আন্টার্কটিকার বরফে ঢাকা সমুদ্র চরিত্র বদলে ফেলছে। প্রাচীন নিয়ম আর খাটছে না। যে শীতল জল এত দিন সমুদ্রের উপরিভাগে থাকত, তা আচমকা নীচের দিকে এগোতে শুরু করেছে। পরিবর্তে নীচ থেকে উষ্ণ জল উঠে আসছে উপরে। এর ফলে সমুদ্রের ওই অংশের জলে লবণও বাড়তে শুরু করেছে। এই পরিবর্তন চোখে পড়ার পর থেকেই দুশ্চিন্তায় বিজ্ঞানীরা। একাংশের দাবি, এর ফলে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র বদলে যেতে পারে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তেও এর গুরুতর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
সমুদ্রের এই গতিপ্রকৃতি বদল প্রথম চোখে পড়েছে মহাকাশের কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাঠানো তথ্যের পাতায়। পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী একাধিক উপগ্রহের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্রিটেনের ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক সেন্টার (এনওসি) একটি রিপোর্ট তৈরি করে। সেখানেই বলা হয়েছে, আন্টার্কটিকা মহাদেশ সংলগ্ন সমুদ্রে মেরু এবং উপমেরু স্রোতের মধ্যবর্তী অংশের জলে লবণের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে গিয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে লবণ বাড়ছে বলেও প্রমাণ দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, দক্ষিণ গোলার্ধে সমুদ্রের গভীরে স্রোতের সঞ্চালনে বড় কোনও পরিবর্তন না হলে এই লবণ বৃদ্ধি সম্ভব নয়। শুধু পরিবর্তন নয়, সমুদ্র স্রোতের সঞ্চালন সম্পূর্ণ উল্টে গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের নীচের দিকের জলে কয়েকশো বছর ধরে জমে থাকা উত্তাপ এবং কার্বন ডাই অক্সাইডও উপরিতলে চলে আসছে।
আরও পড়ুন:
আন্টার্কটিকার বরফে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব কমবেশি সকলেরই জানা। বরফ প্রতি বছরই গলছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত আন্টার্কটিকা এবং সংলগ্ন সমুদ্রে যে পরিমাণ বরফ গলেছে, তা আস্ত গ্রিনল্যান্ডের আকারের সমান। গত কয়েক দশকে পৃথিবীর দ্রুততম পরিবর্তনগুলির মধ্যে এটা অন্যতম। বিজ্ঞানের নিয়ম বলছে, বরফ গললে সমুদ্রের উপরিতলের জলে লবণাক্ততা কমে। এর ফলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা নতুন করে বরফ জমার পক্ষে অনুকূল। তাই যে বরফ গলে সমুদ্রের জলে মিশছে, সেই জলই আবার জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। আপাত ভাবে তার থেকে কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে না। কিন্তু স্রোত সঞ্চালনায় আচমকা এই পরিবর্তনের ফলে এই হিসাব উল্টে গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের কাছে এই পরিবর্তন ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
উপরিতলের লবণাক্ত জল সমুদ্রের ধরনই বদলে দিয়েছে। সাধারণ ভাবে, বরফ গলা শীতল টাটকা জল সমুদ্রের উপরিতলেই থাকত। তার নীচের জল হত তুলনামূলক উষ্ণ এবং লবণাক্ত। লবণই এই জলের প্লবতা নিয়ন্ত্রণ করত। এর ফলে সমুদ্রের গভীরে তাপকে ‘বন্দি’ করে রেখে উপরতলে শীতল বরফ তৈরির অনুকূল জল থাকত। কিন্তু এখন লবণাক্ত জল সমুদ্রের গভীর থেকে তাপকে উপরে উঠে আসতে সাহায্য করছে। উষ্ণ জলের এই ঊর্ধ্বমুখী সঞ্চালন সমুদ্রের বরফকে নীচের দিক থেকে গলিয়ে দিচ্ছে। বরফ পুনরায় তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি আর থাকছে না। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই ‘ট্রেন্ড’ যদি চলতে থাকে, তবে দক্ষিণ মহাসাগরে স্থায়ী পরিবর্তন চলে আসতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে সমগ্র বিশ্বে।
আরও পড়ুন:
সুদূর জনশূন্য আন্টার্কটিকায় সমুদ্রের পরিবর্তনে কী কী সমস্যা হতে পারে? বিজ্ঞানীদের দাবি, এর ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রস্রোত ব্যাহত হতে পারে। বদলে যেতে পারে জলবায়ুর ধরন। এমনি, আন্টার্কটিকার বাইরেও জলের বাস্তুতন্ত্র এর ফলে পরিবর্তিত হতে পারে। কারণ, আন্টার্কটিকা সুদূর এবং জনশূন্য হলেও জলে কোনও কাঁটাতার নেই। সমস্ত সমুদ্রই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যে বরফ গলতে শুরু করেছে, এই প্রক্রিয়ায় তা আরও ত্বরান্বিত হবে বলেও মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।
বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের গভীরে জমে থাকা তাপ আরও বেশি করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এতে জলবায়ুর পরিবর্তন আরও দ্রুত হবে এবং আরও শক্তিশালী ঝড়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ফলে দিকে দিকে অতি ঠান্ডা এবং অতি গরম আবহাওয়া অনুভূত হবে। প্রবল তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা আগের চেয়ে বাড়বে। বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলস্তর বাড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই। বিজ্ঞানীদের দাবি, এর ফলে পেঙ্গুইনদের বসতিও বিপন্ন হতে চলেছে।