E-Paper

তাঁতে বসছেন মেয়েরাই

পাঁচ বছর আগেও যে শাড়ি বুনে চারশো টাকা পাওয়া যেত, এখন তার জন্য তাঁতি পান দেড়শো-দু’শো টাকা। তার থেকেও মহাজন ২৫-৩০ টাকা কেটে রেখে দেয়, পুজোয় সে টাকা বোনাস বাবদ দেয়।

মৌমিতা চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫০

শান্তিপুর বা ফুলিয়া বললেই মনে পড়ে, তাঁতের শাড়ি। শান্তিপুরের সুতির শাড়ি ‘শান্তিপুরি শাড়ি’ বলে পরিচিত, আর ফুলিয়া পরিচিত তার টাঙ্গাইল জামদানির জন্য। আক্ষেপ, সেই খ্যাতি আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ। যার অন্যতম কারণ পাওয়ারলুম বা যন্ত্রচালিত তাঁত। ২০০৮-১০ সাল নাগাদ প্রথম শান্তিপুর এবং ফুলিয়াতে পাওয়ারলুম-এর আগমন হয়। অনেক তাঁতি বেশি রোজগারের আশায় সেই সময় হস্তচালিত তাঁত বিক্রি করে দিয়ে যন্ত্রচালিত তাঁত বসান। অল্প সময়ে বেশি উৎপাদন হলেও, পাওয়ারলুমে তৈরি কাপড় থেকে তাঁতির লাভ দিন দিন কমতে শুরু করে। অন্য দিকে হস্তচালিত তাঁতে শ্রম বেশি দিতে হয় বলে কাপড়ের দামও হয় বেশি, তার ফলে চাহিদা পড়তে থাকে। হস্তচালিত তাঁতশিল্পীদেরও বাজার খারাপ হতে শুরু করে। রোজগার কমতে শুরু করায় বহু পুরুষ তাঁত ছেড়ে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দেন অন্য রাজ্যে। ঘরে পড়ে-থাকা হস্তচালিত তাঁতযন্ত্রে বসতে শুরু করেন মেয়েরা।

এর ফলে তাঁতের দুনিয়াটা বদলে গিয়েছে। ‘হ্যান্ডলুম সেন্সাস ২০১৯-২০’ অনুসারে পশ্চিমবঙ্গে তাঁতিদের মধ্যে পুরুষ-মহিলা অনুপাত এই রকম— মহিলা ৭২ শতাংশ, পুরুষরা ২৮ শতাংশ। ফুলিয়ার মহিলা তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, পনেরো বছর আগেও ছবিটা ঠিক এর উল্টো ছিল— দশ জনে আট জন তাঁতিই ছিলেন পুরুষ। তবে তাঁতের জগতে বরাবরই রয়েছেন অসংখ্য মহিলা সহায়ক কর্মী। তাঁরা সুতো পাকানো, সুতো মাড় দেওয়া, রং করা, শুকোনো থেকে শুরু করে বোনা শাড়ি মাড়-ইস্ত্রি করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করার যাবতীয় কাজগুলি করেন, এখনও করছেন। এঁরা কেউ বিনা মজুরিতে পরিবারের কাজে শ্রম দেন, কেউ বা সামান্য মজুরিতে অন্যের জন্য কাজ করেন। তাঁদের শ্রমের কোনও নির্ধারিত হারে মজুরি নেই। কোভিডের পর থেকে সর্বস্তরে মজুরি কমে গিয়েছে, এখানেও তাই। পাঁচ বছর আগেও যে শাড়ি বুনে চারশো টাকা পাওয়া যেত, এখন তার জন্য তাঁতি পান দেড়শো-দু’শো টাকা। তার থেকেও মহাজন ২৫-৩০ টাকা কেটে রেখে দেয়, পুজোয় সে টাকা বোনাস বাবদ দেয়। যে মেয়েরা খাতায় হিসাব রাখেন, তাঁরা দেখেন, পাওনার চেয়ে কমই মিলছে বোনাস।

অনেক দক্ষ মহিলা তাঁতি তৈরি হয়েছেন, কিন্তু তাঁরাও গৃহস্থালির কাজ করে তার পর তাঁত টানতে বসার সুযোগ পান। আরও দেখা যাচ্ছে, তাঁত সমবায়গুলিতে মহিলা সদস্য প্রায় নেই। সরকারি সংগঠনগুলি সরাসরি তাঁতিদের থেকে অনেক শাড়ি কেনে সাধারণত কিছু বড় ব্যবসায়ীর মাধ্যমে। সাধারণ তাঁতি মেয়েদের হাতে-বোনা শাড়ি সেখানে স্থান পায় না। সরকারি মেলাগুলিতেও তাঁতি মেয়েদের গোষ্ঠীগুলি স্থান পায় কালেভদ্রে, অনেক দিন পরে কখনও এক বার। ফলে মহাজনের মুখাপেক্ষী থাকা ছাড়া এই মেয়েদের উপায় নেই।

ভারতের ঐতিহ্যশালী তাঁতশিল্পকে যদি ধরে রাখতে হয়, তা হলে বিশেষ ভাবে মহিলা তাঁতিদের সক্ষমতা তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে, কারণ শান্তিপুর, ফুলিয়াতে মেয়েরাই তাঁতের কাজের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রোজগার নিরাপত্তা, বিপণনে সহায়তা করেন। তাঁদের সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন, দরকার স্বাস্থ্য সহায়তাও। একটি অসরকারি সংস্থার সমীক্ষায় (২০২০) দেখা গিয়েছে, গত আট-দশ বছর ধরে এই পেশায় থাকা শ্রমিকদের দশ জনে সাত জন ভুগছেন ঘাড়, কাঁধ, কোমর, হাঁটু, কনুই, কব্জি, পিঠের পেশির ব্যথা এবং মাথাব্যথায়। প্রায় ৭৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং ৪১ শতাংশ আঘাতের কথা জানিয়েছেন। এ সবই অনেক দিন ধরে পুনরাবৃত্তিমূলক, পরিশ্রমসাধ্য কাজ করার ফল। দীর্ঘ সময় সামনে ঝুঁকে বসে থাকা, অল্প আলোয় কাজ করা, এ সবের জন্য এই সমস্যাগুলি হচ্ছে। হজমের সমস্যা এবং নিঃশ্বাসের সমস্যাও দেখা যাচ্ছে মাঝারি মাত্রায়। এ ছাড়াও তাঁতি মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, পাওয়ারলুমের তীব্র আওয়াজের জন্য অনেকে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছেন।

এ ছাড়া মানসিক চাপ, ক্লান্তি আছেই। মেয়েরা সহজে এগুলিকে ‘অসুখ’ বলে মানতে চান না। কিন্তু সামাজিক নানা কারণ থেকে মনের স্বাস্থ্যহানি হয়, এবং তা মেয়ে তাঁতিদের একটা বড় অংশকে বিপন্ন করে। তনিমা বসাক যেমন জানালেন, তাঁর স্বামী এখন মুম্বইয়ে সোনার দোকানে কাজ করেন, তাঁত চালিয়ে সামান্যই রোজগার করেন তনিমা। তাঁর দুই মেয়ে: এক জন কলেজে, অন্য জন অষ্টম শ্রেণিতে। পড়শিরা কেবলই বলে, “মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দাও।” দাঁতে দাঁত চেপে মেয়েদের পড়াচ্ছেন তনিমা।

তাঁত শিল্পীদের জন্য নেই পেনশন, স্বাস্থ্য বিমা। বছরের মধ্যে ছ’মাস কাজ থাকে না। স্কুল থেকে শাড়ি ইউনিফর্ম উঠে যাওয়ার পর থেকে সাধারণ মানের তাঁতের শাড়ির চাহিদা কমে গিয়েছে। সরকারি স্কুল ইউনিফর্মের অর্ডার পাচ্ছে পাওয়ারলুম। নিয়মিত বরাতের অভাবে হস্তচালিত তাঁত শ্রমিকদের জীবন ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁত শ্রমিক বা সহায়ক শ্রমিকের পরিচয়পত্র থাকলেও, তাতে কোনও সুবিধা মেলে না। মাঝে মাঝে নিম্নমানের কাঠের হস্তচালিত তাঁত বিতরণ করা হয় তাঁতিদের মধ্যে। বাস্তবে সেগুলো ব্যবহারের অযোগ্য।

তাই পরবর্তী প্রজন্ম তাঁতে আর বসছে না, শিখছে না। ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিপুর ও ফুলিয়া মিলিয়ে ৩২ হাজার হস্তচালিত তাঁত রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এখন এই সংখ্যাটা অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা হয়, এই শিল্পের অস্তিত্ববিলোপ হতে বুঝি বেশি দেরি নেই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sharee Workers Handloom Saree

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy