গরমে সারা রাজ্যে তীব্র জলকষ্ট দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে তার প্রধান সমাধান জল জীবন মিশন। সম্প্রতি কেন্দ্র এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন করেছে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এতে আশা জাগারই কথা। কিন্তু বাস্তব এই যে, এ রাজ্যে এই কর্মসূচিটি এক গভীর বৈপরীত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এক দিকে বড় অঙ্কের ব্যয়, অন্য দিকে যৎসামান্য পরিকাঠামো নির্মাণ, অসম্পূর্ণ পরিষেবা। এই প্রকল্প এখন শুধু উন্নয়নের গল্প নয়; এটি প্রশাসনিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির মধ্যে ব্যবধানেরও প্রতিচ্ছবি।
রাজ্যের বহু এলাকায় ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিক বা লোহার সমস্যা রয়ে গিয়েছে। কোথাও বাড়ির কাছের টিউবওয়েল অকেজো, বা তার জল ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় মহিলাদের দূর থেকে জল বয়ে আনতে হয়। জল জীবন মিশন (২০১৯) শুরু হয়েছিল প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে কার্যকর নলবাহী জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। এখানে ‘কার্যকর’ শব্দটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শুধু বাড়িতে একটি কল বসানো নয়, সেই কলের মাধ্যমে নিয়মিত, পর্যাপ্ত এবং নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছনো এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। প্রান্তিক, জলসঙ্কটে আক্রান্ত এলাকাগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। প্রতি দিন মাথাপিছু অন্তত ৫৫ লিটার ‘নিরাপদ’ পানীয় জল (যা ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস নির্ধারিত নিরাপত্তার শর্ত মেটাতে পারে) সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ জলের পুনর্ভরণ এবং জল-উৎসের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এ কাজে গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ রাখতে গ্রামের ‘জল ও স্বাস্থ্যবিধান সমিতি’ বা ‘পানি সমিতি’-কে পরিকল্পনা, নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে যুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে। কেন্দ্রের ম্যাক্রো ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী রাজ্যে গ্রামীণ পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১.৭৫ কোটি। কিন্তু প্রকল্প পরিকল্পনায় ধরা হয়েছে ২.২৫ কোটি পরিবার। ভবিষ্যতের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন বসতি বা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই এই বাড়তি সংখ্যা ধরা হয়েছে বলে অনুমান করা যেতে পারে।
কিন্তু এই প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বোঝার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বুঝতে হবে—‘কমিশনিং’। ‘কমিশনিং’ মানে একটি প্রকল্পকে বাস্তবে কার্যকর জনপরিষেবায় রূপান্তর করা। এর চারটি ধাপ রয়েছে। এক, সমস্ত সিভিল ও বৈদ্যুতিক কাজ সম্পূর্ণ হওয়া। দুই, প্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে জলের চাপ, প্রবাহ ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা যাচাই। তিন, অন্তত ১৫ দিন পরীক্ষামূলক ভাবে প্রকল্প চালানো (ট্রায়াল রান), যেখানে নিয়মিত জল সরবরাহ ও জলের গুণমান পরীক্ষা করা হয়। এবং শেষ ধাপ, গ্রামসভার অনুমোদন ও গ্রাম পঞ্চায়েতের হাতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হস্তান্তর। অর্থাৎ, ‘কমিশনিং’ মানে শুধু নির্মাণ শেষ হওয়া নয়; মানুষের ঘরে বাস্তবে নিয়মিত জল পৌঁছনো শুরু হওয়া।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি এই জায়গাতেই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। জল জীবন মিশনের জাতীয় ছবিটি একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং সতর্কবার্তামূলক। ২৪ মে, ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ৬ লক্ষ ৩৮ হাজার প্রকল্পের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ২ লক্ষ ১৫ হাজার কমিশনিং করা গিয়েছে। কিন্তু এখনও ২ লক্ষ ৮২ হাজার প্রকল্প অসম্পূর্ণ। তাদের অধিকাংশের নির্মাণের মূল কাজই শেষ হয়নি। আরও ৬,৮৮৬টি প্রকল্প বিদ্যুদায়নের অপেক্ষায়, ১৫,০০১টি ট্রায়াল রানের পর্যায়ে, এবং ২২,২৩৪টি প্রকল্পে সব কাজ শেষ হলেও চূড়ান্ত স্বীকৃতি মেলেনি।
তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় সাড়ে দশ হাজার সক্রিয় প্রকল্পের মধ্যে সাড়ে ন’হাজার প্রকল্পই এখনও পরিকাঠামোগত ভাবে অসম্পূর্ণ। তার মধ্যে ৯,০৯২টি প্রকল্পে সিভিল কাজ শেষ হয়নি, ১৫টি প্রকল্প বিদ্যুদায়নের অপেক্ষায় রয়েছে এবং ২৯৫টি প্রকল্প এখনও ট্রায়াল রানের পর্যায়ে রয়েছে। ৯৮২টি প্রকল্পের পরিকাঠামো নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে; আর্থিক ভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে ৩৬৯টি প্রকল্প। এর মধ্যে আবার সিভিল, বৈদ্যুতিক ও ট্রায়াল রান সম্পূর্ণ করে চূড়ান্ত স্বীকৃতির অপেক্ষায় রয়েছে মাত্র ১১৬টি প্রকল্প। অর্থাৎ, বহু ক্ষেত্রে বাড়িতে পাইপ সংযোগ পৌঁছলেও নিয়মিত জল পৌঁছচ্ছে না। মাত্র ৩৭৫টি প্রকল্প (৩.৬ শতাংশ) কমিশনিং হয়েছে— অর্থাৎ গ্রামের মানুষের হাতে তুলে দেওয়া গিয়েছে। অথচ, খরচ খুব কম হয়নি— ২০১৯ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে জল জীবন মিশনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজ্যের ব্যয়ই বেশি— ১৫ হাজার কোটি টাকা।
তুলনায় বিহারে মোট ৩০৪টি প্রকল্পের মধ্যে ৩০০টি কমিশনিং হয়েছে— প্রায় ৯৮.৭ শতাংশ। গোয়ায় কমিশনিং-এর হার ৯৫ শতাংশের বেশি। পঞ্জাবে ৯১ শতাংশের বেশি প্রকল্প কমিশনিং হয়েছে, হরিয়ানায় প্রায় ৭৭ শতাংশ। মিজ়োরামও ৮০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। মানতেই হবে, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা উদ্বেগজনক। সমস্যা অর্থের না প্রকল্প ব্যবস্থাপনার, আন্তর্বিভাগীয় সমন্বয়ের না বিদ্যুৎ সংযোগের, ঠিকাদারি কাঠামোর না স্থানীয় প্রশাসনিক সক্ষমতার, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার। না হলে বাড়তি টাকা ঢেলেও লাভ হবে না।
জল জীবন মিশন তৈরি করতে পারে গ্রামের মানুষের কর্মসংস্থানও। মিশনের অধীনে ‘নল-জল মিত্র’ কর্মসূচির লক্ষ্য হল গ্রামভিত্তিক দক্ষ কর্মী-বাহিনী তৈরি করা। পশ্চিমবঙ্গের তিন হাজারেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তত ৩০ হাজার কাজ তৈরি হতে পারে— পাম্প অপারেটর, কলের মিস্ত্রি, পাইপলাইন মেরামত-কর্মী, জলমান পরীক্ষক, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণ-কর্মী, ডিজিটাল রিপোর্টিং সহায়ক ও গ্রামভিত্তিক পরিষেবা সমন্বয়কারী। এ ছাড়া থাকবেন প্রশিক্ষক, ব্লক স্তরের প্রযুক্তিগত সহায়ক, পর্যবেক্ষক (মনিটরিং) কর্মী। এই কর্মসূচি স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেয়, তাই এটি মেয়েদের কাজ তৈরি করতে পারে। কার্যসূচি বলছে, জলের জন্য গ্রামবাসীদের থেকে সামান্য কিছু মূল্য নিয়মিত নেওয়া হবে, তা থেকেই এই কর্মীদের টাকা দেওয়া হবে। জলকর একটি সংবেদনশীল বিষয়, অথচ জল জীবন মিশনের সাফল্য নির্ভর করছে এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপরে।
তামিলনাড়ু, কেরল, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশেও জল জীবন মিশনের বাস্তবায়ন খুব দ্রুত এগোয়নি। কোনও রাজ্যই এর জন্য একক কোনও নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করেনি। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, সরকারি বক্তব্য, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত পর্যালোচনাগুলি একত্রে পড়লে বোঝা যায়, সমস্যাটি বহুস্তরীয়। কোথাও কেন্দ্রীয় অর্থ-ছাড়ে বিলম্ব, কোথাও স্থানীয় স্তরে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, কোথাও জটিল ভৌগোলিক পরিস্থিতি, আবার কোথাও আর্সেনিক, লবণাক্ততা বা স্থায়ী জলের উৎসের অভাব— সব মিলিয়েই প্রকল্পের অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইপলাইন তৈরি হলেও নিয়মিত জল পৌঁছচ্ছে না; আবার কোথাও নিরাপদ জলের উৎস গড়ে তোলাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যে সব এলাকায় পাইপে জল সরবরাহ হচ্ছে, সেখানেও বণ্টনে বৈষম্য, জলের অপচয় নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা অর্থাভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বরং আর্থিক, প্রযুক্তিগত, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক নানা সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবই ‘সব ঘরে জল’-এর লক্ষ্য পূরণের পথকে দীর্ঘতর করে তুলছে। এই কারণেই হয়তো এখন কেবল নতুন প্রকল্প ঘোষণা বা ব্যয় বাড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে এমন এক বিকেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তগ্রহণ ব্যবস্থা, যা প্রতিটি অঞ্চলের বাস্তব সমস্যাকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করে তার উপযোগী সমাধান তৈরি করতে পারে।
ভূতপূর্ব আইএএস
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)