযোগ সফল ভাবে কাজে লাগাতেই হবে, যুদ্ধবাজ রাজনীতির কারবারি থেকে ক্রীড়ানুরাগী শান্তিপ্রিয় এক বিশ্বনেতার ভূমিকায় নিজের ভাবমূর্তি ঘষেমেজে নেওয়ার সুবর্ণসুযোগ। নতুন শব্দবন্ধ ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ এখন অতি প্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক বা বিরাট মাপের জনপ্রিয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বা অনুষ্ঠানকে নিজের ভাবমূর্তি বিকাশে কাজে লাগানোই ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক্সের মতো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংগঠক দেশের রাষ্ট্রনেতার নেতিবাচক দিক আড়াল করা, পরিবর্তে উদার বিশ্বহিতের অবতাররূপে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরাই এর মূল কথা।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও নানা জনপ্রিয় খেলাধুলার বাণিজ্যিক আয়োজনের মঞ্চকে ব্যবহার করেছেন। গল্ফ তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের খেলা, তার ব্যবসাতেও তিনি সফল। দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসীন হয়ে সুযোগ পেলেই ক্রীড়ানুষ্ঠান বা প্রতিযোগিতাকে নিজের ভাবমূর্তি গড়ায় কাজে লাগিয়েছেন। যেমন এলআইভি। সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষকতায় সে দেশের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এই গল্ফ প্রতিযোগিতা চালু করে ২০২২-এ। এ নিয়ে আমেরিকার বহু নাগরিকের অসন্তোষ ছিল; ৯/১১ হামলায় প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত প্রায় ২১ জন সন্ত্রাসীর সৌদি নাগরিক পরিচয়ের অভিযোগে। এ বছর অবশ্য সৌদি আরব পিছিয়ে এসেছে এলআইভি থেকে। কিন্তু লজ্জার মাথা খেয়ে ট্রাম্প পিজিএ-কে অনুরোধ করছেন এলআইভি-র খেলোয়াড়দের অবিলম্বে যুক্ত করে নিতে। তিনি একাধারে প্রেসিডেন্ট ও বিরাট ব্যবসায়ী: বেসবল প্রতিযোগিতা সুপার বোল, ইউএফসি লড়াই, ফ্লরিডার মোটরগাড়ি রেসিং ডেটোনা ৫০০— কী নেই তাঁর ঝুলিতে! সব কিছুকেই নিজের মতো করে জনপ্রিয়তা অর্জনের অঙ্গ করে তুলতে চান।

এ বারের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক তিনটি দেশ। আটচল্লিশটি দেশ অংশগ্রহণ করছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মোট সদস্য-সংখ্যার এক-চতুর্থাংশ দেশ প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত। সহজেই অনুমেয়, এই রাজসূয় যজ্ঞের অর্থনৈতিক অভিঘাত কত সুদূরপ্রসারী। আয়োজক হিসেবে আর্থিক, সামরিক ও প্রযুক্তিতে অনেক বেশি এগিয়ে আমেরিকা; সুপারপাওয়ার হিসাবে তারা ‘স্পোর্টসওয়াশিং’-এর সদ্ব্যবহার করবেই, অনুমান ছিল। বহু দেশের মানুষের সম্মিলনে যে দেশের এত প্রগতি, সেই দেশেরই অভিবাসন নীতিতে শুধু কড়াকড়ি নয়, অমানবিকতার চরম বাস্তবায়নে ট্রাম্প বহুনিন্দিত। স্বভাবতই তিনি চাইবেন বিশ্বকাপের মতো মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন করতে বা বিকল্প নির্মাণে।

শুরু থেকেই ফিফা বিশ্বকাপ নিয়ে নানা বিতর্ক। ৪১০০ কোটি ডলারের এই টুর্নামেন্ট থেকে আনুমানিক ১১০০ কোটি ডলার মুনাফা তোলার লক্ষ্য নির্ধারিত, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার কোটি টাকা লাভ। এই লভ্যাংশ ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দের কাছাকাছি। স্বাভাবিক ভাবেই টিকিটের মূল্য আকাশছোঁয়া। এ ছাড়াও আছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা; কঠোর অভিবাসন নীতি, জাতিবিদ্বেষের আশঙ্কা। ফিফা-র বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ট্রাম্পের বিতর্কিত রাজনৈতিক অভীপ্সা পূরণে ইন্ধন জোগানোর। ট্রাম্প এক জন যুদ্ধপ্রিয় নেতা, অথচ তিনি নিজেকে শান্তির দূত ভাবেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার দাবি করেন। গত বছর ডিসেম্বরে ফিফা-সভাপতি ফিফা-র প্রথম শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দিয়েছেন। ইতিহাস বলছে, এত নির্লজ্জ ভাবে ফিফা-কে রাজনৈতিক তাঁবেদারিতে জড়িয়ে পড়তে আগে দেখা যায়নি।

১৯৩৪-এ রোমে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। ইটালির একনায়ক মুসোলিনি চেষ্টা করেছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে রোমান জাত্যভিমান তুলে ধরতে। ফাইনালে বিজয়ী ইটালি দলকে মাঠে ফ্যাসিবাদী রীতিতে অভিনন্দন জানানো হয়, বিশ্বকাপের সঙ্গে আরও একটি প্রমাণ মাপের ট্রফি দেওয়া হয়। ১৯৩৬-এ বার্লিনে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক্স আয়োজন করে হিটলার তাঁর জাতীয়তাবাদী আস্ফালনকে সুদৃশ্য মোড়কে তুলে ধরেন, নাৎসি জার্মানির আগ্রাসন ও ইহুদি নির্যাতন আড়াল করে। সেও ছিল সেকালের ‘স্পোর্টসওয়াশিং’। আর এই সময়ে ইরানের সঙ্গে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার সংঘর্ষ চলছে, তার পরিণতি স্বরূপ তেল সরবরাহের অনিশ্চয়তায় ভুগছেন বিশ্ববাসী। কাকতালীয় ভাবে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পরেই ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কাজ শুরু হয়েছে সুইৎজ়ারল্যান্ডে, নিরাপদ হরমুজ় প্রণালীর বহুপ্রতীক্ষিত আশ্বাস-সহ।

পেলের অনুরাগী ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি কথাপ্রসঙ্গে ব্রাজ়িলের কসমস ক্লাব ও পেলের ঐতিহাসিক মেলবন্ধনের গুরুত্ব স্মরণ করেছেন। যদি বিশ্বকাপ ফাইনালের পুরস্কার বিতরণী সভায় ট্রাম্প মঞ্চ আলো করে থাকেন, তা কি খুব অবাক হওয়ার মতো কিছু? ফিফা-র নিয়মে আয়োজক দেশের প্রধান ট্রফি ধরতেই পারেন, এমনকি চিরাচরিত রীতি বিসর্জন দিয়ে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলেও দিতে পারেন। কে বলতে পারে, মেসি রোনাল্ডো এমবাপে বা এ-হেন জনপ্রিয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে ট্রফি জয়ের ছবিতে সেঁটে থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে স্ব-ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করার সুযোগ কাজে লাগাবেন না!

পদার্থবিদ্যা বিভাগ, সেন্ট জ়েভিয়ার’স কলেজ, কলকাতা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Donald Trump

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy