E-Paper

একটি শাড়ির যাত্রাপথ

বিষ্ণুপুরকে বলা যেতে পারে বালুচরি শাড়ির ধাত্রী-মা। বালুচরির জন্ম কিন্তু ‘বালুচর’ নামে এক জনপদের মাটিতে, প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে।

শৈবাল বসু

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪২

গাঢ় নীল মালবেরি সিল্কের জমির বুকে রামায়ণের কাহিনির নকশা বুনতে বুনতে বিষ্ণুপুরের প্রবীণ বয়নশিল্পী শ্রীমন্ত দাস বললেন, “রামায়ণ মহাভারত, রাধাকৃষ্ণ-গোপীদের লীলা বুনে চলছি অনেক দিন।” কিন্তু হুঁকো হাতে বাবু-বিবি, আলবোলার নল, রেলগাড়িতে মেম-সাহেব, এ সব নকশা আজকাল বালুচরি শাড়িতে দেখছি না কেন? ক্ষণেক চুপ থেকে বলেন, “ছোটবেলায় দেখেছি। শেষ সে-সব নকশা বুনতেন লক্ষ্মণকাকা (বিষ্ণুপুর কৃষ্ণগঞ্জের গুরুদাস লক্ষ্মণ)।”

বিষ্ণুপুরকে বলা যেতে পারে বালুচরি শাড়ির ধাত্রী-মা। বালুচরির জন্ম কিন্তু ‘বালুচর’ নামে এক জনপদের মাটিতে, প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে। বাংলায় ওলন্দাজ কারখানার পরিচালক লুই তাইলেফার্ত ১৭৫৫-য় বাংলার বয়নশিল্পের যে তালিকা দিয়েছেন, তাতে বালুচর নামের জনপদে তৈরি নকশাকার সিল্কের উল্লেখ পাই। আজকের বহরমপুর ও জিয়াগঞ্জের মাঝামাঝি ভাগীরথী তীরের বালুচর নামের এক জনপদ আর তাকে ছুঁয়ে-থাকা বাহাদুরপুর রামডহর বালিগ্রাম নামের এক বয়নমুখর গ্রামাঞ্চল পরিচিত হয় ‘বালুচর’ নামে, এমনই আন্দাজ ইতিহাসসন্ধানী নানা গবেষকদের।

১৭০৪ সালে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে বাংলার রাজধানী সরিয়ে আনেন মুর্শিদাবাদে, নতুন রাজধানীকে ঘিরে বদল ঘটতে থাকে এ-পার বাংলার অর্থনীতি সংস্কৃতি ভাষা সাহিত্য সঙ্গীত স্থাপত্য বসন বয়নের, সমাজমনেরও। বাংলার রাজধানী হয়ে ওঠার আগে থেকেই মুর্শিদাবাদ ছিল কোমল রেশম উৎপাদনে নজরকাড়া নগর, গুজরাতি মারোয়াড়ি জৈন ইংরেজ আর্মানি ইরানি আরবি ওলন্দাজ আবিসিনীয় ফরাসি বণিকদের যাতায়াত ও বসবাসের জনপদ। বাণিজ্য, রাজপদে নিয়োগ, জমিদারি-মনসবদারির বনিয়াদ দৃঢ় রাখার অভিলাষ উচ্চবর্গের বাঙালির সংস্কৃতিতে আনল নবাবি ও বিলিতি চালের সাজ, এলেন পেশোয়াজ পাজামা অঙ্গরাখা-পরা বাবু-বিবিরা। বাঙালি হিন্দুর সাজপোশাকে জাঁকিয়ে এল মুসলিম দর্জির হাতের ছাঁটকাট, নকশা। ভাগীরথী তীরে বালুচরের নতুন শৈলীর রেশমি শাড়ি বুটিদার বালুচরির শরীরে এল আরবি ফুলেল কারুকাজ। এল কাশ্মীরি শালের ‘কুনিয়া কৈরী’ বা আঁচলের পাশের দুই কোণের কল্কা, মাঝের এক বা তিন-চারটি বড় নকশাদার কল্কা, পরে যা মিশে যাবে বাঙালি হিন্দু কনের কপাল-কপোলে কুমকুম-চন্দনে, কৈরী বা আমবুটি কল্কা মিশবে বাঙালির আলপনায়, প্রতিমার শোলার সাজে, তারও পরে ফুলিয়ার টাঙ্গাইল শাড়ির পাড়ে।

এই মিশেলের রসায়ন এতই গহিন যে বাংলায় ‘কল্কা’ শব্দের উৎস আরবি ‘কলগি/কলগা’ না সংস্কৃত ‘কলিকা’, এই নিয়ে ধন্দ। তিনশো বছরেরও আগে এই প্রথম মানুষের অবয়ব বিষয় হল বাংলার শাড়ির, বুটিদার বালুচরির পাড়ে আঁচলে বোনা হল আলবোলার নল বা হুঁকা হাতে নারী-পুরুষের শরীর— তাঁদের পরনে পাজামা শাড়ি পেশোয়াজ; বোনা হল জুতো-পরা ঘোড়সওয়ার, পাশে পশুশিকারি। এই মহার্ঘ সিল্ক শাড়ির খদ্দের হলেন বাংলার জমিদার-বাবুরা, কলকাতার শৌখিন রাজা ও নব্য বাবুসমাজ, বাংলার বাইরের রাজা, নবাব, ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের লোক। মসৃণ সিল্ক বা কোনও মানুষের মূর্তি পরিধানে রাখার ধর্মীয় নিষেধ ডিঙিয়ে মুসলিম বাঙালি পরিবারে এল পাড়ে-আঁচলে নারী-পুরুষের প্রতিকৃতি-সম্বলিত বালুচরি শাড়ি; হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে উচ্চবর্গের রাজপুরুষ জমিদার বণিকসমাজ পরিবারের বাইরেও উপহার বা নজরানা হিসেবে বেছে নিতে লাগলেন বালুচরিকে।

হাজারদুয়ারি প্রাসাদের জাদুঘরের মহাফেজখানায় আছে আফরাজউন্নিসা বেগমের বিয়ের জন্য ছয়টি বুটিদার বালুচরি কেনার ফারসিতে লেখা নথি। গবেষক ইভা মারিয়া রাকব জানাচ্ছেন, ১৮৫৫-য় প্যারিসের প্রদর্শনী থেকে লন্ডনের সাউথ কেনসিংটন জাদুঘরে পৌঁছে যাচ্ছে বালুচরের বালুচরি। আবার মহর্ষি-গৃহিণী সারদাদেবীর প্রসঙ্গে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘরোয়া-তে লিখছেন, “বালুচরি শাড়ি পরে সাদা চুলে লাল সিঁদুর টকটক করছে— কর্তাদিদিমা বসে আছেন তক্তপোশে।”

বালুচরির সে যুগে বয়নশিল্পীরা ছিলেন সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ, বেশির ভাগই কৈবর্ত মাল বাগদি চাঁড়াল মুসলিম যুগী ও নতুন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের। হাতে-টানা তাঁতে এঁদের মধ্যে যাঁরা নকশা অনুযায়ী সুতো বাঁধতেন, তাঁদের বলা হত নকশাবন্দ। মুর্শিদাবাদের বালুচরির শেষ নামজাদা বয়নশিল্পী দুবরাজ দাস ছিলেন চর্মকার পরিবারের সন্তান, শাড়িশিল্পে তাঁর গুরু এক মুসলিম নকশাবন্দ। এই নকশাবন্দরা বুটিদার বালুচরি শাড়ির পাশাপাশি তাঁতে নানা রঙের সুতো বাঁধতেন হরিনাম-সম্বলিত নকশাপেড়ে সিল্কের মহার্ঘ নামাবলি-শালের জন্য। তখন বাংলায় চৈতন্যদেবের ভক্তি ও সাম্যভাবনার আলো পড়ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে অন্ত্যজ হিন্দু ও মুসলিম সংসারেও। বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন ও পদাবলি সাহিত্যের সঙ্গে লগ্ন হচ্ছেন বহু বাঙালি মুসলমান। ক্ষিতিমোহন সেন ভারতেতিহাসে হিন্দু-মুসলমানের যুক্তসাধনার দীর্ঘ ও ব্যাপ্ত ধারার কথা লিখেছেন, সেই সাধনার অন্যতম ফসল হয়ে উঠছে মুর্শিদাবাদের বালুচরি শাড়ি।

দিল্লিতে আকবরের সময়কালে বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ বীর হাম্বীর শ্রীনিবাস আচার্যকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করায় বিষ্ণুপুরে বৈষ্ণব সংস্কৃতির বাতাস আসে। মোগল বাদশাদের সঙ্গে মল্লরাজাদের সংযোগ ও আদানপ্রদান, তারও অনেক আগে থেকে বাংলার লোকসমাজে সুফি, মুর্শেদ ও পরে কর্তাভজা ও সহজিয়া সাধকদের প্রভাবে শিল্পী-কারিগরদের মানসে হিন্দু-মুসলিম মিলিত শিল্পসাধনার আলো জ্বলে উঠেছিল। এই আলো বাংলার সংস্কৃতির নিজস্ব আলো। তাই বিষ্ণুপুরের মন্দিরের গড়নে বাংলার চালার সঙ্গে ইসলামি গম্বুজ খিলান মিশে যেতে দেখি, আরবি নকশার পাশে দেখি বাংলার ব্রতের পুষ্পলতা, বাঁশি আর বীণার পাশে পারসিক সুরমণ্ডল, দেখি শাড়ি, ঘাগরা, পেশোয়াজ-পরা নারীমূর্তি। রামায়ণ মহাভারত ভাগবতের চরিত্রের পাশাপাশি দেখি গাউন-পরা মেম, গোরা সৈন্য।

মুর্শিদাবাদের বালুচর আনুমানিক ১৯০৩ সালে ভাগীরথীর বন্যায় তলিয়ে গেলে সেখান থেকে এক দল তাঁতশিল্পী বিষ্ণুপুরে চলে আসেন। বিষ্ণুপুরেও ছিল প্রাচীন তন্তুবায় সমাজ। বুটিদার বালুচরির ইন্দো-ইসলামিক নকশা আর মানুষের মূর্তি বুনে দেওয়ার যে অভিনব নকশা বালুচরের শিল্পীরা নিয়ে এলেন, বিষ্ণুপুরে তার সঙ্গে মিশল মন্দিরশরীর থেকে পাওয়া রামায়ণ মহাভারত ভাগবত পুরাণের চরিত্র ও অবয়ব। তাদের ভঙ্গি আর স্থানক-এ প্রাচীন নাট্যশাস্ত্র ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব কলাবিদ্যার যে চাল, সেটি তাঁরা নতুন মোটিফ ও শৈলী হিসেবে গ্রহণ করলেন বালুচরির বয়নে। মল্ল রাজাদের বৈষ্ণব ভাবের আশ্রয় বিষ্ণুপুরের ধ্রুপদী সঙ্গীতের চলনে এনেছিল মনোহরশাহি কীর্তনের চাল, আরও পরে সেই মার্গসঙ্গীতে এসে মিলল মিঞা তানসেনের বংশধরের কণ্ঠ বেয়ে সেনিয়া ঘরানার ভঙ্গি। বিষ্ণুপুরের বালুচরির শরীরেও এল এই মিলিত সাধনার উদ্ভাস, পাড়ে-আঁচলে সীতার বনবাসের নকশায় সীতার পরিধেয় শাড়ির কুচি-পরা পার্সি ভঙ্গিটি এল জোড়বাংলা মন্দিরের গায়ে সীতামূর্তির আদলে। তার প্রান্তরেখায় বোনা হল মদনমোহন মন্দিরের খিলানের গায়ের সূক্ষ্ম ফুলকারি কাজ।

বিষ্ণুপুরের তাঁতশিল্পী অক্ষয় কুমার দাসকে দিয়ে পঞ্চাশের দশকে সুভো ঠাকুর পুরনো বালুচরি ফিরিয়ে আনার যে উদ্যোগ করেছিলেন, তাতে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিশ্রণের এই চিহ্ন অক্ষুণ্ণ ছিল। তারও প্রায় পঁচিশ বছর পর, মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকের আলোআঁধারি ফুটে উঠল বিষ্ণুপুরের বালুচরির নতুন মিনাকারির কাজে, যার উৎস মোগল-রাজপুত শৈলী। কিন্তু এই সময়ে বিষ্ণুপুরি বালুচরির নকশায় হিন্দু আখ্যানের আধিপত্য চোখে পড়ছে বেশি। বাজারে রামায়ণের কাহিনি বোনা স্বর্ণচরি শাড়ির জোগান বেশি, চাহিদাও। বাংলার সাবেক বালুচরিতে জরির সুতো ব্যবহার হত না, চকচকে জরির বদলে নানা রঙের রেশমি সুতোয় বোনা বালুচরিতে বাংলার শিল্পের নরম অথচ বর্ণময় সুরটি ধরা থাকত। বিষ্ণুপুরের তাঁতিপাড়ায় ঘুরে চকচকে জরির কারুকাজে ভরা রামায়ণ-মহাভারতের আখ্যানের আড়ালে কোথাও পাওয়া গেল না আলবোলার নল, রেলকামরায় বাবু-বিবি, হুঁকো খাওয়া রাজপুরুষ, গোরা সৈন্যের নকশা। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিপণিতে একটি-দু’টি বালুচরিতে পেশোয়াজ-পরা নবাবি চালের মানুষী অবয়ব চোখে পড়ল আঁচলের অংশে। বিষ্ণুপুরের মন্দিরগাত্রের নারীর ঘাগরা-চোলির লম্বা ধরনের মোগল রাজপুত ছাঁট অন্য চলতি আদল নিয়েছে।

সংশয় হয়, বাংলার শিল্পের অবচেতনে নব্যহিন্দুত্বের অনুপ্রবেশ ঘটছে কি না। রাষ্ট্রীয় হিন্দুত্ববাদ মুসলমানকে শুধু আক্রমণকারী ও অত্যাচারী শাসক হিসেবে দেখাতে চাইছে। সেই দেখায় ও দেখানোয় আবহমান ভারতে হিন্দু-মুসলিমের শান্ত গভীর যুক্তসাধনার কোনও স্থান নেই। ক্ষিতিমোহন সেনের ভারতীয় মধ্যযুগে সাধনার ধারা বইটির ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “একথা মানতে হবে রাষ্ট্রিক সাধনা ভারতের সাধনা নয়।... ভারতের একটি স্বকীয় সাধনা আছে, সেইটি তার অন্তরের জিনিস।... এর উৎস জনসাধারণের অন্তরতম হৃদয়ের মধ্যে।” বালুচরি শাড়ির ইতিহাস বাংলার সাধারণ কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের আন্তরিক ও অসাম্প্রদায়িক সাধনার ইতিহাস, যেন ভুলে না যাই।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sharee History

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy