তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা গ্রহাণুকে ঠেকায় কার সাধ্য? বিস্তীর্ণ মহাশূন্য ভেদ করে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে এগিয়ে যায়। সামনে যাকে পায়, তাকেই সজোরে আঘাত করে। সে আঘাতের অর্থ একটাই— ধ্বংস! এমন রাক্ষুসে মহাজাগতিক গ্রহাণু যদি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে? কী হবে মানবসভ্যতার পরিণতি? দীর্ঘ দিন ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে এই প্রশ্ন। মহাজাগতিক সেই সম্ভাব্য ললাটলিখন ঠেকানোর উপায় খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে তাঁরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন একটি গবেষণা অবশেষে আশার আলো দেখিয়েছে।
পৃথিবীর বিপদ হতে পারে, এমন কোনও গ্রহাণুর হদিস যদি পাওয়া যায়, তবে তাকে আগেভাগেই ধ্বংস করে ফেলা উচিত। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে মোটামুটি একমত। কিন্তু ধ্বংসের ধরন নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কী ভাবে গ্রহাণু ধ্বংস করা যায়, পৃথিবী থেকে বিজ্ঞানের কতটা শক্তি প্রয়োগ করা উচিত মহাকাশে, তা নিয়ে নানা সময়ে নানা মত উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে উদ্বেগ একটাই— গ্রহাণু ধ্বংস হলে তার অবশিষ্টাংশ পৃথিবীর দিকে ছিটকে এলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে কি না। পৃথিবীর নিকটবর্তী অন্য কোনও গ্রহ বা উপগ্রহে ওই ধ্বংসাবশেষ পড়লেও তা থেকে কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকবে কি না, বিজ্ঞানীদের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা চলেছে। সম্প্রতি তাঁরা এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান তুলে ধরেছেন— পরমাণু বিস্ফোরণ।
আরও পড়ুন:
পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা কোনও গ্রহাণুকে নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে পারমাণবিক আঘাত করলে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলতে পারে, মত বিজ্ঞানীদের একাংশের। তাঁরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে পাল্টা কোনও প্রতিক্রিয়া বা পৃথিবীর ক্ষতির সম্ভাবনা না-ও থাকতে পারে। তবে আঘাত করতে হবে হিসাব কষে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদেরা একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে মহাজাগতিক পাথরখণ্ড নিয়ে গবেষণা করেছেন। কী ধরনের আঘাতে মহাজাগতিক পাথরখণ্ডে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়, তা-ই ছিল গবেষণার বিষয়। গবেষণাদলের অন্যতম সদস্য মেলানি বোচম্যান বলেন, ‘‘তেজস্ক্রিয় বিকিরণের ফলে উল্কাপিণ্ডের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর পরিবর্তনগুলি পরীক্ষা করাই আমাদের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য।’’ কী দেখা গিয়েছে বিশ্লেষণে? গবেষকদের দাবি, এত দিন যতটা ভাবা হত, মহাজাগতিক পাথরখণ্ড তার চেয়ে অনেক বেশি চাপ এবং ধাক্কা সহ্য করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, তীব্র কোনও আঘাত পেলে গ্রহাণু বিচলিত হয় না। আসলে তা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তা হলে মহাকাশে পরমাণু বিস্ফোরণ কী ভাবে সম্ভব? বিস্ফোরণের ধাক্কায় গ্রহাণু আরও শক্তিশালী হলে পৃথিবীবাসীর কী লাভ? বিজ্ঞানীদের মতে, প্রাথমিক ভাবে গ্রহাণু শক্তিশালী হয়ে যাওয়ার এই তত্ত্ব খুব একটা কার্যকর বলে মনে না হলেও আসলে এটাই তুরুপের তাস। গ্রহের রক্ষণশীল কৌশল সাজাতে এই তত্ত্ব কাজে লাগতে পারে। মহাকাশে পরমাণু বিস্ফোরণের মাধ্যমে গ্রহাণুকে আটকানোর ক্ষেত্রে এত দিন প্রধান বাধা মনে করা হত তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে। গ্রহাণুর ধ্বংসাবশেষ, তেজস্ক্রিয় পদার্থ পৃথিবীর দিকে ছিটকে আসার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু পরমাণু বিস্ফোরণে যদি গ্রহাণু ভেঙে না যায়, তবে আর কোনও চিন্তাই থাকে না। সে ক্ষেত্রে হিসাব কষে পারমাণবিক আঘাত করে গ্রহাণুর গতিপথ বদলে দেওয়া যেতে পারে।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের মতে, কোনও মহাজাগতিক চলমান বস্তুর গতিপথ পরিবর্তন করে দেওয়ার জন্য তার অভ্যন্তরীণ কাঠামো, চরিত্র এবং গতিবিধি আগে থেকে জানা প্রয়োজন। কিন্তু এমন তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। গবেষণাগারে কৃত্রিম ভাবে একটা ধারণা পাওয়া গেলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে কী হতে পারে, তা অভিজ্ঞতা বিজ্ঞানীদের নেই। নতুন গবেষণায় সেটাই সম্ভব হয়েছে বলে দাবি। এ ক্ষেত্রে গবেষণাগারে একটি উল্কাপিণ্ডের নমুনাকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে আঘাত করে দেখা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, উল্কাপিণ্ডটি প্রথম নরম ও নমনীয় হয়েছে এবং তার পর আশ্চর্যজনক ভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ গিয়ানলুকা গ্রেগরি বলেন, ‘‘এই প্রথম আমরা দেখতে পেলাম, চরম পরিস্থিতিতে কী ভাবে একটি উল্কাপিণ্ড বিকৃত এবং পরিবর্তিত হয়। সেই পরিণতি আদৌ ধ্বংসাত্মক নয়।’’
মহাকাশে পরমাণু বিস্ফোরণের পরিণতি নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণায় অন্য মহাজাগতিক নমুনা ব্যবহার করা হবে। হাতেকলমে এই তত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখার উপায় নেই। তাই আগামী দিনে সত্যিই কখনও এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সামান্যতম ভুলের অবকাশও যাতে না থাকে, তাই সব দিক খুঁটিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পদার্থবিদদের একাংশ মনে করেন, আগত গ্রহাণুকে সরাসরি পরমাণু বিস্ফোরণের মাধ্যমে আঘাত না করে তার গতিপথের মধ্যে কাছাকাছি কোথাও বিস্ফোরণ ঘটানো উচিত। তাতে ওই গ্রহাণু নিুর্দিষ্ট কক্ষপথ থেকে সরে যেতে পারে। এড়ানো যেতে পারে বিপদ।