E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: ক্ষমতার নেশা

আজকে তথাকথিত নিয়ো-লিবারালিজ়ম’এর যুগে জনসেবা কিংবা যুক্তি-তর্ক নয়, তাৎক্ষণিক লাভ এবং সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে জনগণকে নানা ভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করে ভোটে বাজিমাত করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির প্রধান ধারা।

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৮

‘আলো-বিলোপ’ (২৮-১২) সম্পাদকীয়তে আমাদের দেশ তথা সারা বিশ্বে হিংসা বৃদ্ধির পরিস্থিতি এবং মানবিকতার আলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের প্রতি মানুষের সহানুভূতি, সহমর্মিতা, অপরিচিত হলেও মানুষের অসহায় মৃত্যুতে শোকার্ত বোধ করার মতো মানুষের সংখ্যা কমছে। বাস্তবে, স্বাভাবিক সুস্থ বুদ্ধির মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ এখনও। এই ক্রমবর্ধমান অসংবেদনশীলতাকে মন থেকে মেনে না নিলেও তাঁরা ক্রমশ নীরব, নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। অপর দিকে জনসংখ্যার তুলনায় এখনও মুষ্টিমেয় হলেও হিংসা, নিষ্ঠুরতা, বিনা প্ররোচনায় হত্যা করার মতো মানবতাবিরোধী মনোভাবসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বিপজ্জনক ভাবে বাড়ছে। পরিতাপের বিষয় হল, ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে এই মনোভাবকে উস্কানি দেওয়ার ঘৃণ্য কাজ করছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা— ক্ষমতা ধরে রাখতে, অথবা ক্ষমতা দখলের উগ্র বাসনায়।

আজকে তথাকথিত নিয়ো-লিবারালিজ়ম’এর যুগে জনসেবা কিংবা যুক্তি-তর্ক নয়, তাৎক্ষণিক লাভ এবং সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে জনগণকে নানা ভাবে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করে ভোটে বাজিমাত করাই হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির প্রধান ধারা। কারণ এই অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বাজার সঙ্কট, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো জনজীবনের মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এই রাজনীতিতে যিনি যত বেশি মূল সমস্যাগুলি থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে পারেন, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে লোক ঠকাতে পারেন, ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করিয়ে রাখতে পারেন, কিংবা মানুষকে বিভাজিত করতে পারেন, তিনি তত সফল। এই রাজনীতি হত্যা, ধর্ষণের মতো অপরাধকে আগ্রাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। খুনি কিংবা ধর্ষকদের প্রশ্রয় দেয়। কারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখতে এদের কার্যকারিতা অপরিসীম। এর সঙ্গে ধর্ম, জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও হিংসা জাগিয়ে তুলতে পারলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ঠাটবাট বজায় রেখে, তাকে ব্যবহার করেই ভোট-বৈতরণি পার হওয়া যায়। জনমত হয়ে যায় শক্তিহীন, অক্ষম। দুর্নীতিগ্রস্ত গণহত্যাকারীরা হয়ে যায় দেশপ্রেমের প্রতীক। আজকের বিশ্বে এটাই চলমান বাস্তব।

এমতাবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকের বিরুদ্ধে যাঁরা রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন, তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, অথবা তাঁদের মূল্য চোকাতে হয় জীবন দিয়েও। প্রশাসন, পুলিশ, আইন— পাশে দাঁড়ানোর জন্য কাউকেই পাওয়া যায় না। তবু সামান্য হলেও আশা আছে। এত কিছু সত্ত্বেও মানুষের প্রতিবাদ থেমে নেই। বাঁচার তাগিদেই তাদের থেমে থাকার কোনও উপায় নেই।

কমল সাঁই, ঝাড়গ্রাম

উত্তরণের পথ

‘আলো-বিলোপ’ সম্পাদকীয়টি যথেষ্ট উদ্বেগ ও আশঙ্কা জাগায়। এক দিকে বাংলাদেশে ধর্মের পরিচয়ে মানুষকে হত্যা, অন্য দিকে এ দেশেও বাংলাভাষী তথা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে গণপ্রহারে মৃত্যু, বড়দিনের প্রাক্কালে চার্চগুলির উপর আক্রমণ মানুষ হিসেবে লজ্জিত করে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক জন গরিব প্রান্তিক প্যাটিস বিক্রেতার মার খাওয়া এবং তার পর এ রাজ্যের বিরোধী দলনেতার এই ঘটনায় অভিযুক্ত ও পরে কারামুক্ত লোকগুলির সংবর্ধনা শিহরিত করে। এই কি রবীন্দ্রনাথ, শ্রীচৈতন্যের ভারত, যে দেশে মনীষীরা বার বার সকল সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার ও সম্মানের কথা বলেছেন! বর্তমান বাংলাদেশে যা ঘটছে ও ঘটেছে, তা চরম নিন্দনীয়, কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় এ দেশেও একই ঘটনা ঘটলে উভয় মানসিকতার মধ্যে তফাত কোথায়?

দুঃখের হলেও সত্যি, বর্তমানে দুই দেশেই উদারবাদী মানুষদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপর আমাদের অনেক আশা-ভরসা ছিল। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই তাঁর অযোগ্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। এমতাবস্থায় মনে হয়, দু’দেশের রাষ্ট্রনেতাদের আরও কাছাকাছি আসা দরকার, বার্তালাপ প্রয়োজন। শীর্ষ স্তরের নেতারা যদি এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা করে স্থানীয় প্রশাসনকে দ্রুত ও যথাযথ পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেন, তা হলে একটা সদর্থক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইতিহাস বলে, বিভেদকামী মানুষ অপেক্ষা শান্তিকামী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তবে প্রশাসনিক শৈথিল্য প্রকাশ পেলে, এই হানাহানি, অত্যাচারের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। সম্পাদকীয়ের শেষ বাক্যে বলা হয়েছে— নতুন বছর আসবে যাবে আবার আসবে, মানবসমাজে মানবিকতা নামক গুণটি বিসর্জনের ধারাবাহিক পালা সম্ভবত চলতেই থাকবে— আমি এতটা নিরাশাবাদী নই। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সময় অনেক বার এসেছে, আবার মানুষই সেখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে নিয়েছে। এ বারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না।

প্রশান্ত দাস, অনন্তপুর, হুগলি

বিপদ-বাজি

নতুন বছরের গোড়ায় আরও একটি অবৈধ বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে একাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বারুইপুর এলাকার চম্পাহাটির একটি বাজি তৈরির কারখানায়। এর আগেও বাংলার মাটিতে একাধিক জেলায় এমন ঘটনার জেরে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। রাজ্য সরকারের তরফে এবং রাজ্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে কড়াকড়ি এবং ধরপাকড় চালিয়েও এই ধরনের অবৈধ বাজি তৈরির কাজে কোনও ভাবেই লাগাম টানা যায়নি। আগামী দিনেও এর পুনরাবৃত্তি কি ঘটতেই থাকবে?

বাজি পোড়ানোর ফলে দূষণ বহুগুণ বাড়ে। তবুও আমরা বাজি ফাটিয়েই আনন্দ উদ্‌যাপন করি। সে ক্ষেত্রে বাজারে বাজির জোগান অব্যাহত রাখতে ইতিউতি অবৈধ বাজি তৈরির কারখানাগুলি গড়ে ওঠা খুব স্বাভাবিক। বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীদের হাত অবৈধ বাজি তৈরির কারখানার মালিকদের মাথায় থাকে বলেই এই ধরনের কাজকর্ম চলতে পারে। অতীতে পূর্ব মেদিনীপুরের এগরায় বসতি এলাকার মধ্যে অবৈধ বাজি তৈরির কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে কম জল ঘোলা হয়নি। ফের চম্পাহাটির বাজি বিস্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করল যে, এই কারবার সারা বছর রমরমিয়েই চলে। নৈহাটির কিছু এলাকা তো বটেই, হালিশহর, কাঁচরাপাড়া ও কল্যাণীর বেশ কয়েকটি জায়গায় বাজি তৈরির খ্যাতি রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়, বজবজ, নুঙ্গি, চম্পাহাটি, ক্যানিংয়েও বাজি তৈরির যথেষ্ট নামডাক আছে। দুর্ঘটনার পর মাসকয়েক কাজ বন্ধ থাকে, ফের কাজ শুরু হয় সেখানে। প্রাণের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে, জানা সত্ত্বেও চলে বাজি তৈরির কারখানা। এ যেন এক মায়াজাল। রাজ্য জুড়ে অবৈধ বাজি বানানোর ব্যবসা পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করতে চাই কড়া পুলিশি পদক্ষেপ। সঙ্গে মাঝেমধ্যেই আচমকা অভিযান, এলাকার মানুষকে নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদ করে খোঁজখবর নেওয়া। পাশাপাশি প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও। এতে এই বিপজ্জনক পেশায় কিছুটা লাগাম পড়তে পারে।

সৌরভ সাঁতরা, জগদ্দল, উত্তর ২৪ পরগনা

বর্জ্যের ক্ষতি

বর্তমানে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, নিকাশি নালা ইত্যাদির ধারে শিশুদের ব্যবহৃত ডায়াপার নির্বিচারে ফেলে রাখা হচ্ছে। এর ফলে এক দিকে যেমন দৃশ্যদূষণ ঘটছে, অন্য দিকে তা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ এ বিষয়টি নিয়ে চার দিকে সচেতনতার অভাব স্পষ্ট। পুরসভা ও প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতা প্রসারের পাশাপাশি ব্যবহৃত ডায়াপার ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা অতি জরুরি।

তন্ময় সুতার, ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Protest Politics

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy