এ যেন অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিরিখে ভবিষ্যৎ অনুমানের চেষ্টা। কার ভবিষ্যৎ? কোষের। ভবিষ্যৎ অনুমানের উদ্দেশ্য, কোষের আগাম গতিবিধি আঁচ করে কর্কট রোগ নিরাময় থেকে স্টেম কোষের রহস্যময় জগতের চাবিকাঠি খোঁজা। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমনই এক জাদুকরি ‘টাইম ক্যাপসুল’ বানাতে সক্ষম হয়েছেন, যা কোষের অতীত কার্যকলাপের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ ও জমা রাখতে পারে। তার নাম ‘টাইমভল্টস’।
‘সায়েন্স’ জ়ার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ‘টাইমভল্টস’ তৈরি হয়েছে ‘ভল্ট’ নামের এক কোষীয় অঙ্গাণু থেকে। অধিকাংশ স্তন্যপায়ীর কোষে হাজারে হাজারে মেলে ‘ব্যারেল’ বা পিপের আকৃতির ‘ভল্ট’। আশির দশকে এর অস্তিত্ব জানা গেলেও, তার কাজ কী, স্পষ্ট ধারণা ছিল না। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ফেই চেন ও তাঁর দলবল এই ভল্ট-কেই বদলে দিয়েছেন কোষের ‘স্টোরেজ ইউনিট’ বা তথ্য ভান্ডারে। তাঁরা ভল্টের প্রোটিনকে এমন ভাবে পুনর্বিন্যস্ত করেছেন যে, তা কোষে থাকা ‘মেসেঞ্জার আরএনএ’-র অণুগুলিকে নিজের ভেতরে আটকে ফেলে। এর পরে নির্দিষ্ট রাসায়নিকের প্রয়োগে তা অনেকটা কোষে ঘটে চলা কর্মকাণ্ডের ‘রেকর্ডার’ হিসাবে কাজ করে। চেনের দলবল দেখেছে, কোনও মানবকোষ ২৪ ঘণ্টায় যতগুলি মেসেঞ্জার আরএনএ তৈরি করে,তার প্রতিটির ক্ষুদ্রাংশকে টাইমভল্টস সংগ্রহ করে এক সপ্তাহেরও বেশিসময় সঞ্চয় করতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, ভল্টের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনে কোষে কোনও প্রভাব চোখে পড়েনি।
বিজ্ঞানজগতের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছে, গত এক দশকে ‘ক্রিসপার’ (CRISPR) জিন-এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশ কিছু ‘সেল রেকর্ডার’ তৈরির চেষ্টা হয়েছে। সেগুলি কোষে ঘটা ক্ষণস্থায়ী ঘটনাগুলির একটি স্থায়ী জেনেটিক খতিয়ান তৈরি করতে পেরেছে। পরে জ়িনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে তা থেকে কোষের ঘটনাবলির একটি ‘টাইমলাইন’ তৈরি করা যায়। তবে চেনের মত, এই রেকর্ডারগুলির একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঠিক করে নিতে হয়, কোষের ঠিক কোন ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। টাইমভল্টসে সেই বাধা নেই।
পরের ধাপ কী? টাইমভল্টস ব্যবহারে ইতিমধ্যে ‘পারসিস্টার’ নামের একটি কর্কট রোগের কোষকে মাত করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই কোষগুলি কোনও জিনগত পরিবর্তন ছাড়াই ওষুধের ক্রিয়া এড়াতে পারে। অনুমান যে, কোষগুলিতে সক্রিয় কিছু ‘আরএনএ ট্রান্সক্রিপ্ট’ তাদের ওষুধের প্রভাব থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। তবে চেনের দাবি, টাইমভল্টসের সাহায্যে ফুসফুসের কর্কট রোগের পারসিস্টার কোষের কিছু জিনের সন্ধান মিলেছে। সেগুলিকে অকেজো করে দেওয়ার পরে দেখা গিয়েছে, সাধারণ ওষুধগুলিই আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে।
এই প্রয়োগে উচ্ছ্বসিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জে শেনডুর মনে করেন, ভল্টকে এ ভাবে ব্যবহারের মূলে সৃজনশীলতার পাশাপাশি প্রয়োজন ছিল সাহস। তবে শুধু আরএনএ, না কি প্রোটিন বা অন্য কোষীয় উপাদানের তথ্যও ভবিষ্যতে এ ভাবে জমা রাখা যাবে, সেই প্রশ্নে এখন সরগরম গবেষক মহল। অবশ্য একটা বিষয় নিয়ে গবেষক মহলের দ্বিমত নেই। তা হল: কোষের অতীতকে হাতের মুঠোয় পাওয়ার এই উদ্ভাবন জীবন-রহস্য উন্মোচনের লড়াইয়ে বিজ্ঞানকে এক ধাপ এগিয়ে দিল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)