E-Paper

গ্রিনল্যান্ডের উভয়সঙ্কট

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, তিনি ফের ‘মনরো নীতি’ ফিরিয়ে এনেছেন, খানিকটা ঠাট্টার সুরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা যার নাম দিয়েছেন ‘ডনরো নীতি’।

প্রণয় শর্মা

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৩

আমেরিকা আর ডেনমার্কের মধ্যে দড়ি টানাটানি শুরু হয়েছে গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে। তাতে দোটানায় পড়েছে গ্রিনল্যান্ড। বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি বর্তমানে ডেনমার্কের অধীনে একটি স্বশাসিত অঞ্চল, কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, গত দু’দশকে সেই ঝোঁক আরও তীব্র হয়েছে। এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী মনোভাবের মুখে দাঁড়িয়ে গ্রিনল্যান্ডকে চিন্তা করতে হচ্ছে, স্বাধীনতা তো চাই, কিন্তু এখনই চাই কি? আমেরিকার মতো এক বৃহৎ শক্তির সঙ্গে মাত্র ৫৬ হাজার মানুষের একটি দেশ কি মোকাবিলায় নামতে পারবে? না কি ডেনমার্কের মতো একটি ইউরোপীয় দেশের অংশ থেকেই এই অসম যুদ্ধ লড়া দরকার?

ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, তিনি ফের ‘মনরো নীতি’ ফিরিয়ে এনেছেন, খানিকটা ঠাট্টার সুরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা যার নাম দিয়েছেন ‘ডনরো নীতি’। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষিত এই নীতি বলেছে, পশ্চিম গোলার্ধের কোনও দেশকে যদি ইউরোপের কোনও দেশ নিয়ন্ত্রণ বা পীড়ন করে, তবে তা আমেরিকার বিরুদ্ধে আগ্রাসন বলে গণ্য করবে আমেরিকা। ‘ডনরো’ নীতি পশ্চিমের দেশগুলির তালিকায় যোগ করেছে বেশ কিছু দ্বীপ, যেগুলির ভৌগোলিক অবস্থান আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে অন্যতম গ্রিনল্যান্ড।

ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করার ইচ্ছা প্রকাশের ফলে সারা বিশ্বের মনোযোগ এসে পড়ছে বরফ-ঢাকা এই দ্বীপটির উপর। নজরে এসেছে স্বাধীনতার জন্য তার চেষ্টাও। স্বাধীন গ্রিনল্যান্ডকে অনায়াসে ট্রাম্প ‘আমেরিকার সম্পত্তি’ বলে আত্মসাৎ করতে পারবেন, সেই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলি স্বভাবতই তা চায় না। ট্রাম্পের যুক্তি, তিনি চান না গ্রিনল্যান্ডের দখল নিক চিন বা রাশিয়া। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড আর ডেনমার্ক যদি গলা মিলিয়ে একযোগে আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে, এবং গ্রিনল্যান্ড যদি ডেনমার্কের ভিতরে স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকতে সম্মত হয়, তা হলে তাকে অধিগ্রহণ করা ট্রাম্পের পক্ষে কঠিন হবে। ডেনমার্ক ‘নেটো’-র সদস্য— এই রাজনৈতিক ও সামরিক জোট প্রতিটি সদস্য দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে মুশকিল হল, এই ঝড় বয়ে যাওয়ার পরে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবি দেশের ভিতরে শক্তি হারাবে, বাইরে থেকে সমর্থন পাওয়াও কঠিন হবে।

গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার অংশ, নাকি ইউরোপের? ট্রাম্পের দাবি, তা হল উত্তর আমেরিকার একটি অংশ, পশ্চিম গোলার্ধের উত্তরভাগের প্রান্তে। তাই এটা আমেরিকারই, এবং আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থের কেন্দ্রে তার স্থান। ‘কোনও না কোনও ভাবে’ গ্রিনল্যান্ড অধিকার করবেন, হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ডেনমার্ক অবশ্য গ্রিনল্যান্ড ‘বিক্রি’ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। গ্রিনল্যান্ডও জানিয়ে দিয়েছে, তারা আমেরিকার অংশ হতে চায় না।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ড কি ডেনমার্কের অংশ হয়ে থাকতে চায়? তার ৮৮ শতাংশ হলেন ইনুইট জনগোষ্ঠীর মানুষ। ‌অতীতে এঁদের ‘এস্কিমো’ বলা হত, কিন্তু সে কথাটিকে আজ ঔপনিবেশিক যুগের অসম্মানজনক শব্দ বলে প্রত্যাখ্যান করেন গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দারা। গ্রিনল্যান্ডে ঔপনিবেশিক শাসনের গোড়াপত্তন হয় ১৭২১ সালে, যখন হান্স ইগেডি নামে নরওয়ের এক যাজক সেখানে আসেন, এবং ইনুইটদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দিতে শুরু করেন। তাঁর পিছনে ডেনমার্ক-নরওয়ের রাজশক্তির সমর্থন ছিল। কয়েক প্রজন্ম ধর্মান্তরণের পর গ্রিনল্যান্ড রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভাবে ডেনমার্ক-নরওয়ের উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৮১৪ সালে নেপোলিয়ন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে ডেনমার্ক এবং নরওয়ের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডরিক (যিনি নেপোলিয়নের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন) বাধ্য হন একটি চুক্তিতে সই করতে, যেখানে তিনি নরওয়ে লিখে দেন সুইডেনকে। নরওয়ের নাগরিকরা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। অন্য দিকে, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফেয়ারো প্রভৃতি দ্বীপ, যেগুলি ছিল নরওয়ের অংশ, সেগুলি রেখে দেয় ডেনমার্ক।

২০০৯ সালে গ্রিনল্যান্ড অনেকটাই স্বাতন্ত্র্য পায়— বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনীতির কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই স্বায়ত্তশাসন পেয়েছে। জনমত সমীক্ষা (রেফারেন্ডাম) করে ফলাফল দেখে স্বাধীনতা ঘোষণার অধিকারও অর্জন করে নিয়েছে গ্রিনল্যান্ড। সেখানকার সব রাজনৈতিক দলই স্বাধীনতা পাওয়ার বিষয়ে একমত, তবে কখন তা ঘোষণা করা উচিত সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ২০২৫ সালে একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে ৮৪ শতাংশ নাগরিক স্বাধীনতা চাইছেন, যা ২০১৯ সালের (৬৭ শতাংশ) থেকে অনেকটাই বেশি। ডেনমার্ক যদিও বছরে ৬০ কোটি আমেরিকান ডলার খরচ করে গ্রিনল্যান্ডের উন্নয়নের জন্য, এবং সেখানকার বাসিন্দারা সামাজিক সুরক্ষার সমান সুবিধা পান, তবু ডেনমার্কের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ করেন ইনুইটরা। অভিযোগ, ডেনমার্ক নাকি অতীতে গ্রিনল্যান্ডের মেয়েদের জরায়ুতে জন্মনিরোধক ভরে দেওয়ার নীতি নিয়েছিল, যাতে ইনুইট জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ডেনমার্ক আর গ্রিনল্যান্ডের এত বিবাদের মধ্যে এসে পড়ে ট্রাম্প ফের মেলালেন তাদের। ইউরোপ যখন ট্রাম্পের আগ্রাসন রোখার শান্তিপূর্ণ উপায় খুঁজছে, তখন গ্রিনল্যান্ডের সামনে অন্য একটি প্রশ্ন: সে কি পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তির সঙ্গে থাকবে, না কি অংশ হবে এক নতুন উপনিবেশের?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america Denmark

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy