পৃথিবীর চেয়ে তার প্রতিবেশী মঙ্গলগ্রহ আকারে অনেক ছোট। ভর পৃথিবীর ভরের দশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। তবু এই ‘ক্ষুদ্র’ মঙ্গলকে নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কী ভাবে সাড়ে ২২ কোটি কিলোমিটার দূরে থেকেও ছোট্ট লালগ্রহটি পৃথিবীর উপর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, বিজ্ঞানীরা তা জানতে নানারকম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তেমনই একটি গবেষণায় মিলেছে নতুন হদিস। বিজ্ঞানের এত দিনের ধারণাকেই তা বদলে দিতে পারে।
পৃথিবীর জলবায়ুর উপর মঙ্গলগ্রহের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের দাবি, ছোট হলেও পৃথিবীর উপর মঙ্গলের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। এই মঙ্গলই পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অনেকাংশে দায়ী। এমনকি, পৃথিবীর বুকে তুষারযুগও ডেকে আনতে সাহায্য করেছিল মঙ্গলগ্রহ। আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এই নতুন হদিস পেয়েছেন। গবেষণাপত্রে তা ব্যাখ্যাও করেছেন।
আরও পড়ুন:
তুষারযুগের সঙ্গে মঙ্গলের কী সম্পর্ক? বিজ্ঞানীদের দাবি, মঙ্গলের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অক্ষের ঘূর্ণনকে প্রভাবিত করে। তারই প্রভাব পড়ে জলবায়ুতে। আসলে মঙ্গলের আকর্ষণ পৃথিবীর কক্ষপথ এবং অক্ষকে সর্বক্ষণই ধাক্কা দিচ্ছে। এই ধাক্কার প্রভাব চট করে টের পাওয়া যায় না। সঙ্গে সঙ্গে কক্ষপথে কোনও পরিবর্তনও হয় না। তবে কয়েক হাজার বছর ধরে মঙ্গলের এই ধাক্কা কক্ষপথের আকার বদলে দিতে পারে। কক্ষপথের সঙ্গে পৃথিবীর অক্ষ যে কোণ তৈরি করে রয়েছে, বদলে যেতে পারে তা-ও। এর ফলে পৃথিবীতে সূর্যালোকের বিকিরণে তারতম্য ঘটে। তুষারযুগের সময়েই তা-ই হয়েছিল, দাবি বিজ্ঞানীদের।
পৃথিবীর উপরিভাগে সূর্যালোকের বিচ্ছুরণকে নিয়ন্ত্রণ করে মিলানকোভিচ চক্র। এই চক্রে মঙ্গলের প্রভাব আবিষ্কার করে চমকে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অত্যাধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তাঁরা গবেষণাগারে সৌরজগতের একটি মডেল (প্রতিরূপ) তৈরি করেছিলেন। সেখানে মঙ্গল গ্রহকে রেখে এবং মঙ্গলকে সরিয়ে দিয়ে পৃথিবীর গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। কয়েক হাজার বছরের গবেষণার তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়। মঙ্গলের ধাক্কা সম্পর্কে তার পর নিশ্চিত হন গবেষকেরা।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীদের দাবি, মঙ্গলের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে প্রতি বছরই পৃথিবীর কক্ষপথে সামান্য পরিবর্তন ঘটছে। কক্ষপথের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে অক্ষের কৌণিক অবস্থানও। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিভিন্ন ঋতুতে সূর্যালোকের বিকিরণ পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। হিমবাহের গতিবিধি, ঋতুচক্র কক্ষপথের পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মঙ্গল না থাকলে পৃথিবী বর্তমান অবস্থায় পৌঁছোতেই পারত না। যে অবস্থায় থাকত, তার সঙ্গে বাস্তবের ফারাক হত আকাশ-পাতাল।
বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, ছোট আকারের গ্রহগুলি সৌরজগতে তার পারিপার্শ্বিকের উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। মঙ্গল নিয়ে নতুন গবেষণা সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে। সেই সঙ্গে পৃথিবীর ভবিষ্যতের জলবায়ু সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পৃথিবীর উপর মঙ্গলের প্রভাব পড়েই চলেছে। তার ফলে আগামী দিনেও তুষারযুগের মতো জলবায়ুর কোনও চরম পর্যায়ের সাক্ষী হতে পারে পৃথিবী। এমনকি, প্রতিবেশী গ্রহের বাসযোগ্যতাকেও মঙ্গল প্রভাবিত করতে পারে। বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাস, বাস্তুতন্ত্রের দিকে নতুন এই গবেষণা আলোকপাত করেছে। এর ফলে আগামী দিনেও বিজ্ঞানীরা উপকৃত হবেন।
পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত একাধিক বার তুষারযুগ এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তা চলেছে। প্রাচীম হিমযুগগুলি তুলনামূলক তীব্রতর ছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেই সময় বরফে ঢেকে গিয়েছিল সমগ্র পৃথিবী। কোনও অংশই বাদ যায়নি। কেন প্রাচীন তুষারযুগ পরের তুষারযুগগুলির চেয়ে বেশি তীব্র ছিল, তার ব্যাখ্যা এত দিন মেলেনি। নতুন গবেষণার পর এখানেও মঙ্গলের কারসাজি দেখছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তবে আগামী দিনে ফের মঙ্গলের প্রভাব পৃথিবীতে হিমযুগ ঘনিয়ে তুলবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট করে কোনও বার্তা দেওয়া হয়নি।