E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: যে ধর্মের মর্মে সেবা

বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের মূল কথাটি প্রচার করেছিলেন, তা হল ঔদার্য। মানুষ যখন হাতে-কলমে সেবা করে, অন্যের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে, তখনই সে প্রকৃত অর্থে উদার হয়ে ওঠে।

শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:২৪

অরুণ মালাকার ‘বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ’ (১০-১) শীর্ষক প্রবন্ধটি যথার্থই লিখেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের রচনার ভান্ডার কেবল তাঁর বক্তৃতা বা দার্শনিক গ্রন্থেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর ব্যক্তিগত চিঠি ও আত্মপ্রকাশমূলক লেখাগুলি আমাদের সামনে এক ভিন্নতর বিবেকানন্দকে তুলে ধরে— যিনি শুধু আধ্যাত্মিক গুরু নন, মানবিক আবেগে ভরপুর এক সংবেদনশীল মানুষও বটে। এই চিঠি ও ব্যক্তিগত রচনাগুলির বিশ্লেষণ করলে আমরা তাঁর অন্তর্দৃষ্টি, সংগ্রাম এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হই। এখানেই তাঁর বাস্তব আধ্যাত্মিক দর্শনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ঈশ্বরকে মন্দিরে নয়, মানুষের মধ্যেই দেখেছেন। তাঁর চিঠিগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধর্মের আসল সারমর্ম হল সহমর্মিতা ও সেবা।

বিবেকানন্দ হিন্দুধর্মের মূল কথাটি প্রচার করেছিলেন, তা হল ঔদার্য। মানুষ যখন হাতে-কলমে সেবা করে, অন্যের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে, তখনই সে প্রকৃত অর্থে উদার হয়ে ওঠে। উদার ও সুমন ব্যক্তিত্বের মানুষ মানবসভ্যতার উন্নতির পক্ষে একান্ত ভাবেই প্রয়োজনীয়। বিবেকানন্দের চিন্তাভাবনার আবর্তন মানুষকে ঘিরেই। অর্থাৎ মানবতাবাদী দৃষ্টিতেই তিনি সব কিছুকে দেখেছেন, যার উৎস অবশ্যই তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা।

স্বামীজির বক্তৃতা, বাণী ও রচনার দ্বারা সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছিল যুবসমাজ। শুধু তা-ই নয়, তাঁর আবির্ভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এক নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। কারণ তাঁর বাণীর শক্তি যে কোনও মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে যথেষ্ট ছিল। জীবের মধ্যেই তিনি ঈশ্বরকে দেখেছেন এবং জীবের সেবাকেই ঈশ্বরের আরাধনা বলে প্রচার করেছেন। স্বামীজি কখনও বিজ্ঞানকে বেদান্তবিরোধী বলে মনে করেননি। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও ভারতের আধ্যাত্মিক দর্শনের সমন্বয়ের মাধ্যমেই মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকতে পারে। পরাধীন যুগে স্বামীজির এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সেই সময় ভারতীয়দের বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তার সক্ষমতাকে পরিকল্পিত ভাবে খাটো করে দেখানো হত।

আজকের ভারতে তরুণ প্রজন্ম এক জটিল বাস্তবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এক দিকে বিশ্বায়ন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহ অফুরন্ত সুযোগ, অন্য দিকে কর্মসংস্থান, বৈষম্য এবং পরিচয়ের সঙ্কট। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা নতুন করে, আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি

বিদ্রোহী সন্ন্যাসী

অরুণ মালাকার ‘বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ’ প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে কিছু মূল্যবান কথা বলেছেন। আজ যখন সারা দেশ, এমনকি আমাদের রাজ্যও জাতপাত-ধর্ম-বর্ণের বিভাজনে ক্রমশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে, তখন তথাকথিত হিন্দুত্বের জয়ধ্বজাধারী সংগঠনগুলি আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদী ভাবনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠতেই পারে— আমরা কেন আজ উচ্চকণ্ঠে বলতে পারছি না, নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর— আমার রক্ত, আমার ভাই?

অজ্ঞ ও মূর্খ দেশবাসীকে প্রকৃত জ্ঞান দেওয়ার জন্য স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভ্রাতাদের গ্লোব ও মানচিত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে যেতে বলতেন। এই উদ্যোগের গুরুত্ব ছিল শিক্ষা বিস্তারে, ধর্মপ্রচারে নয়। আজ আমাদের দেশ কিংবা রাজ্যে এমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে কি? বরং যেটুকু শিক্ষার সুযোগ রয়েছে, তাকেই সঙ্কুচিত করার প্রবল তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

বিদেশি ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে স্বামী বিবেকানন্দ জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমগ্র দেশবাসীকে একত্রিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই জাতীয়তাবাদের স্বরূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যে নতুন ভারতের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেখানে কোনও ধর্মগ্রন্থই কেন্দ্রে থাকবে না। নৈনীতালের এক বিদগ্ধ মুসলমানকে লেখা চিঠিতে তিনি এই আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন এক বিদ্রোহী সন্ন্যাসী, ‘সাইক্লোনিক মঙ্ক’। সর্বধর্মসমন্বয়ের মাধ্যমে জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি সমুদ্রের জাগরণের কথা বলেছিলেন। নিজেকে ‘সোশ্যালিস্ট’ বলেও ঘোষণা করেছিলেন, যদিও তাঁর কল্পিত সমাজতন্ত্রের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় চেতনা, ভোটবাজির রাজনীতি নয়। শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে যারা হিন্দুত্বের তাস খেলে, তাদের কাছে এই বিবেকানন্দ সম্পূর্ণ অপরিচিত, প্রায় বিদেশির মতো।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরাধীন ভারতে এমন এক জন বিবেকানন্দ উপহার দিতে পেরেছিলেন, যিনি সারা বিশ্বকে আলোড়িত করেন। আর সেই বিবেকানন্দই আমাদের দিয়েছিলেন ভগিনী নিবেদিতার মতো এক সিংহীকে এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে। এঁদের অবদানকে আমরা কতটা মর্যাদা দিতে পেরেছি, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

পরিশেষে বলা যায়, ধর্মের নামে কোনও ধরনের বুজরুকি স্বামী বিবেকানন্দ কখনওই বরদাস্ত করতেন না। এ নিয়ে তাঁর সংগ্রাম ছিল অনমনীয়। অথচ আজ এত বিশাল সংখ্যক দেশনেতা ও নেত্রী একটি বিশেষ ধর্মের ভাষায় কথা বলেন, ধর্মচর্চার জন্য নয়, ভোট সংগ্রহের স্বার্থে। এই মুহূর্তে স্বামী বিবেকানন্দ যদি উপস্থিত থাকতেন, তবে তিনি কী ভূমিকা পালন করতেন, সেটাও আজ আমাদের গভীর ভাবে ভেবে দেখার বিষয় হওয়া উচিত।

তপন কুমার সামন্ত, কলকাতা-১২

চরৈবেতি মন্ত্র

অরুণ মালাকারের ‘বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ’ প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। প্রবন্ধকার স্বামী বিবেকানন্দের সুবিশাল ভাবধারাকে যৎসামান্য হলেও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তুলে ধরার প্রয়াস করেছেন এবং সেই সঙ্গে আমাদেরও সমৃদ্ধ করেছেন। আসলে জীবনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি হল আত্মবিশ্বাসহীনতা। তার পরিণতিস্বরূপ আমরা ইতিবাচক চিন্তা থেকে সরে যাই এবং ফলত জীবনে নেমে আসে ঘোর সঙ্কট। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন ইতিবাচক চিন্তার এক পরম স্রষ্টা। তাই শতবর্ষেরও আগে সহায়-সম্বলহীন এই মানুষটির আমেরিকার বুকে আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল এক জ্যোতিষ্কের মতো।

বিবেকানন্দ অতি স্বল্প সময়ের মধ্যেই সেখানে পণ্ডিতসমাজে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। সে ইতিহাস আজ আর কারও অজানা নয়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঋষি অরবিন্দ ও মহাত্মা গান্ধীর মতো বিশ্ববরেণ্য মানুষরা দেশ ও দশের প্রতি স্বামী বিবেকানন্দের অসীম প্রেম ও অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের জীবনেও স্বামীজির প্রভাবকে তাঁরা ঋণস্বরূপ স্বীকার করে নিয়েছেন। বাস্তবিকই, বিবেকানন্দের প্রভাব সর্বত্র এবং তা সর্বদাই ইতিবাচক ভাবধারায় বিস্তৃত।

সংস্কৃতি মানুষকে সভ্য করে তোলে এবং নিঃস্বার্থ ভাবে গড়ে তোলে তার চরিত্রের কাঠামো। যে নিজে কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, সে-ও অন্তত কিছু নষ্ট করে না, এই বোধটাই সংস্কৃতির মূল শিক্ষা। স্বামী বিবেকানন্দ মানবজাতির কাছে এক শাশ্বত যুগ। যেখানে হতাশা বলে কিছু নেই, নেই কিছু হারানোর ভয়। আছে কেবল ‘চরৈবেতি’ মন্ত্র— এগিয়ে চলার আহ্বান, লক্ষ্যে পৌঁছনোর সঙ্কল্প। ইতিবাচক চিন্তাধারার এক অনুপম ও চিরন্তন দৃষ্টান্ত।

বাবুলাল দাস, ইছাপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

বেহাল রাস্তা

আমি দমদম বিমানবন্দরের কাছে তরুণ সেনগুপ্ত সরণি সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। এই এলাকায় রাস্তার অবস্থা একেবারে অবর্ণনীয়। বছরের পর বছর কেটে যায়, কিন্তু রাস্তাঘাটের হাল ফেরে না। এক সময়ের পিচ-ঢালা রাস্তাটি এখন কার্যত একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রায় আধ কিলোমিটার জুড়ে বছরের অধিকাংশ সময়ই জল জমে থাকে। জায়গায় জায়গায় শুধু গভীর গর্ত। অটো, টোটো কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করতে নাভিশ্বাস ওঠে। টোটো উল্টে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, তবু প্রশাসনের হুঁশ ফেরেনি।

ভোট আসে, ভোট চলেও যায়, কিন্তু এই রাস্তার অবস্থা একই রকম খারাপ থেকে যায়। আসন্ন নির্বাচনের আগে কি এই রাস্তার কোনও পরিবর্তন আদৌ আশা করা যাবে? জানি না, এই রাস্তার মেরামত নিয়ে সংশ্লিষ্ট পুরসভার পক্ষ থেকে কেন এখনও কোনও দৃশ্যমান উদ্যোগ করা হয়নি।

মলয়কুমার নন্দী, কলকাতা-২৮

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

vivekananda Harmony

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy